পরিপার্শ্ব
দীপক চৌধুরী
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:১৮ এএম
শাহ আবদুল করিম
আবহমান বাংলার জনজীবনের চালচিত্র যার সৃষ্টিতে বিদ্যমান, তিনি গণজাগরণের বাউল শাহ আবদুল করিম। বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের ১০৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শুরু হয়েছে দুই দিনের শাহ আবদুল করিম লোক উৎসব। ৭-৮ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কালনী নদীর তীরে উজানধল গ্রামে অনুষ্ঠিত ‘শাহ আবদুল করিম লোক উৎসব ২০২৫’ অনুষ্ঠানে দেশবিদেশের অতিথিরা বাউলসম্রাটের জীবন নিয়ে আলোচনা এবং দেশের বিখ্যাত শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কালনী নদীর পারে ভাটির বাউল সাধক শাহ আবদুল করিম কেবল গান আঁকড়ে ধরেই কাটিয়েছেন। মনের গভীর থেকে উঠে আসা মাটির সুরে সাদাসিধে কথা আর উপমা বসিয়ে তিনি তৈরি করেছেন অসংখ্য কালজয়ী বাউল গান।
ভাটি বাংলার এ বাউল লোকসংগীত বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছেন। ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ইব্রাহিম আলী ও নাইওরজান বিবির ঘর আলো করে প্রথম সন্তান হিসেবে জন্ম নেন তিনি। জন্মসংক্রান্ত তারিখ নিয়ে তার রচনা ‘তেরোশো বাইশ বাংলায় জন্ম আমার।/মা বলেছেন ফাল্গুন মাসের প্রথম মঙ্গলবার।’ আবদুল করিম তার গানের ছন্দে বর্ণনা করেছেন কীভাবে তিনি গানের জন্য তৈরি হলেন। গান তিনি নিজেই রচনা করতেন। সুরও দিতেন এবং গাইতেন। প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও তিনি মানুষের কর্ম, জীবন, দর্শন, দেহতত্ত্ব, গণসংগীত, নিগূঢ় তত্ত্ব, বিচ্ছেদ, সারি, আঞ্চলিকসহ দেশপ্রেমের গান রচনা করেছেন। প্রায় সাত দশক নানা ঘাতপ্রতিঘাত এবং কখনও কখনও প্রতিকূল পরিবেশে তিনি অপ্রতিরোধ্য গতিতে সংগীত সাধনা চালিয়ে গেছেন। ক্লান্তিহীন পথে নিজের অজান্তেই এমন কিছু গান সৃষ্টি করেছেন যা পরিশুদ্ধ ভালোবাসা বহন করে। রাজনীতি ও সামাজিক বিষয়ে দারুণ সচেতন বাউল করিমের গানে রয়েছে যুগান্তকারী নানা দিক। জ্বর, অসুস্থতা, বার্ধক্য তাকে গান রচনায় বাধা দিতে পারেনি।
সহজসরল ভাষায় ও রচনার চমৎকারিত্বে অসাধারণ স্বাদ পাওয়া যায় বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের গানে। আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সব স্তরে সরব পদচারণ রয়েছে তার। কথায় সৌন্দর্য ও সুরের আকর্ষণ থাকে রচনায়।
স্বশিক্ষিত শাহ আবদুল করিম ত্রিশের দশক থেকে একতারা নিয়ে যেসব ক্ষুরধার কাব্য রচনা করে গেছেন তা এক কথায় আমাদের সমাজের সব শ্রেণির মানুষের জীবনের সঙ্গে মেশে। আমরা এটা উপলব্ধি করতে পারি যে, মরমি কবিরা সাধারণত মৌলিক অনুভূতিতে আমাদের স্পর্শ করে থাকেন। আমরা মুগ্ধ হই। তার রচিত সংগীত ঘিরে আছে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা। বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর আমাদের ছেড়ে চলে যান পরপারে।