× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বৈশ্বিক বাণিজ্য

ধস নামাতে সক্রিয় ট্রাম্প

গ্যাবি হিনস্লিফ, গার্ডিয়ানের নিয়মিত কলামিস্ট

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১০:০৬ এএম

ধস নামাতে সক্রিয় ট্রাম্প

কোনো রাষ্ট্র কি অনেক ব্যর্থ হতে পারে? সকালে স্টক মার্কেটের তথ্য পাওয়ার পর যে বিষণ্ন পরিবেশ তৈরি হয়, তা এক বিরাট ধসের দিকে ইঙ্গিত করে। আর এমন অবস্থা বুঝিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র হাঁচি দিলে গোটা বিশ্বের সর্দি লেগে যায়Ñ এ ধরনের হাস্যরস অবশ্য বহু পুরোনো। কিন্তু যখন যুক্তরাষ্ট্র চেইনস দিয়ে নিজের নাক কেটে ফেলার হুমকি দেয় এবং মাঝরাতে মাত্র দশ মিনিটের মধ্যে সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে তখন আসলে তাদের অবস্থান বোঝার আর উপায় থাকে না। বৈশ্বিক অর্থনীতি বর্তমানে অনেকটা লিজ ট্রাস পরিস্থিতির মুখোমুখি। পার্থক্য হলো এবার একটি রাষ্ট্র রয়েছে যেটি অন্য রাষ্ট্রকে ডুবিয়ে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এ ধরপাকড়ের খেলা চালিয়ে যেতে থাকে অর্থাৎ মেক্সিকোর ওপর ভয়াবহ ট্যারিফ প্রয়োগ করে আবার স্থগিত করে কিংবা মিত্রদের প্রায়ই ভয় দেখিয়ে কিংবা শঙ্কায় রাখার চেষ্টা করে; তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই একটি কৃষ্ণগহ্বরে রূপান্তরিত হবে। কদিন আগেই লস অ্যাঞ্জেলেসের দাবদাহ নিবারণে সহযোগিতার জন্য কানাডা তাদের দমকল বাহিনীর লোকজন পাঠিয়েছিল। সেই কানাডাকেই যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের ওপর এমন ট্যারিফ চাপানো হবে যা ‘কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রে কোনো দিন ছিল না’। এমনকি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর কথাও ভাবছেন ট্রাম্প।

সমাজমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘কর অনেক কমানো হবে, কানাডার মানুষকে আরও উন্নত সামরিক নিরাপত্তা দেওয়া হবে এবং টারিফ থাকবে না।’ অন্যদিকে তিনি এও আশ্বস্ত করেন, কানাডা দখল করার কোনো ভাবনা তার নেই। ডেনমার্কের ক্ষেত্রেও একই অস্বস্তি আমরা দেখতে পাই, যেখানে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা দাবি করেন। কিন্তু এবার শুধু লেনদেনের মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন করার তাগাদা ছিল। কানাডায় সদ্য পদত্যাগ করা প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এবং নতুন করে দায়িত্ব পাওয়া ডানপন্থি পপুলিস্ট পিয়েরে পলিভের পাল্টা লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থাৎ কদিন আগে কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর কথাটি আর নিছক রসিকতায় সীমাবদ্ধ নেই। তবে গভীর রাতে জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে আলোচনার পর ট্যারিফ বাড়ানোর হুমকি সাময়িক স্বস্তি আনতে পারে। কিন্তু কমনওয়েলথ সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রের প্রতি এমন অবমাননায় যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া ডাউনিং স্ট্রিটে অনেক বড় ঘটনা। এমনকি অন্টারিও সুপারমার্কেটে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত বিয়ার সরিয়ে ফেলা হয় এবং বিশ্বের সবচেয়ে ভদ্র রাষ্ট্রটি সপ্তাহান্তে আইস হকি ম্যাচের আগে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় দুয়োধ্বনি দেয়। হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি ট্রাম্প পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছেন। কারণ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার ২৭ ইউরোপীয় ইউনিয়ন নেতাদের সঙ্গে ব্রেক্সিটের পর প্রথম আলোচনায় বসবেন। এ আলোচনার মাধ্যমে ব্রিটেন বিভক্তির পরও কোনোভাবে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি জোর পেয়েছে। বিষয়টিকে দয়া ভাবলে হবে না। বরং এটিকে একটি ম্যানিফেস্টো বলা চলে।

কিন্তু বিশ্ব পাঠশালার বুলি এমন কিছু তুলে ধরেছে যা আসলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নয়। আমরা যদি ‘দ্রুত এগোই এবং সব ভেঙে ফেলি’ তাহলে কী হতে পারে? যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কি বাণিজ্য অংশীজনদের শোষণ করবেন না? কিংবা ব্রিটেন যদি তাদের বন্ডের বাজার যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বাড়িয়ে তুলতে পারে তাহলে র‍্যাচেল রিভসের উপস্থাপিত ধারের খরচ একেবারে নির্মূল করে ফেলা যাবে; তা হলেও কি হবে না? দুর্বল ইউরোপের সুযোগ নিয়ে কোন শত্রুপক্ষ বেশি লাভবান হবে? কেউ মানুক আর না মানুক, ইউরোপ এখন একত্র। এক পরাশক্তির হুমকি থেকে বাঁচার সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু হয়েছে যে পরাশক্তির কাছে পশ্চিমারা বরাবরই নিরাপত্তা চেয়ে এসেছে। অথচ বর্তমানে যা ঘটে চলেছে তা অনেকে বিশ্বাসই করতে পারছে না। শুধু একটি কারণে এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। অতিমানবীয় ট্রাম্প (তার নিজের মতে) তার নীতিগত পরিকল্পনায় একটি ভালো পরিকল্পনা গড়ে তুলেছেন, ট্যারিফই সব সমস্যার সমাধান।

রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা থাকার পরও এখন হুমকির মাধ্যমে এসব বাস্তবায়ন অবশ্যই একটি বড় উদ্যোগ; যেমনটি তিনি কলাম্বিয়ার ক্ষেত্রে করেছিলেন; প্লেন ভর্তি অভিবাসীদের ফেরত পাঠিয়েছেন এবং এখন মেক্সিকোকে সীমান্তে সেনা নিয়োজিত করতে বাধ্য করেছেন। এমন কোনো দাবি যদি তিনি যুক্তরাজ্যের কাছে করেন তাহলে অন্যথা হওয়ার সুযোগ কম। ট্রাম্পের কাছে করের বদলে ট্যারিফ বাড়িয়ে অর্থ আদায়ের পথ বেশি সহজ বলে মনে হয়েছে। শুধু নিজের নীতিগত এবং শক্তিমত্তাগত অবস্থানের কারণে সহযোগীদের ওপর তিনি ট্যারিফ বাড়াচ্ছেন। এ ট্যারিফ বাড়ানোয় আদৌ কি লাভ হবে? যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এমনিতেই মূল্যস্ফীতির চাপে জর্জরিত। এখন তাদের আমদানি করা পণ্যে আরও বেশি খরচ করতে হবে। এমনকি নিজেদের বাড়িতেও আমদানি করা পণ্য ব্যবহার করতে গেলে খরচ বাড়বে। অথচ এ বিলিয়ন ডলার যৌক্তিক হারে ট্যাক্স মওকুফের মাধ্যমেও সমাধান করা সম্ভব ছিল। আর যদি রাষ্ট্রপতি এক রাতের ব্যবধানে নিজেদের বিশ্বের প্রথম সারির অর্থনীতি হিসেবে তৈরি করতে চান তাহলে আয়কর থেকে সমন্বয় করে কিংবা ধনিক গোষ্ঠীর ভোগ করা পণ্যের ওপর করের হার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অন্যদের অর্থনীতিও স্থিতিশীল করতে হবে।

তাত্ত্বিকভাবে বাজারে এখন দ্রব্যমূল্য এমন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে যাকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ‘ইতিহাসের সবচেয়ে মূর্খ বাণিজ্যযুদ্ধ’ আখ্যা দিয়েছে। ট্রাম্প এ বিষয়টি খোলামেলাভাবেই প্রচার করেছেন। সম্প্রতি নিক্কেই জাপান, লন্ডনের এফটিএসই এবং ওয়াল স্ট্রিটের ইনডেক্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ‘বাণিজ্য অসহযোগিতামূলক’ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্যারিফ বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত বেশি দিন টিকবে না। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতিতে আরও ভয়াবহ ঝড় আসতে চলেছে। গত সপ্তাহে এলন মাস্কের মিস্টিরিয়াস হ্যাচেট দলের সদস্যরা জানান, তারা ব্যস্ত ছিলেন এবং এ ব্যস্ততার ফলে তারা সরকারি ব্যয়ে দিনপ্রতি ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাশ্রয়ের একটি পথ খুঁজে পেয়েছেন। এজন্য তারা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কম্পিউটার সিস্টেম লক করে দিয়েছেন এবং কংগ্রেসের বাজেট নির্ধারণের ক্ষমতাও ডিঙিয়ে গেছে। এসব সাশ্রয়ে সরকারের বাণিজ্যিক চুক্তিতে এখনও ভয়াবহ অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়নি এটাই বিস্ময়কর। কারণ এর ফলে বাজারে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা। বিশেষত জনজীবনে এর প্রভাব হবে আরও ভয়াবহ।

যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ বৈদেশিক কর্মকাণ্ডকে প্রথমে ‘ইন্টু দ্য উডচিপারে’ ফেলা হয়। এলন মাস্কই এ ঘোষণা দেন। গোটা বিশ্বে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম বাতিল করে দেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দূর করার উপায় বন্ধ, শিশুদের ভ্যাকসিন দেওয়া বন্ধ এবং ভবিষ্যতে আরও ভয়ংকর মহামারি ছড়ানোর পথও বন্ধ। বিশেষত রাশিয়া ও চীনের বৈশ্বিক সফট পাওয়ার মেকানিজমের সঙ্গে লড়াইয়ের কাজটিও বন্ধ হয়ে গেল। বিশ্বের অধিকাংশ অস্থিতিশীল রাষ্ট্রের জন্য এ সবকিছুই বড় শঙ্কার বিষয়।

যেহেতু কেউই যুক্তরাষ্ট্রকে আবার গরিব করার জন্য ভোট দেয়নি, সাধারণ মার্কিনিরা হয়তো দ্রুতই ক্লান্ত হয়ে যাবে। কিন্তু ব্রেক্সিট দেখিয়েছে, ভোটারদের মাঝেমধ্যে কিছুটা হলেও সংযমী হতে হয়। কারণ, এ পরিণতি তারা নিজেরাই ডেকে এনেছে। যদিও ব্রিটেন কিছুটা স্বাভাবিক হালে রয়েছে কিন্তু বিশ্ববাণিজ্যের এ পরিবর্তনে বেশি দিন তারা থিতু থাকতে পারবে না। ব্রিটিশ সরকারকে অনেকটা সিসিফাসের মতো কঠিন কোনো কাজ করতে হয়েছে। অনেকটা বাধ্য হয়েই তাদের এমনটি নিতে হয়েছে। নাইন ইলেভেন থেকে শুরু করে ব্যাংকিং খাতে ধস, ব্রেক্সিট এবং তারপর করোনা মহামারি দেশটিকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। এখন কিয়ের স্টারমারকে একত্র হয়ে সম্মিলিতভাবে এ সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। কারণ, সামান্য একটি বিষয় পুঁজি করেই যুক্তরাষ্ট্র গোটা বিশ্বে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। এমনটি অনেকাংশে বাণিজ্যযুদ্ধও বাধিয়ে দিতে পারে। অনেকে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতার জন্য অপেক্ষা করার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু ইউরোপ এতদিনে সব দেখেছে। আর দেখার পর এতটুকু নিশ্চিত হয়েছে, কৌশলগুলো ধ্বংসাত্মক। ফলে ইউরোপকে এখন পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েই এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।

দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ : আবেদিন আকাশ


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা