জাতীয় সংসদ নির্বাচন
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:২০ এএম
হোসেন আবদুল মান্নান
স্থানীয় বা জাতীয় যেকোনো নির্বাচনেই রিটার্নিং অফিসাররা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। নির্বাচনকালে বা আগে ও পরে নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে রিটার্নিং অফিসারই সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এর কারণ প্রথমত, তিনি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিয়োজিত হন। কাজেই কমিশনের যাবতীয় নির্দেশনা তার মাধ্যমেই কার্যকর হয়ে থাকে। তার সঙ্গেই দাপ্তরিক যোগাযোগ রক্ষা করা হয়, দ্বিতীয়ত, নির্বাচনী তথ্য-উপাত্ত ও সহায়ক সরঞ্জামের জিম্মাদারও তিনি। যদিও একটা সুষ্ঠু, অবাধ, সুশৃঙ্খল নির্বাচন পরিচালনা করার সঙ্গে আরও একাধিক সহযোগী সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারণ ভূমিকা রয়েছে। একই রকম ভূমিকা রয়েছে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের এবং তাদের সমর্থকদের। সম্প্রতি ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সে সময় দায়িত্ব পালনকারী রিটার্নিং অফিসার বা জেলা প্রশাসকরা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, (আরপিও) ১৯৭২-এর ৩৬ থেকে ৪৪ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত বর্ণনামতে রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক নির্বাচন গ্রহণ, ফলাফল তৈরি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি করার কথা বলা আছে। তবে জাতীয় সংসদসহ যেকোনো নির্বাচনেই কেন্দ্রে নির্বাচন তদারকি করে থাকেন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা। অর্থাৎ প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার এবং অন্য দায়িত্ব পালনকারীরা। কেন্দ্রের ভেতর এবং বাইরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব মোতায়েনকৃত শৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড, পুলিশ, র্যাব, আনসার, গ্রামপুলিশসহ গোয়েন্দা সংস্থাও উৎসাহী এবং তৎপর ছিল। নির্বাচনে অনিয়ম বা রাতে ভোট হলে এর দায় এদের সবাইকেই নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কেবল রিটার্নিং অফিসারকে বিশেষভাবে দায়ী করা যথাযথ হবে না বলে সুশীল সমাজ মনে করে। যা ইতোমধ্যে টকশো ও সমাজমাধ্যমে কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্ত করছেন। বরং ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা সবাই সমানভাবে দায়ী হবেন। রিটার্নিং অফিসারকে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলেও কেন্দ্র সুরক্ষার দায়িত্ব তার ওপর নয়। তাকে মূলত নির্বাচন অনুষ্ঠানের সামগ্রিক দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন এবং সমন্বয় সাধন করতে হয়। কেন্দ্রে ভোট চুরি, জালভোট দেওয়া, জোরজবরদস্তি করে ব্যালট বাক্সে হাত দেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে প্রিসাইডিং অফিসার কর্তৃক অভিযোগ পেলে রিটার্নিং অফিসার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে এমন কোনো অভিযোগ ছিল কি না সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২বলে কেন্দ্রের নির্বাচন তাৎক্ষণিক বন্ধ, সাময়িক স্থগিতকরণ বা বাতিল করার ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রিসাইডিং অফিসারের। রিটার্নিং অফিসারের নয়। তবে যদি প্রিসাইডিং অফিসাররা এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা চান তবে রিটার্নিং অফিসাররা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। এটাই প্রচলিত বিধান। ২০১৮ সালের বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো প্রিসাইডিং অফিসার রিটার্নিং অফিসারের কাছ থেকে নির্দেশনা/সহযোগিতা চেয়েছেন কি না বা নির্দেশনা চেয়ে রিটার্নিং অফিসারের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাননি তা-ও তদন্ত সাপেক্ষে দেখা যেতে পারে।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ফলাফল বিষয়ে কোনো আপত্তি থাকলে বা অভিযোগ উত্থাপিত হলে তাকে নির্বাচন ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার বিধান রয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ প্রেরণ করার কোনো তথ্য রিটার্নিং অফিসারের কাছে এসেছে কি না তা-ও যাচাই করা যায়। রিটার্নিং অফিসারের কাজ মূলত নির্বাচন ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত। ভোট গ্রহণ ও ফলাফল তৈরি। তবে ফলাফলের বিষয়ে অভিযোগ নিষ্পত্তির এখতিয়ার আরপিও আদেশে রিটার্নিং অফিসারকে দেওয়া হয়নি।
নির্বাচনে কারচুপি, ব্যালটবাক্স ছিনতাই, অনিয়ম হলে এর প্রাথমিক দায়িত্ব প্রিসাইডিং অফিসারের ওপর বর্তায়। কেন্দ্রের ভোট স্থগিতকরণ, সাময়িক বন্ধকরণ, রিটার্নিং অফিসারকে রিপোর্টসহ যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার তার রয়েছে। তিনি কেন্দ্রের অভ্যন্তরে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাবান ব্যক্তি। তিনি স্বয়ং ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
নির্বাচন সংস্কার কমিশন অনেকদিন কাজ করে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছে। বর্তমান নির্বাচনব্যবস্থায় একটা সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পথে কী কী অন্তরায়, ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা আছে সেসব চিহ্নিত করে সমাধানের বিষয়ে সুপারিশ করেছে এবং এটাই জনপ্রত্যাশা ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সুপারিশমালায় কাদের দিয়ে নির্বাচন করালে তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে, মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত কেন্দ্রে যেতে পারবে এর একটা সুস্পষ্ট গাইডলাইন থাকা প্রয়োজন। নির্বাচনকালে সরকারে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, ইলেকশন কমিশন সচিবালয়ের বিদ্যমান কাঠামোয় ও কার্যপ্রণালিতে নতুন কিছু সংযোজন-বিয়োজন হবে কি না ইত্যাদি বিষয়ে সুপারিশ ও যৌক্তিক মতামত।
অতীতে নির্বাচনে যারা নির্বাচন কমিশনের পক্ষে দায়িত্ব পালন করেছেন তারা মূলত কমিশনের মাধ্যমে সরকারের ইচ্ছাই বাস্তবায়ন করেছেন। এর দায় কমিশনকে বেশি বহন করতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে এর পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেদিকে নজর দেওয়াই হবে প্রধান কাজ। বলা বাহুল্য, এ দেশে সরকারি কর্মচারীরা কখনও নিরঙ্কুশভাবে স্বাধীন ছিল না, ভবিষ্যতেও এদের শতভাগ স্বাধীন বা নিরপেক্ষ করা সহজ কাজ নয়। তবে বিকল্প কী?