খাদিজা নীপা
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:১১ এএম
৩০ জানুয়ারি মিরপুর মুক্ত দিবস। ১৯৭২ সালের এই দিনে মিরপুর মুক্ত করতে লেফটেন্যান্ট সেলিমের নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের ৪১ জন সামরিক বাহিনীর সদস্য, শতাধিক পুলিশ এবং মুক্তিযোদ্ধা জীবন উৎসর্গ করেন। লে. সেলিম সেদিন অবরুদ্ধ মিরপুরে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। ৩১ জানুয়ারি মুক্ত হয় মিরপুর। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও মুক্ত হয়নি মিরপুর। দেশ স্বাধীনের প্রায় দেড় মাস পর তৎকালীন সরকার অবরুদ্ধ মিরপুরে অবাঙালি এবং লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানিদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধারের নির্দেশ দেয়। তখনকার লে. হেলাল মোর্শেদ, লে. সেলিম, ডিএসপি লোদীসহ ৩০০ পুলিশ এবং ১৪০ সৈনিক-মুক্তিযোদ্ধা মিরপুর যুদ্ধে অংশ নেন।
সেদিন লে. সেলিমসহ অন্যরা মিরপুর ১২ নম্বর পানির ট্যাংকের সামনে আসেন সকাল ১০টায়। ১১টায় ঘটনাস্থলে গোলাগুলি শুরু হয়। ওই সময় ১২ নম্বর পানির ট্যাংকের পেছন থেকে প্রথম গুলি ছোড়া হয়। রাস্তার অন্য পাশে কাঁঠাল গাছের ফাঁক দিয়ে একটি গুলি ছুটে এসে সেলিমের ডান বুকে লাগে। সেলিম লুটিয়ে পড়লে তাকে একটি ঘরে নিয়ে যান হেলাল মোর্শেদ। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে উঠে দাঁড়ান সেলিম। কিংবদন্তি বীরদের মতো, নিজের শার্ট দিয়ে বেঁধে ফেলেন নিজের বুক। সহযোদ্ধাদের বলেন, ‘আমি বেঁচে থাকতে তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি না।’ ঠাঠা গুলিতে লাল হয়ে ওঠে যোদ্ধাদের স্টেনগান। পরাস্ত হয় পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসররা। মুক্ত হয় মিরপুর। কিন্তু খোঁজ নেই লে. সেলিম ও তার দলের অনেকের। মিরপুরের বিভিন্ন স্থানে খোঁজা হয় সেলিমসহ সবাইকে। কিন্তু কোথাও খোঁজ পাওয়া যায়নি। অসংখ্য যেসব লাশ ভাসছিল কালাপানিতে তা ছিল বন্দি বাঙালি ও সাধারণের। ঢালে পড়ে ছিল চেনা যায় না এমন টুকরো টুকরো লাশের অংশ।

মিরপুর অভিযানে বন্দি হয়েছিল ১০ হাজার অবাঙালি। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের সদস্যরা বিকালে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে ব্যারাকে কেউ কেউ ফেরত এলেও অনেকেই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তবে আজও প্রশ্ন রয়েছেÑ সেদিন মিরপুরে কী ঘটেছিল, কেন শহীদদের লাশ, হাড়গোড়ের অবশিষ্ট মিরপুরের ১২ নম্বর সেকশন তথা জল্লাদখানা ও কালাপানির ঢালে ফেলে রাখা হয়েছিল? তা এখনও অজানা। কেউ কেউ বলেন, মিরপুরকে পাকিস্তানি সেনা তথা তাদের দোসরমুক্তকরণ অভিযানটি ছিল অপরিকল্পিত। আরও সচেতন হলে অনেক সৈনিকের জীবনই রক্ষা পেত। শহীদ লে. সেলিম মিরপুরে শহীদ হওয়ার পর ঘাতকরা তার দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলে রাখে। পাকিস্তানি দোসরদের যত ক্ষোভ যেন তার ওপরই। লে. সেলিমের মৃত্যুর পর থেকে মিরপুরের তরুণ সংঘ এবং শহীদ লে. সেলিম মঞ্চ তার নামে একটি প্রধান সড়কের নামকরণ এবং মিরপুরের নাম বদলে সেলিমবাদ বা সেলিমনগর করার দাবি করে আসছে। কিন্তু ৫৩ বছরেও লে. সেলিমের আত্মত্যাগের সম্মান জানাতে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দাবি পূরণ করা হোক বা না হোক, জনগণের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন শহীদ লে. সেলিম ও তার সহযোদ্ধা। অবরুদ্ধ মিরপুর মুক্ত করতে গিয়ে শহীদ লে. সেলিমসহ যেসব বীর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তাদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।