যুক্তরাষ্ট্র
এমিলি মেইটলিস্ট
প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:০৬ এএম
এমিলি মেইটলিস্ট
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্যাপিটল হিলে দাঙ্গাকারীদের ক্ষমা করেছেন। বিষয়টিকে শুধু মানবিক একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার শপথ নেওয়ার দিনটিতে অনেক মানুষ জড়ো হয়। ওয়াশিংটন মল ছাড়িয়ে জনতার ভিড় বড় হতে থাকে। অথচ শপথের দিন আয়োজনটি ছিল টিভিতে পরিপূর্ণ ডোম হলে। আমরা তাই ট্রাম্পের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি দেখতে পেয়েছি। তার হাসি কিংবা গম্ভীর মুখ, সবই আমাদের চোখে পড়েছে। এমনকি আগের প্রেসিডেন্ট ও তাদের ফার্স্ট লেডিদের অভিব্যক্তিও ছিল দেখার মতো। ট্রাম্পের ঠিক দুই সারি পেছনেই টেক জায়ান্টদের অবস্থান ছিল এবং এ বিষয়ে ট্রাম্প সাহসী মন্তব্য করেন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে নতুন ব্যবস্থায় এক নতুন ধরনের অভিজাততন্ত্রের জাগরণ ঘটবে। তবে মূল আয়োজনকে প্রশংসা করতেই হয়। ক্ষমতার একদম কেন্দ্রবিন্দুতেই যেন ট্রাম্প শপথ নিয়েছেন। অথচ চার বছর আগেই এ দৃশ্যটিকে সংঘাত, সহিংসতা ও রক্তপাতে রূপ দেওয়া হয়। ওই সময় ট্রাম্পের সমর্থকদের একাংশ হলের ভেতর জোর করে ঢোকার চেষ্টা করে। মূলত নির্বাচন স্থগিত করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।

শপথগ্রহণ এমন একটি আয়োজন যা ইতিহাস নির্মাণ করে। এর বৈশিষ্ট্যই এমন। নতুন প্রেসিডেন্ট এদিন উৎফুল্ল থাকেন। পরাজিত নির্বাহী প্রধান বিজয়ী নির্বাহী প্রধানের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে বাটন তুলে দেন। কিন্তু ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানের দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত. তার শপথগ্রহণ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে আবার পুরোনো ইতিহাসও পুনর্নির্মাণ করেছে। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পাওয়ার ঠিক ১০ ঘণ্টাও পার হয়নি, ডোনাল্ড ট্রাম্প নিখুঁত নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ছিলেন। ওয়াশিংটনে এত বড় নিরাপত্তাবেষ্টনী আগে দেখা যায়নি। এমন সময়েই ট্রাম্প আচমকা ক্যাপিটল হিল দাঙ্গার ১ হাজার ৫০০ অভিযুক্তকে ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত নেন। নিজের দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প তাদের ক্ষমা করে একটি কথাই প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন, দাঙ্গাকারীরা সঠিক কাজটিই করেছেন। কারণ ট্রাম্পের কাছ থেকে জোর করে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
ন্যাশনালিস্ট মিলিশিয়া গ্রুপের ১৪ সদস্য মূলত প্রাউড বয়েস এবং ওথ কিপার্স নামক সংগঠনের দ্বারা পরিচালিত। এ সংগঠনের ১৪ সদস্য কারাগারে। তাদের মধ্যে সংগঠনের প্রধান ও সাবেক প্রাউড বয়েস নেতা ২২ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। লুইসিয়ানায় একটি সেলে সরকারের বিরুদ্ধে সহিংস কার্যক্রম করায় তাকে এ শাস্তি দেওয়া হয়। এ লেখাটির সময় তাকে এখনই কারাগার থেকে মুক্ত করা হচ্ছে। তেমনি শখানেক আরও বন্দির ‘বিনাশর্তে’ মুক্তি দেওয়া হবে। এমনকি তাদের পূর্ববর্তী অপরাধের তথ্যও মুছে ফেলা হবে। এভাবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হবেন। সেভাবেই তাদের উপস্থাপন করেছেন ট্রাম্প। ট্রাম্প নিজেই এদের ‘জিম্মি’ বলে অভিহিত করেছেন।
ক্যাপিটল হিল দাঙ্গার বিচার করতে মাস এমনকি বছরও লেগেছে। বিচার বিভাগের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অপরাধী অনুসন্ধান বলা যায় এটিকে। একদম তদন্তকারী এলেক্সিস লোয়েব ৬ জানুয়ারি সহিংসতা ঘটনার তদন্তে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ শুনে বলেন, আপনি সহিংসতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা এড়ানোর উপায় একটিই। যতক্ষণ পর্যন্ত একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির সহযোগিতা পাচ্ছেন ততদিন আপনি পার পেয়ে যাওয়ার আশা রাখতেই পারেন। বিষয়টি এখন শুধু দাঙ্গাকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যারা এতদিন জেলে ছিলেন তারাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ বিষয়টি ট্রাম্পের জন্যও জরুরি। ট্রাম্পের জন্যই এমন সিদ্ধান্ত।
ট্রাম্পের এ সাধারণ ক্ষমা শুধু আন্তরিকতা থেকে করা নয়। বরং এটি এক ধরনের সংস্কার। ট্রাম্প তার নিজের অপরাধ ক্ষমা করার জন্যই এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের সঠিক সিদ্ধান্তকে বারবার লঙ্ঘন করার পরও তিনি একবারও ক্ষমা চাননি। উল্টো ট্রাম্প এ মব থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি এ জনগণকে অযাচিত হস্তক্ষেপকারী আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এ অযাচিত আগন্তুকরা যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী ব্যবস্থা ক্ষতির মুখে ফেলছে। নতুন প্রেসিডেন্ট এখন অতীতের এসব ঘটনা অর্থাৎ সে লজ্জা ধামাচাপা দিতে চাইবেন। কারণ এ দাঙ্গাকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও ঘৃণ্যজন তো তিনিই। এ দাঙ্গায় তার সম্পৃক্ততা কোনোভাবেই এড়াতে পারবেন না।
ট্রাম্প যেদিন এ সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন সেদিনই জো বাইডেন অফিসে শেষ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তিনি তার পরিবারের সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা করেন, কারণ এ ঘটনায় তাদের কোনো অন্যায় ছিল না কথাটিতে জোর দেন। বিদায়ি প্রেসিডেন্টের জন্য এমনটি সত্যিই উপযুক্ত কিছু ছিল না। বরং বিষয়টি অনেক দেরিতে এসেছে। তার নীরবতার মধ্যেও এক ধরনের কাপুরুষতা দেখা গেছে। একজন বিদায়ি প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে যে ভূমিকা বা অভিব্যক্তি তিনি গড়তে পারতেন তা পারেননি। ডেমোক্র্যাটদের জন্য তিনি সমস্যাই বাড়িয়েছেন। তাদের মাথাব্যথার বড় কারণ হয়েছেন এবং ট্রাম্পের নিজস্ব কর্মকাণ্ডের পরও বাইডেনের ওপরও তা চেপে বসেছে।
এমন তুলনায় মিথ্যা সাম্যতা তৈরি হয়। ট্রাম্পের হুমকির বিপরীতেই বাইডেন সব করেছেন। অন্তত ভবিষ্যতের কথা তাকে ভাবতে হয়েছে। কারণ একসময় তিনি ট্রাম্পকে গণতন্ত্রের বড় হুমকি বলেই চিহ্নিত করেছেন। ট্রাম্প যদি পলিটিক্যাল ভেনডেটায় বিশ্বাসী হন তাহলে বাইডেন তাকে বিশ্বাস করেন। তিনি জানেন ট্রাম্প এ কাজ করতে পারবেন। কংগ্রেস সদস্য জ্যামি রাসকিন বলেন, ‘সকালে কাউকে ক্ষমা করে আবার বিকালেই আসামি বানিয়ে ফেলা যায়।’ শুধু ট্রাম্পের অনুসারীদের এ পরিণতি হবে না। তাদের উল্টো রাজবন্দি আখ্যা দিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বানিয়ে ফেলা হবে।
কীভাবে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় ট্রাম্প ভালোই জানেন। তার কথাগুলো সাধারণ মানুষকে গেলানোর বিষয়েও তিনি সিদ্ধহস্ত। আর নতুন প্রশাসনের অধীনে এমন ঘটনার সঙ্গে আমাদের মানিয়ে নিতেই হবে। অতীতের সেই সুখপাখির যুগ আর নেই। আমরাই ইতিহাসের নির্মাতা এ কথা আর বলা যাচ্ছে না। বরং আমাদের চোখের সামনেই ইতিহাস পুনর্লিখিত ও পুনর্মার্জন করা হচ্ছে।
আই পেপার ইউকে থেকে অনুবাদ : আবেদিন আকাশ