মতি লাল দেব রায়
প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:০১ এএম
দেশবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। দেশে সবচেয়ে সম্প্রসারিত এবং বৃহত্তম অবকাঠামো আছে এই মন্ত্রণালয়ের। তাই জনসম্পৃক্ত এই মন্ত্রণালয়টির কোন কোন অংশ সংস্কার করা দরকার তার একটি চিত্র তুলে ধরছি। বর্তমান সেবা কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের স্বাস্থ্যগত মানের কী পরিমাণ অগ্রগতি হয়েছে। দেশের কত ভাগ মানুষের নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে, কত ভাগ মানুষ শতভাগ জীবাণুমুক্ত স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার করে, গর্ভবতী মায়েরা নিরাপদ ডেলিভারির আওতায় এসেছেন, দেশে কতজন যক্ষ্মা রোগী মালটি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট হয়ে পুনরায় ওষুধ খাওয়া শুরু করেছে। টিবি ড্রাগ সরবরাহ চেইন নিয়মিত কাজ করছে কি? এসব প্রশ্ন প্রথমে সামনে আসছে।
দেশের অধিকাংশ উপজেলা হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ থাকে না। দায়িত্বে থাকা ডাক্তাররা সময়মতো উপজেলা হাসপাতালগুলো যান না এবং অনেকেই নির্ধারিত সময়ের আগে হাসপাতাল ছাড়েন। প্রায় প্রতিটি জেলায় অসংখ্য অবৈধ ক্লিনিক ব্যবসা গড়ে উঠেছে। এমনকি কোনোরকম বৈধতা ছাড়া গ্রামে-হাটে বাজারে অসংখ্য ফার্মেসি ডাক্তার-প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রি করছে। এদের নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কী কারণে সঠিক নিয়মে চলছে না, এসব বটলনেক্স কীভাবে দূর করা যায় তাও সংস্কারের আওতায় আনতে হবে। দেশের ৩ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকের বর্তমান অবস্থা কি? দেশে যক্ষ্মা রোগীর মৃত্যুহার হ্রাস পাচ্ছে কি? এইচআইভি এইডসের সংক্রমের হার কতটুকু কমেছে? অপুষ্টিজনিত শিশুমৃত্যুর হার কমছে কি? এসব প্রশ্ন তো রয়েছেই। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে বড় বড় সাইনবোর্ড লাগানো হাসপাতালে নিজস্ব ডাক্তার ছাড়া রোগীকে আইসিইউতে রেখে টেলিফোন করে বাইরে থেকে ডাক্তার আনার অভিযোগ আছে। এসব হাসপাতাল অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া দরকার। ভুয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো চিহ্নিত করে বন্ধ করা খুবই জরুরি। পদক্ষেপ থাকা সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে সরকারের স্বাস্থ্যসেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে কেন সম্ভব হচ্ছে না, তা চিহ্নিত করে সংস্কারের আওতায় আনা জরুরি। কিছু উপজেলা হাসপাতাল ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এবং কোনো কোনো উপজেলায় ১০০ শয্যাবিশিষ্ট। কিন্তু বেশিরভাগ হাসপাতালে সন্ধ্যার পর ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করে। বেশিভাগেরই বেডে কোনো রোগী পাওয়া যাবে না। এমন অভিযোগও রয়েছে, রোগীরা হাসপাতালে থাকতে নিরাপদ অনুভব করেন না। রয়েছে আবর্জনার গন্ধ, কক্ষগুলো অপরিষ্কার। সরকারি বড় হাসপাতালে রোগী নিয়ন্ত্রণ করে একশ্রেণির দালাল। হাসপাতালে বহিরাগতদের উপদ্রব তো লেগেই আছে। মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভরা অবাধে ডাক্তারদের কাজের সময় নষ্ট করেন।
মেডিকেল বর্জ্য যেখানে সেখানে ফেলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করছে। হাসপাতালগুলোতে যক্ষ্মার ভ্যাকসিন, মিসেলসের ভ্যাকসিন ঢাকার কেন্দ্রীয় ঔষধাগার থেকে উপজেলা হাসপাতালে সঠিক নিয়মে তাপমাত্রা, কোল্ড চেইন মেইনটেন করে পরিবহন করা হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া উচিত। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে যে প্রাথমিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন প্রয়োজন তা হচ্ছে তাদের শতভাগ স্যানিটেশন এবং শতভাগ নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; যার কোনোটা করা সম্ভব হয়নি এ দীর্ঘ সময়ে। জানা গেছে, ২০২১ সালে ৩ লাখ ৭৫ হাজার যক্ষ্মা রোগীর কেস শনাক্ত হয়, যার মধ্যে ৪৩ হাজার যক্ষ্মা রোগী মারা যায়। আর সেবার মোট ১ হাজার ৬০১ জন ড্রাগ রেজিস্ট্রি রোগী শনাক্ত হয়; যার মধ্যে ১ হাজার ৪৮৮ জনকে চিকিৎসার জন্য নথিভুক্ত করা হয়।
স্বাস্থ্যসেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হলে এ বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে। শহরসহ গ্রামের পশ্চাৎপদ, পিছিয়ে পড়া মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্যই স্বাস্থ্য সেক্টর। আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য খাত সংস্কারে সরকার যে উদ্যোগ নেবে, উল্লিখিত বিষয়গুলো জনস্বার্থে বিচেনায় রাখবে।