× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চাই মানসম্মত শিক্ষা

মো. ফজলুল করিম পাটোয়ারী

প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:০৮ এএম

মো. ফজলুল করিম পাটোয়ারী

মো. ফজলুল করিম পাটোয়ারী

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের রেওয়াজ আরও জোরদার হবে এমনটিই প্রত্যাশিত। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়ার কথা। মানুষের জীবনের মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা। শিক্ষা অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মৌলিক অবকাঠামো থেকে শুরু করে অনেক কিছুর উন্নতিই সম্ভব। বিশেষত বর্তমান প্রজন্মের কাছে নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে পরিচালনা করে এবং এটি সবার জন্য সুযোগ নয় বরং অধিকার আর রাষ্ট্র ও সংবিধান স্বীকৃত। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে এ ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে বলা রয়েছে এবং আরও বলা রয়েছে, রাষ্ট্র নাগরিকের শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্র কর্তৃক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইনসহ বেশকিছু আইন ও জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০সহ বেশকিছু সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারিত রয়েছে। ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট ২০২২ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের দেশে শিক্ষার মোট ব্যয়ের ৭১ শতাংশই বহন করে পরিবার। আমাদের চেয়ে অর্থনীতিতে পিছিয়ে পড়া পাকিস্তানে তা ৫৭ শতাংশ। এমনটি অনেকাংশে অকল্পনীয়ই বলা চলে। ভারতে আর্থিক দিক থেকে ভালো অবস্থানে থাকা ২০ শতাংশ পরিবার, খারাপ অবস্থায় থাকা ২০ শতাংশ পরিবারের তুলনায় সরকারি, বেসরকারি অনুদানপ্রাপ্ত এবং অনুদানবিহীন সব রকম স্কুলে প্রায় চার গুণ বেশি ব্যয় করে।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর দিকে তাকালে দেখা যাবে, মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ২০১৮-এর মধ্যে ১:৩০-এ পৌঁছানোর কথা থাকলেও ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিচে নামেনি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বেতনের পরিমাণের দিক থেকে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম আর দক্ষিণ এশিয়ায় সপ্তম। অন্যদিকে সার্কভুক্ত আট দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম বেতন পাচ্ছেন বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষকরা। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের বেতনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে মালদ্বীপ; দ্বিতীয় অবস্থানে ভারত; তৃতীয় অবস্থানে ভুটান; চতুর্থ অবস্থানে নেপাল। তবে বাংলাদেশে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে এমপিওবহির্ভূত বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলো এবং এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এমপিওবহির্ভূত শিক্ষকরা। আর্থিক সুবিধার দিক থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের তুলনায় খানিকটা এগিয়ে থাকলেও সত্যিকারভাবে ভালো অবস্থায় নেই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। বিশ্বব্যাংক ও ইউনেস্কোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সব সময় প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষকদের দক্ষতা ও সুযোগসুবিধা বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়ে আসছে। সেই সঙ্গে অন্যান্য স্তরকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছে।

আমাদের শিক্ষা খাতের সব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাবিষয়ক নতুন ভাবনাগুলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে আগামীর দিনগুলোতে সবার মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই জয় করবে গোটা বিশ্বকে। কিন্তু দেশের যারা এখন শিক্ষাকাঠামোর অংশীজন তাদের নতুন প্রযুক্তি বাস্তবায়নের দোহাই দিয়ে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রাখা যাবে না। এমনটি করতে গেলে তাদের ভবিষ্যৎ বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়বে

শিক্ষা খাতের নানা অংশীজনের মধ্যে সবচেয়ে প্রধান অংশীজন হলো শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পাশাপাশি শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিভাবক, সমাজের মানুষ এবং রাষ্ট্র সবাই শিক্ষা খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। তবে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী শ্রেণিকার্যক্রমের মাধ্যমে পুরো কাঠামো সচল রাখতে মুখ্য ভূমিকা এবং অন্যান্য অংশীজন সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। দেশের শিক্ষা নিয়ে নতুন করে তাই ভাবতে হলে উল্লেখ্য বিষয়গুলো কোনোভাবেই বাদ দেওয়ার অবকাশ নেই। বরং সুবিবেচনায় রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনও প্রয়োজনীয় সংস্কার আর পরিমার্জনের বিষয়টিকে বাড়তি গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন শিক্ষার গুণগত আর পরিমাণগত মানোন্নয়নের বিষয়ে তুলনামূলক কিংবা দেশের প্রেক্ষাপটে চাহিদার বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষাকার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। যার অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে শিক্ষকদের মানোন্নয়ন, যেখানে শিক্ষকদের উন্নত প্রশিক্ষণ, গবেষণা সহায়তা এবং তাদের প্রয়োজনীয় মানসম্মত বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকারী শিক্ষকের মতামতের প্রতি কার্যকর গুরুত্ব দিয়ে তার আর্থসামাজিক মর্যাদা নিশ্চিতে বিশ্বব্যাপী শিক্ষায় একটি নতুন সামাজিক চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টিকেও বাড়তি গুরুত্ব দিতে হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, করোনা মহামারিসহ নানা সংকটেও এটা নিশ্চিত হয়েছে যে, অনুকূল পরিবেশ এবং স্বায়ত্তশাসন পেলে শিক্ষকরা শিক্ষায় যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং এমন সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারেন, যা শিক্ষা ও শিক্ষার্থীর উন্নয়ন নিশ্চিত করে। এসব গবেষণায় আরও দেখা যায়, শিক্ষকরা শিক্ষার বিষয়গুলো আয়ত্ত করে পাঠক্রমের বিষয়বস্তুকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করেন, সাধ্যমতো শ্রেণিকক্ষে সব ধরনের শিক্ষার্থীর দিকে মনোযোগ দেন এবং শ্রেণিকক্ষে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সচেষ্ট থাকেন।

শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় অর্জন, অগ্রগতি সাধন ও তাদের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে যথাযথ ভূমিকা রাখা সত্ত্বেও তাদের সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কথা বা পরামর্শ যথাযথভাবে বিবেচিত হয় না। শিক্ষকতা পেশাকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের কণ্ঠস্বর খুব কমই শোনা যায় বা মতপ্রকাশ করতে তাদের খুব একটা উৎসাহ দেওয়া হয় না। যদিও শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত বিকাশ ও উন্নয়নের জন্য তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাসংক্রান্ত যেকোনো নীতি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিক্ষকসমাজের প্রতিনিধির অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন সর্বাগ্রে। ডিজিটাল শিক্ষার সম্প্রসারণ ও হাইব্রিড লার্নিং মডেলÑ প্রযুক্তি ব্যবহার আরও বিস্তৃত করতে হবে, যেমন ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, ভার্চুয়াল ক্লাসরুম এবং অ্যাডাপটিভ লার্নিং টুলস। কোভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে অনলাইন শিক্ষা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০২৫ সালে এটি আরও উন্নত এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে একীভূত করা প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে ফিজিক্যাল ক্লাসরুম এবং ডিজিটাল ক্লাসরুমের সমন্বয় ঘটানোর মাধ্যমে হাইব্রিড লার্নিং মডেল শিক্ষার্থীদের জন্য আরও নমনীয়তা এবং সুবিধা নিশ্চিত করবে।

মানুষ প্রতিনিয়ত শেখে, একসময় মাইলের পর মাইল হেঁটে জ্ঞান অর্জন করেছে। এখন ঘরে বসেই ইউটিউব, গুগলে সার্চ দিলেই পৃথিবীর সব তথ্য বেরিয়ে আসে। কিন্তু তার পরেও এগুলো আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বিকল্প হয়নি। কাস্টমাইজড ও স্কিলভিত্তিক শিক্ষাÑ শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা প্রদান করার পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং ডেটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর শক্তি, দুর্বলতা এবং আগ্রহ বুঝে তাদের জন্য উপযুক্ত পাঠ্যক্রম তৈরি করা হতে পারে। সেই সঙ্গে আধুনিক কর্মক্ষেত্রে সফল হতে তত্ত্বগত শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং স্কিল অর্জনেও গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। ফলে পেশাদার স্কিল, সফট স্কিল এবং টেকনিক্যাল স্কিলের ওপর গুরুত্ব বাড়বে। আর এখন অনেকে ফ্রিল্যান্সিং বা এমন ধরনের দক্ষতা সহজেই অর্জন করতে পারেন। কিন্তু সবার মধ্যে এক ধরনের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। তারা মনে করেন, কাজটি শিখলেই তারা কাজ পেয়ে যাবেন। ফ্রিল্যান্সিং বা প্রযুক্তির জগৎ অনেক প্রতিযোগিতামূলক এবং সেখানে প্রতিনিয়ত নিজের স্কিল ডেভেলপ করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক দক্ষতাÑ শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক দক্ষতার উন্নয়নের ওপর অধিক মনোযোগ দিতে হবে, কারণ এসব দক্ষতা আধুনিক জীবনে অপরিহার্য। বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও সামাজিক দক্ষতা নিশ্চিত ছাড়া সামনে এগিয়ে যাওয়া খানিকটা দুষ্কর।

বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল পর্যায়ে উপযুক্ত এবং দক্ষ শিক্ষকের চাকরি সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা কর্মমুখী প্রশিক্ষণ এবং ইন্টার্নশিপ সুবিধা পায়। এরাই পরবর্তীতে দক্ষ ও কর্মঠ মানবসম্পদ হিসেবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার প্রতি বিশেষ নজর প্রদান ও শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আমাদের শিক্ষা খাতের সব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাবিষয়ক নতুন ভাবনাগুলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে আগামীর দিনগুলোতে সবার মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই জয় করবে গোটা বিশ্বকে। কিন্তু দেশের যারা এখন শিক্ষাকাঠামোর অংশীজন তাদের নতুন প্রযুক্তি বাস্তবায়নের দোহাই দিয়ে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রাখা যাবে না। এমনটি করতে গেলে তাদের ভবিষ্যৎ বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। এমন ঝুঁকি এড়ানোর জন্যই মূলত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যদি তা না করা যায় তাহলে আমাদের শিক্ষাকাঠামোর আধুনিকায়ন কঠিন হয়ে উঠবে।

  • অধ্যাপক, তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা