সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:২৫ এএম
এবারে বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই উঠবে কি না তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে উদ্বেগই সত্যি হয়। প্রায় দেড় দশক পর এবারই বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বই ওঠেনি। বছরের প্রথম মাস গড়িয়ে দ্বিতীয় মাস দরজায়। ইতোমধ্যে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের দেখা পেলেও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই ওঠেনি। ঠিক কবে নাগাদ তাদের হাতে সব বই তুলে দেওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ পাঠ্যপুস্তকে প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন ও সংশোধন শেষে অনেক বই এখনও ছাপাখানা থেকে বিতরণের উপযোগী হয়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় পাঠ্যবই নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক-শিক্ষকদের মধ্যে যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তারও নিরসন হয়নি। এরই মাঝে আঁতকে ওঠার মতো খবর এসেছে সংবাদমাধ্যমে। ‘বিনামূল্যের পাঠ্যবই চুপি চুপি বিক্রি’ শিরোনামে ২৪ জানুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রতিবেদনটি আমাদের শিরঃপীড়ার কারণ। প্রতিবেদনটি আমাদের উদ্বিগ্ন করার সঙ্গে ক্ষুব্ধও করে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এ বছরে ৪০ কোটি পাঠ্যবইয়ের চাহিদা থাকলেও এখন পর্যন্ত ছাপা হয়েছে অর্ধেকেরও কম। মাত্র ১৮ কোটি। আর ছাপানো এই বইয়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের মাঝে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি বই। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের হাতে এখনও প্রায় ৭০ শতাংশ বই পৌঁছেনি। ছাপা না হওয়া বইগুলোর ছাপা কার্যক্রম শেষে কবে নাগাদ শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছবে তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে বিষয়টি শিক্ষার্থীদের তো বটেই, অভিভাবক ও শিক্ষকদেরও উদ্বিগ্ন করে তুলছে। আমাদের প্রশ্ন বোর্ডের নির্ধারিত বই খোলাবাজারে কেন? এর পেছনে কার বা কাদের অপতৎরতা? ইতোমধ্যে বছরের প্রথম মাসের তিনটি সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। অথচ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে এখনও পুরো পাঠ্যবই ওঠেনি। পাঠ্যবইয়ের অভাবে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে পুরোদমে ক্লাসও শুরু হয়নি। নির্ধারিত সময়ে যেখানে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাক্রম শেষ করা নিয়ে দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে, সেখানে শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও শিক্ষকদের দুশ্চিন্তাকে পুঁজি করে কারা খোলাবাজারে বিনামূল্যের বই বিক্রি করছে?
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডও (এনসিটিবি) পাঠ্যবই কালোবাজারির সত্যতা স্বীকার করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী বিনামূল্যের বই খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগে রাজধানী ও শেরপুর থেকে কয়েকজনকে আটকও করেছে। উদ্ধার করেছে বিপুল সংখ্যক পাঠ্যবই। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যে যথেষ্ট না, উদ্ভূত পরিস্থিতি সেদিকেই ইঙ্গিত করে। বোর্ডের বই কালোবাজারে যেতে পারে, কয়েকভাবে। এই বইগুলো নির্ধারিত ছাপাখানাতেই ছাপা হয়। যদি বইগুলো বাইরে যেতে হয়, তাহলে ছাপাখানা সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশ ছাড়া অসম্ভব। এ ছাড়া ছাপানো বইগুলো যখন ছাপাখানা থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়, তখন পথে অথবা নির্ধারিত জেলাগুলোতে বই গ্রহণ করার দায়িত্বপ্রাপ্তরা অবৈধভাবে বইগুলো বাইরে বিক্রি করেও এই অপকর্মের সঙ্গে জড়াতে পারেন। তবে এত বিপুল সংখ্যক বই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির পক্ষে একা কালোবাজারে দিয়ে দেওয়া যথেষ্ট কঠিন। এক্ষেত্রে অপরাধের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারেন। আমরা দাবি করি, বিনামূল্যের বই কালোবাজারে যাওয়ার পেছনে যে বা যারাই দায়ী হোন না কেন, তাদেরকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শনাক্ত করা হোক। সেইসঙ্গে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও আমরা দাবি করি। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা ছাড়া কোনোভাবেই আগামীর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
বছরের শুরুতেই এনসিটিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানোর উদ্যোগ নেবে। শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদও যথাসময়ে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই, বিতরণ ও সরবরাহ করে ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়াকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমরা সরকারের অগ্রাধিকার, এনসিটির আশাবাদের প্রতি ভরসা রেখেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানোর জন্য বলি। আমরা আশা করি, সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছাতে এবং বইয়ের কালোবাজারি রোধে দায়িত্বশীল কারও স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম-দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ থাকলে সরকার তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হবে। সেইসঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের নির্ধারিত বিনামূলের বই বাজার থেকে টাকা দিয়ে না কেনার বিষয়েও আমরা অভিভাবক, শিক্ষার্থীদের সচেতন হতে বলি। যদি বাজার থেকে বিনামূল্যের বই কেনা থেকে বিরত থাকি, তাহলে এই চক্রও তাদের অপকর্ম করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবে। সেই সঙ্গে যারা এমন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, তাদেরকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় পুনঃপুন এ ধরনের অপরাধ ঘটতেই থাকবে, অপরাধীর লাগাম পরানো যাবে না।