ড. মোহিত উল আলম
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২২ ০০:৫০ এএম
আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২২ ২২:১৩ পিএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির জন্য স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করে বিশ^মানচিত্রে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের মানচিত্র যুক্ত হয়েছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় বীর বাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ-নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর যে প্রত্যয় ঘোষণা করেছিল এর প্রেক্ষাপট এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। তবে ইতিহাস বলে, একাত্তরের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ জাতিকে চূড়ান্তভাবে দৃঢ়প্রত্যয়ী করেছিল স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বিশ^ ইতিহাসে নৃশংসতা-বর্বরতার চরম ঘৃণ্য নজির স্থাপন করে, তখন বীর মুক্তিযোদ্ধারা ও মিত্রবাহিনী দেশ স্বাধীনের লক্ষ্যে রণাঙ্গনে নামেন। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর আত্মত্যাগ একই সঙ্গে নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে। এই গৌরবদীপ্ত মাসটির আজ প্রথম দিন।
ডিসেম্বর একদিকে বাঙালি জাতির গৌরব ও আনন্দের দিন, অন্যদিকে বেদনারও দিন। গৌরব-আনন্দ এই কারণে, একটি প্রশিক্ষিত আধুনিক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঙালি জাতি ছিনিয়ে এনেছিল বিজয়। এর জন্য আমাদের অপরিসীম মূল্য দিতে হয়েছে বটে কিন্তু আমাদের গৌরবদীপ্ত ইতিহাস বিশ^ ইতিহাসের অক্ষয় অধ্যায় হয়ে আছে। বেদনা এই কারণে, এই বিজয় অর্জন করতে গিয়ে বাঙালি জাতি হারিয়েছে অসংখ্য মানুষকে। বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে লড়াইয়ে ৩০ লাখ মানুষ আত্মদান করেছে। একই সঙ্গে দুই লাখেরও বেশি মা-বোনকে সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে। আর পুরো এই জনপদটিকে হানাদাররা পরিণত করেছিল বিরানভূমিতে। সচেতন মানুষ মাত্রেরই এই ইতিহাস জানা। এ নিয়ে নতুন করে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন।
গভীর শ্রদ্ধায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী ও সম্ভ্রম বিসর্জনকারী সবার কথা স্মরণ করি। জাতি তাদের কাছে চিরঋণী। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফাই বাঙালির মুক্তির সনদ। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর জাতির প্রতি যে অবদান তাও একটি জাতি ও দেশের ইতিহাসেরই শুধু নয়, বিশ্ব ইতিহাসেরও অক্ষয় অধ্যায় হয়ে আছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, কতিপয় স্বজাতদ্রোহী স্বাধীনতা অর্জনের সাড়ে ৩ বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে দেশকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল সেই পাকিস্তানি ভাবধারায়। এরই ধারাবাহিকতায় তারা ঘটিয়েছিল জেল হত্যাকাণ্ড, যেখানে জাতীয় চার নেতাকে তারা হত্যা করে। কিন্তু তারা অত্যন্ত মর্মন্তুদ অধ্যায় সৃষ্টি করলেও তাদের পরিকল্পিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তৎকালীন কুচক্রী শাসকরা আইন করে এই নৃশংসতার বিচারের পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল। বিলম্বে হলেও জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বিচারের পথ উন্মুক্ত করে। ঘাতকদের অনেকেরই চূড়ান্ত দণ্ড কার্যকর হলেও এখনও কয়েকজন দণ্ডিত ঘাতক পালিয়ে আছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। আমি মনে করি, সরকারের উচিত অনতিবিলম্বে এদের ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা। যে পর্যন্ত ওইসব রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসীর চূড়ান্ত দণ্ড কার্যকর করা না যাবে, সে পর্যন্ত আমাদের কলঙ্কের দাগ মোছা যাবে না।
ইতোমধ্যে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছি। আমরা এবার ৫২তম বিজয় দিবস উদযাপন করব। এই ৫২ বছরে আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতি কম দৃশ্যমান নয়। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-অবকাঠামোগত-শিল্প খাতসহ নানাদিকে আমরা অনেক এগিয়েছি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সুষ্পষ্ট কিছু অঙ্গীকার ও প্রত্যয় ছিল। বাহাত্তরে আমরা যে সংবিধান পেয়েছিলাম তা ছিল এরই ধারাবাহিকতায় পাওয়া একটি অনন্য দলিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, পঁচাত্তরের পর তথাকথিত গণতান্ত্রিক-অগণতান্ত্রিক শাসকরা কখনও ফরমান জারি করে, আবার কখনও সংসদের মাধ্যমে ওই সংবিধানের মূল স্তম্ভে আঘাত করে নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে। বিলম্বে হলেও সেই অন্ধকার কাটিয়ে আমরা আলোর পথে ফিরতে পেরেছি। কিন্তু বাহাত্তরের সংবিধানের হৃত বিষয়গুলো এখনও পুরোপুরি আমরা ফেরত পাইনি। আমি মনে করি, দেশ-জাতির বৃহৎ কল্যাণে বাহাত্তরের সংবিধান অবশ্যই ফিরিয়ে আনা জরুরি। যেহেতু এখন মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী শক্তি ক্ষমতায় আসীন সেহেতু এই কাজটি কঠিন কিছু নয়।
যেসব বিষয় এখনও অনর্জিত রয়ে গেছে সেগুলো অর্জনের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ ধারণ করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। অনাকাক্সিক্ষতভাবে সমাজের নানা ক্ষেত্রে কিংবা স্তরে বৈষম্য বেড়েছে। বৈষম্যের ছায়া অবশ্যই সরাতে হবে বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের জন্য এদেশের সাধারণ মানুষের ভূমিকা কিংবা অবদান কম নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ কাক্সিক্ষত মাত্রায় করতে পেরেছি? একটি জাতির জীবনে অর্ধশত বছর নেহাৎ কম নয়। তাই বায়ান্নতম বিজয় দিবস উদযাপনের প্রাক্কালে আমরা পেছন ফিরে তাকানোর তাগিদ অনুভব করছি। যেসব স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল; ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের যেসব স্বপ্ন ছিল তার কতটা আমরা পূরণ করতে পেরেছি এসব প্রশ্নের মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ জরুরি। অনস্বীকার্য যে আমরা এখনও আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যকেন্দ্রে পৌঁছুতে পারিনি। কেন পারিনি এই আত্মজিজ্ঞাসা আজ অতি প্রয়োজন, প্রয়োজন এর উত্তর খুঁজে পাওয়া। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের শপথ ও অঙ্গীকারের কথা আবারও স্মরণ করা দরকার। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে একাত্তরের মতো আবারও আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। প্রগতিশীল সব রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক শক্তিকে যূথবদ্ধ হয়ে সমাজ বিনির্মাণে প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
নির্বাচনব্যবস্থাসহ জনগণের অধিকারের সবকিছু করতে হবে প্রশ্নমুক্ত। আমরা অবশ্যই স্বীকার করব, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা তিন মেয়াদে আমরা নিজেদের সামর্থ্য দিয়েই অনেক বড় কাজ করেছি। এর মধ্যে পদ্মা সেতু অন্যতম। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ব্যর্থ হতে পারে না যদি বিশেষ করে রাজনীতিকদের সেই রকম অঙ্গীকার কিংবা সদিচ্ছা থাকে। আমাদের মনে রাখতে হবে, কাক্সিক্ষত বাংলাদেশের প্রথমেই ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজের প্রত্যাশা। অধিকারের মাঠ সবার জন্য সমতল থাকবে এও ছিল অন্যতম প্রত্যাশা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, সুশাসন ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমরা এগিয়েছি বটে তবে তা যথেষ্ট তা বলা যাবে না। অনিয়ম-দুর্নীতি এখনও আমাদের অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে জিইয়ে আছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘শূন্য সহিষ্ণুতার’ অঙ্গীকার রয়েছে বটে তারপরও অনিয়ম-দুর্নীতির খবর প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। আমি মনে করি, সরকারের সব কাঠামোর দায়িত্বশীলরা যদি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন তাহলে এই অন্ধকার দূর করা কঠিন কিছু নয়।
সাম্প্রদায়িকতার মতো ভয়াবহ ব্যাধির ছায়া এখনও সরেনি। অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠন। রাজনীতিতে স্ববিরোধিতা, অস্বচ্ছতা কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে হীনস্বার্থবাদীদের যে অপতৎপরতা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে তা খুবই পরিতাপের বিষয়। যদি এগুলোর নিরসন করা না যায় তাহলে কাক্সিক্ষত বাংলাদেশের লক্ষ্যকেন্দ্রে পৌঁছা কঠিন হয়েই থাকবে। আমরা অবশ্যই প্রত্যাশা করি, মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার-প্রত্যয় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারকে তো বটেই, প্রগতিশীল প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বকে এই লক্ষ্যে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া জরুরি। অভিযোগ আছে, আমাদের রাজনীতি অনেকাংশেই দুর্বৃত্তায়িত হয়ে পড়েছে। কালো টাকার দৌরাত্ম্য বাড়ছে। এই অভিযোগগুলো তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ খুব কম। আমাদের উন্নয়ন হচ্ছে সত্য কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছে বৈষম্যও। উন্নয়ন হওয়ার দরকার সার্বজনীন। স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরও যে অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র কখনও কখনও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে তা শুধু বেদনারই নয়, বিস্ময়করও। আমি বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্মোহ দৃঢ় অবস্থান বিদ্যমান এসব ব্যাধির উপশম ঘটাতে সক্ষম হবে। জ্ঞানচর্চা, একই সঙ্গে বেকারত্ব নিরসনে মনোযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষিত হৃদয়, শাণিত বুদ্ধিÑএই দুইই চাই। সঙ্গে রাখতে হবে দেশের আপামর জনগণকে। মেহনতি মানুষের কথা আরও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধে তো অবশ্যই, আমাদের বাঁক পরিবর্তন ও অর্জনের অনেক অধ্যায় আলোকোজ্জ্বল হয়েছে মেহনতি মানুষদের অংশগ্রহণের কারণেই। মূল কথা হলো, রাজনৈতিক ব্যবস্থা স্বচ্ছ ও জবাবদিহি করা চাই। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাক্সিক্ষত রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুনভাবে সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটাতে পারলে আমাদের অনর্জিত বিষয়গুলো অর্জিত হবে সহজেই।
ধর্মান্ধতা, উগ্রতা, অস্বচ্ছতা, স্বেচ্ছাচারিতাসহ নেতিবাচক সবকিছুর পথ রুদ্ধ করতে হবে নির্মোহ ও কঠোর অবস্থান নিয়ে। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পথ সুগম করা জরুরি দেশ-জাতির বৃহত্তর স্বাথেই। আমরা যেন কোনোভাবেই ভুলে না যাই মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার। রক্তস্নাত এই বাংলাদেশ আমাদের কাক্সিক্ষত জায়গায় পৌঁছুতে পারে সবার যূথবদ্ধ প্রচেষ্টায়। মুক্তিযুদ্ধের মতো এত বড় গর্বিত অধ্যায় যে জাতির ইতিহাসের মুখ্য অংশ সেই জাতির লক্ষ্য কোনোভাবেই অনর্জিত থাকতে পারে না। স্বাধীন দেশের সাধারণ নাগরিকরা খুব বেশি কিছু চায় না। তারা চায় তাদের অধিকারের সমতল মাঠ এবং অনিয়ম-দুর্নীতির নিরসন। সুশাসনও নিশ্চিত করা তাদের অন্যতম চাওয়া। সরকারের নীতিনির্ধারকরা সাধারণ জনগণের এই চাওয়াগুলোর প্রতি অধিক গুরুত্ব দেবেন এই প্রত্যাশা আমাদেরও।
লেখক : শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক