সাইফুল ইসলাম খান
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২২ ০০:৪৩ এএম
ছবি : সংগৃহীত
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিন। সময় বিকাল ৩টা। পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে সূর্য। মৃদু হিম হাওয়ায় হালকা শীতের আমেজ। শীতলক্ষ্যা নদের পশ্চিমপাড়ে খলাপাড়া গ্রামের লোকজন কেউবা ঘরে ফিরছে, কেউবা মাঠে কৃষিকাজে ব্যস্ত। নদীর পশ্চিম তীরস্থিত ন্যাশনাল জুটমিলের পাশের রাস্তা দিয়ে সকাল ১১টায় আর্মিদের যে গাড়িগুলো গিয়েছিল জামালপুরের দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে, তারাও কিছুক্ষণ আগে ফিরে গেছে তাদের ক্যাম্পের দিকে। হানাদার বাহিনীর গাড়ি ফিরে যাওয়াতে অনেকের ভেতরেই এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস। কিন্তু হঠাৎ গ্রামের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে মুহুর্মুহু ভেসে আসে গুলির শব্দ। এরপর অনেক মানুষের কান্না আর চিৎকারের শব্দ। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল গ্রামবাসী বুঝতে পারে, চলছে হত্যাযজ্ঞ। বিহ্বলতা কেটে গেলে তারা গ্রাম ছেড়ে পালাতে শুরু করে। সূর্য ডোবার আগেই জনমানবশূন্য হয়ে পড়ে খলাপাড়া। কিন্তু ততক্ষণে শীতলক্ষ্যার নীলজলে বইছে রক্তের স্রোতধারা। আর ন্যাশনাল জুটমিলের বড় পুকুরপাড়ে শতাধিক লাশ আর পুকুরের পানিতে মিশে আছে শহীদের রক্ত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অসংখ্য মর্মস্পর্শী ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো এ ঘটনাটি ঘটে গাজীপুর জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার জামালপুরে অবস্থিত ন্যাশনাল জুটমিলের অভ্যন্তরে।
মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে, বিজয়ের আসন্ন লগ্নে ন্যাশনাল জুটমিলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ দিনে হত্যা করে মুক্তিকামী ১০৬ জনকে। এরা সবাই ছিলেন ন্যাশনাল জুটমিলের কর্মকর্তা-কর্মচারী। মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারী হলেও তারা ছিলেন মুক্তিকামী ও নানাভাবে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় নভেম্বর মাসে তারা ঠিক করেন মুক্তিযোদ্ধাদের শীতবস্ত্র দিয়ে সাহায্য করবেন। কিন্তু তাদের এ পরিকল্পনার তথ্য পৌঁছে যায় পাকবাহিনীর কাছে। বধ্যভূমি হতে ক্যাম্পের দূরত্ব ১.৫ কিলোমিটার।
ঘটনার দিন একদল পাকিস্থানী সেনা সকাল ১১টার দিকে ন্যাশনাল জুটমিলে ঢুকে মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ করে। সেখানে কোনো মুক্তিযোদ্ধা না পেয়ে তারা জামালপুরের দিকে যায়। জামালপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের সম্মুখীন হলে তারা আবার ন্যাশনাল জুটমিলে ফিরে আসে। এখানে পাকবাহিনীর সৈন্যরা জুটমিলের ১০৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ধরে এনে মিলের ভেতরে অবস্থিত পুকুরপাড়ে দুটি লাইনে দাঁড় করায়। এরপর বিকাল ৩টা হতে শুরু হয় লাইনে গুলিবর্ষণ। ব্রাশফায়ার করে ও পরে বেয়নেট চার্জ করে তারা হত্যাযজ্ঞ চালায়।কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় দুজন। বাকি ১০৪ সকলেই শহীদ হয়।
শহীদদের কেউই স্থানীয় বাসিন্দা নন, সকলেই দেশের অন্যান্য জেলার বাসিন্দা। সেদিনই রাতের বেলা একদল মুক্তিযোদ্ধা জুটমিলের ভেতরে প্রবেশ করেন ও আহত ৩ জনকে উদ্ধার করে দালানবাজারে নিয়ে যান। আহতরা সেখানে মারা যান। এদের কবর জামালপুর বাজারের আশপাশে দেওয়া হয়। বাকি ১০১ জনের লাশ দুইদিন পুকুরপাড়ে পড়ে থাকে। দুইদিন পর মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাসী মিলে সকল শহীদের লাশ জুটমিলের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণায় দুটি গর্ত খনন করেন ও গণকবর দেন। ঠিক এ জায়গাটির ওপরই ন্যাশনাল জুটমিল কর্তৃপক্ষ ১৯৯৬ সালে নির্মাণ করে স্মৃতিফলক ‘শহীদ স্মরণে’। এলাকার লোকজন যথাযথ মর্যাদায় ১ ডিসেম্বর এ বধ্যভূমিতে শুয়ে থাকা অজানা শহীদদের উদ্দেশে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়। এ বধ্যভূমিতে শুয়ে থাকা অমর শহীদদের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে এলাকাবাসী। তাদের চোখের ভাষায় ফুটে ওঠে-‘আমরা তোমাদের ভুলিনি, কখনওই ভুলব না।’
লেখক : সংবাদমাধ্যমকর্মী