অর্থনীতি
দুলাল আচার্য
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:৪০ এএম
দুলাল আচার্য
মাছে ভাতে বাঙালি এ প্রবাদটি চিরপ্রচলিত। আমরা মাছের ভক্ত। বাজারে সবার আগে তাজা এবং বড় মাছের দিকেই থাকে সবার চোখ। তাজা মাছের পাশাপাশি বহু আগে থেকেই শুঁটকিও আমাদের খাদ্যতালিকায় স্থান করে নিয়েছে। শুঁটকি ভোজনরসিক বাঙালির কাছে দারুণ সুস্বাদু ও ভীষণ পছন্দের খাবার। এ কথা সত্য যে, বাঙালির পছন্দ বৈচিত্র্যময়। তাই বৈচিত্র্যময় বাঙালির লোভনীয় খাদ্যতালিকার অংশ শুঁটকি মাছ তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। শুঁটকি নাম শুনলে যেমন অনেকের জিবে জল আসে, তেমনি এর গন্ধ একটা আলাদা অনুভূতি জাগায় অনেকের। মাছ যখন শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়, তখন তাকে শুঁটকি বলা হয়। কারও কারও কাছে শুঁটকির ভর্তা ও নানা রকম পদ অত্যন্ত পছন্দনীয়। ভালো মানের সতেজ মাছ কোনো কৃত্রিম প্রিজারভেটিভ ছাড়া শুকিয়ে সংরক্ষণ করলে শুঁটকি হয়ে থাকে। আমাদের দেশে খাদ্য সংরক্ষণের বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে অনেক পুরোনো একটি হচ্ছে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ। মাছ রোদে শুকানো হলে মাছের যে জলীয় অংশ থাকে, তা শুকিয়ে যায়। এতে মাইক্রো অর্গানিজম জন্মাতে পারে না। সে কারণে মাছকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণও করা যায়।

আমাদের দেশি প্রেক্ষাপট বিবেচনায় শুঁটকির চাহিদা বলে শেষ করা যাবে না। আত্মকর্মসংস্থান থেকে শুরু করে দেশি অর্থনীতিতে শুঁটকির প্রভাব অপরিসীম। সে কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাছ শুঁটকি করা হয় প্রচুর পরিমাণে। শুঁটকি সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ চলে। এ সময়টায় জেলে, শ্রমিকরা দিনরাত কাজ করেন। শ্রমিকরা নদী থেকে কাঁচা মাছ শুঁটকিপল্লীতে নিয়ে আসার পর নারী শ্রমিকরা সেগুলো পরিষ্কার করেন। এরপর মাছগুলো পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে মাচায় শুকানো হয়। তিন-চার দিনের রোদে মাছগুলো শুকিয়ে শক্ত হয়। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, দেশে বার্ষিক জনপ্রতি মাছের চাহিদা ২০.৪৪ কেজি। বিপরীতে বার্ষিক জনপ্রতি খাদ্য হিসেবে মাছ গ্রহণ করা হয় ১৮.৯৪ কেজি। অর্থাৎ ১.৫০ কেজি ঘাটতি থাকে। এ গ্রহণকৃত মাছের প্রায় ৫% আসে শুঁটকি থেকে। বছরে প্রায় ৫.৪৬ লাখ টন মাছ আহরিত হয় সমুদ্র থেকে; যার ২০% শুঁটকি হিসেবে প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয়। বাংলাদেশে প্রায় ২৫ প্রজাতির মাছের শুঁটকি তৈরি করা হয়। সবচেয়ে বেশি শুঁটকি উৎপাদিত হয় সুন্দরবনের দুবলার চর, সেন্ট মার্টিন আইল্যান্ড, সোনাদিয়ার চর, মহেশখালী, কক্সবাজারের নাজিরাটেক, সুনামগঞ্জের ইব্রাহীমপুর, জামালগঞ্জের জশমন্তপুরে। এ ছাড়া দেশের উত্তরাঞ্চলেও শুঁটকি মাছ পাওয়া যায়। এর মধ্যে নাটোরের সিংড়া, চলনবিলসংশ্লিষ্ট সিরাজগঞ্জ, নীলফামারীর সৈয়দপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুর রয়েছে। জানা যায়, বরগুনা ও পটুয়াখালী উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় শুঁটকি উৎপাদন মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। শুঁটকি তৈরির কাজে দুই জেলায় জেলে, শ্রমিক, ব্যবসায়ী মিলে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। বাংলাদেশের উৎপাদিত সামুদ্রিক শুঁটকির সবচেয়ে বড় অংশ তৈরি হয় কক্সবাজারে। কক্সবাজারের নাজিরাটেক এলাকাকে দেশের শুঁটকি উৎপাদনের বৃহত্তম কেন্দ্রস্থল তথা শুঁটকির গ্রাম বিবেচনা করা হয়। কক্সবাজার শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরের পাশ ঘেঁষে প্রায় ১০০ একর বালুচরজুড়ে গড়ে উঠেছে নাজিরাটেকের শুঁটকিমহাল। দেশে উৎপাদিত শুঁটকির প্রায় ৮০ শতাংশ এ নাজিরাটেকেই পাওয়া যায়। জানা গেছে, শুঁটকি ব্যবসায়ীরা প্রতি মৌসুমে বিশেষ করে শীতের শুরুতে কেবল নাজিরাটেক শুঁটকিমহালে মাছের গুঁড়াসহ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন বিভিন্ন জাতের শুঁটকি উৎপাদন করেন; যার বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
বিশ্বে বাংলাদেশের শুঁটকির চাহিদা থাকা সত্ত্বেও যথাযথ সমন্বয়ের অভাবে তা সঠিকভাবে রপ্তানি করা যাচ্ছে না। সরকারের তরফেও সহায়তার ব্যাপারে ঘাটতি রয়েছে। এক কথায় রপ্তানিকারকরা কোনো প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা সেভাবে সরকারের কাছ থেকে পান না। অথচ ব্যাপক ভিত্তিতে শুঁটকি রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া গেলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব
শুঁটকি উচ্চমাত্রার প্রোটিনের ভালো খাদ্য উৎস। এটি সম্পূর্ণভাবে একটি প্রাকৃতিক খাবার। প্রতি ১০০ গ্রাম শুঁটকি থেকে প্রায় ৩৭১ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি পাওয়া যায়, যা শরীরের জন্য খুবই উপকারী। শুঁটকি থেকে প্রাপ্ত খাদ্যপুষ্টির ৮০ শতাংশই প্রোটিন। শুঁটকির প্রোটিনে যে পরিমাণ অ্যামাইনো অ্যাসিড আছে তা ডিমের মধ্যে থাকা অ্যামাইনো এসিডের প্রায় সমপরিমাণ। এ ছাড়া শুঁটকিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা আমাদের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করে। শুঁটকিতে প্রচুর প্রয়োজনীয় খাদ্যমৌল যেমন সেলেনিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস ইত্যাদি আছে। এতে প্রচুর ভিটামিনের উপস্থিতিও লক্ষ করা যায় যেমন ভিটামিন বি-১২ ও ডি। ভিটামিন বি-১২ আমাদের শরীরের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান হিসেবে কাজ করে। আমাদের স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ঠিক রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়া লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে। ভিটামিন-ডি শরীরের ক্যালসিয়ামের মাত্রা ঠিক রাখে এবং হাড় ও দাঁত গঠনে সাহায্য করে। শুঁটকিতে নায়াসিন নামে এক ধরনের ভিটামিন তৈরি হয়, যা আমাদের ত্বক ও পরিপাকতন্ত্রের জন্য অতি উপকারী একটি পুষ্টি উপাদান। নায়াসিন দেহের খাবার থেকে শক্তি তৈরির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে। শুঁটকিতে কোলেস্টেরল ও সম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড কম থাকে। চিকিৎসকরা বলেন, যাদের হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপ বা অতিরিক্ত ওজনজনিত সমস্যা আছে তারা সাধারণত চর্বিজাতীয় খাদ্য খেতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে বিকল্প খাদ্য হিসেবে তারা শুঁটকি খেতে পারেন। তবে কোনো কিছুই নেতিবাচকতামুক্ত নয়। শুঁটকির ক্ষেত্রেও এমন কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে। যারা শুঁটকিকরণের কাজ করে থাকেন তাদের বেশিরভাগই স্বাস্থ্যসচেতন নন। অনেক সময় দেখা যায়, অসাধু ব্যবসায়ী মাছ শুকানোর সময় প্রচুর কীটনাশক ও রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করেন; যা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক সময় কাঁচামাল হিসেবে পচা, দুর্গন্ধযুক্ত ও বাসি মাছ ব্যবহার করা হয়। ফলে কাঙ্ক্ষিত পুষ্টিসম্মত পণ্য পাওয়া যায় না। তবে প্রয়োজনীয় সাবধানতা, সতর্কতা এবং শুঁটকি চাষিদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে উপরোক্ত সমস্যাগুলো উত্তরণ সম্ভব।
শুঁটকি একটি বিশাল রপ্তানিযোগ্য পণ্য। আমাদের দেশ থেকে রপ্তানি হওয়া শুঁটকির বড় অংশই যায় হংকং, সিঙ্গাপুর, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ড। জানা যায়, দেশ থেকে রপ্তানি হওয়া শুঁটকির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই সরবরাহ করা হয় আসাদগঞ্জ থেকে। আস্ত শুঁটকির পাশাপাশি রপ্তানি হয় মাছের বিভিন্ন অংশবিশেষ কেটে তৈরি করা শুঁটকিও। এর মধ্যে রয়েছে লেজ, পাখনা ও অন্ত্র। এসব শুঁটকি যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, দেশে উৎপাদিত মাছের অন্তত ১৫ শতাংশ শুকিয়ে শুঁটকিতে রূপান্তর করা হয়।
বিশ্বে বাংলাদেশের শুঁটকির চাহিদা থাকা সত্ত্বেও যথাযথ সমন্বয়ের অভাবে তা সঠিকভাবে রপ্তানি করা যাচ্ছে না। সরকারের তরফেও সহায়তার ব্যাপারে ঘাটতি রয়েছে। এক কথায় রপ্তানিকারকরা কোনো প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা সেভাবে সরকারের কাছ থেকে পান না। অথচ ব্যাপক ভিত্তিতে শুঁটকি রপ্তানির ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া গেলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। এ শিল্পে আরও বেসরকারি উদ্যোক্তাকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। আমরা মনে করি, সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত হলে এটিও হতে পারে দেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য। বাঙালির ঐতিহ্য শুঁটকি সংরক্ষণ ও মানোন্নয়নের দায়িত্ব সরকারের পাশাপাশি আমাদের সবার। আশা করা যায়, প্রয়োজনীয় সরকারি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে আমাদের শুঁটকি আরও সমৃদ্ধ করবে দেশের সম্মান, বাড়বে রপ্তানি আয়, সৃষ্টি হবে ব্যাপক কর্মসংস্থানও।