ক্রীড়া
ইকরামউজ্জমান
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:২৯ এএম
ইকরামউজ্জমান
পর পর দুইবার সাউথ এশিয়ান নারী ফুটবলে বাংলাদেশ নারী দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। পুরুষ জাতীয় দল অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেও দেশবাসীকে পর পর দুইবার শিরোপা জয় উপহার দিতে পারেনি। ধারাবাহিকতার সঙ্গে ভালো ফুটবল খেলার পাশাপাশি (টেকনিক্যালি ও ট্যাকটিক্যালি) শিরোপা জয়ের পরিপ্রেক্ষিতে নারী দলের প্রতি মানুষের আস্থা এবং বিশ্বাস বেড়েছে। মানুষ বিশ্বাস করছে নারী ফুটবল দেশে যথাযথ প্রটেকশন এবং পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আশিয়ান অঞ্চলে একটি ভালো দল হিসেবে পরিচিত হতে বেশি সময় লাগবে না। নারী ফুটবলে সমস্যা এবং সমাধানের বিষয়টি অজানা নয়। খেলায় ভালো করতেই শুধু নয়, একটি গোছানো দল তৈরিতেও প্রথমে প্রয়োজন পেশাদারত্ব। ভালো ফুটবলের জন্যও পেশাদারত্বের বিকল্প নেই। তা সে খেলার মাঠেই হোক বা সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রেই হোক, সবখানেই আমাদের পেশাদারত্বের পরিচয় দেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতির অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে ওঠে। তবে তা যে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব, আর তা কাটিয়ে উঠতে পারলে যে আমাদের ফুটবল বা যেকোনো খেলারই আন্তর্জাতিক আসরে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করতে পারে, সে উদাহরণও রয়েছে। তবে আমাদের ফুটবলের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো প্রথমেই সামনে আসে, তার মাঝে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নীতিগত সমন্বয়হীনতা, সংগঠকদের মধ্যে বিভাজন, স্বার্থের দ্বন্দ্ব, সঠিক নেতৃত্বের অভাব, একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং অপেশাদারসুলভ ফুটবল ব্যবস্থাপনা। নারী ফুটবলকে আমরা নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই, আমরা যদি এই সংকল্প বাস্তবায়নের জন্য সচেষ্ট হই, তবে আমাদেরকে এই সমস্যাগুলো থেকে যেমন বেরিয়ে আসতে হবে তেমনি যথাসময়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়েও তৎপর হতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করা ছাড়া ফুটবলের উন্নতির সুযোগ কম।

২০১০ সালে শুরু হয় সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ। শুরুর পর থেকে ফাইনালে উঠেও প্রতিবার রানার্সআপ হওয়ার বেদনায় পুড়তে হয়েছে নেপালকে। নেপালকে কাঁদিয়ে বরাবর হেসেছে ভারত। প্রথম পাঁচটি ফাইনালের সব ক’টিই জেতা ‘অপরাজেয়’ ভারত ২০২২ সালে হোঁচট খায়। সেবার তারা উঠতে পারেনি ফাইনালে। আর প্রথমবার ফাইনালে উঠেই স্বাগতিক নেপালকে তাদেরই মাঠে ৩-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। এবারও ২-১ গোলে নেপালকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা নিজেদের করে নেয় বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা। ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত আসরের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচও হয়েছিল এই দুই দলের মধ্যে, ভেন্যুও ছিল কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা। তবে সে হিসেবে এবার অবশ্য গোল একটি কম হয়েছে। টানা দ্বিতীয়বারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ জিততে যাওয়ার আগে প্রস্তুতি ম্যাচ না খেলার আক্ষেপের কথা বলেছিলেন সাবিনা। এই যে আক্ষেপ, এটা কিন্তু প্রায় প্রতিটি টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার আগেই ঘটে। খেলোয়াড়রা যথাযথ প্রস্তুতি ম্যাচের অভাব অনুভব করেন। তাদের ভেতরে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার যে আকাঙ্ক্ষা তা অনেক সময়ই পূরণ হয় না। তারপরও আমাদের মেয়েরা কাঠমান্ডুতে গিয়ে তাদের নিজেদের সেরা খেলাটা উপহার দিয়েছেন। কিন্তু আগামীতে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া পরিপূর্ণভাবে নিজেদের মেলে ধরা সহজ নয়। প্রস্তুতি ম্যাচের পারফম্যান্স দিয়ে যেমন খেলোয়াড়রা নিজেদের ঘাটতি খুঁজে বের করতে পারেন, তেমনি তাদের আত্মবিশ্বাসও বাড়ে।
নারী ফুটবল এখন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড। যেটি ইতিহাসের ধারা বদলে দেওয়ার মতো ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। নারী এবং পুরুষ উভয়ের ফুটবলে সংস্কারের জন্য সংগঠকদের অঙ্গীকার ও ঐক্য দরকার
সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের পরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সিনিয়র সহসভাপতি ইমরুল হাসান সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই মেয়েদের নিয়ে লক্ষ্যমাত্রাটা এখন ঊর্ধ্বমুখী থাকবে। সাফে ভালো করেছে, এখন এশিয়ান আসরগুলোতেও যেন পাল্লা দিয়ে খেলতে পারে, সেই লক্ষ্য থাকবে। এজন্য অবশ্যই আমাদের নতুন করে পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রথমবার সাফ জয়ের পর যেটা আসলে হয়নি। তাদের ওপর যে পরিমাণ নজর দেওয়া উচিত ছিল, সেটা আমরা দিতে পারিনি।’ তার কথার সূত্র ধরেই বলতে পারি, এই যে যথাযথ নজর না দেওয়া, এই বিষয়টি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ফুটবলই শুধু নয়, যেকোনো খেলায় ভালো ফল চাইলে ঘরোয়া লিগের প্রতি নজর দিতে হবে। ঘরোয়া লিগ হতে হবে জমজমাট এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ফুটবলের সব ক্লাব যেন ঘরোয়া লিগে অংশ নেয় তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত লিগ অনুষ্ঠিত হতে হবে। তাহলে একদিকে যেমন প্রতিনিয়ত ভালো খেলোয়াড় উঠে আসবে, তেমনি নিয়মিতরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলার মাধ্যমে নিজেদের আরও শানিত করতে পারবে। নারী ফুটবলের ঘরোয়া লিগ নিয়মিত হলে ফুটবলার হিসেবে মেয়েদের ক্যারিয়ারও সমৃদ্ধ হবে। ভারত এমনকি ভুটানও মেয়েদের লিগটাকে পেশাদার করে তুলেছে। ফলে এএফসি ক্লাব টুর্নামেন্টগুলো তারা খেলছে নিয়মিত। অথচ সাফ শিরোপা বিজয়ী বাংলাদেশ নারী দল সেখানে খেলতে পারছে না।
দেশের ক্রীড়াঙ্গনে জেন্ডার বৈষম্যের বিষয়টি যত সময় গড়াচ্ছে আরও বাড়ছে। অথচ এটি হওয়ার কথা ছিল না। অভিযোগ রয়েছে, ক্রীড়াঙ্গনে নারী ক্রীড়াবিদ ও খেলোয়াড়রা সামাজিক, আর্থিক, মানসিক, শারীরিক নিরাপত্তা এবং চিকিৎসার অভাবে ভুগছেন। ভুগছেন সব সময় এক ধরনের অনিশ্চয়তায়। ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের বিভিন্ন খেলায় উন্নয়নের যে গতিশীল অনুঘটন আছে তার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর কোনো উদ্যোগ নেই। এই বিষয়ে সচেতনতা দরকার। বিশ্বায়নের যুগে যখন সারা পৃথিবীর নারী ক্রীড়াঙ্গন তরতর করে এগিয়ে চলেছে আমরা পড়ে রয়েছি অনেক পেছনে। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের মানসিকতা এবং চিন্তাভাবনা বদলায়নি। নারীরা ক্রীড়াঙ্গনে এখনও অনেকাংশেই অবহেলিত। এই ক্ষেত্রে শুভবুদ্ধির জাগরণের লক্ষণ প্রয়োজন। নারী ক্রীড়াঙ্গনে মৌলিক সংস্কার এখন সময়ের বড় দাবি।
সম্প্রতি একটি বাংলা দৈনিকের প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানতে পারি, নারী ফুটবল ভিশন ২০২৬-এর কাজ শুরু করেছেন বাফুফের নারী কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণ। এটি আশা জাগানিয়া সংবাদ। সময় হাতে নিয়েই উদ্যোগ গ্রহণের এই চিন্তা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। নারী চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালে। কোথায় হবেÑ স্থান এখনও ঠিক হয়নি। তাই বাংলাদেশের উচিত স্বাগতিক দেশ হওয়ার আগ্রহ দেখানো। আমাদের লক্ষ্য হলো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে হ্যাটট্রিক জয়। সবাই প্রস্তুতি নেবে এটাই স্বাভাবিক। কাজের সঙ্গে যদি লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যের সমন্বয় না হয় তা হলে হ্যাটট্রিক জয় সম্ভব হবে না। খেলোয়াড়দের সামর্থ্য এবং ইচ্ছাশক্তিতে তো কমতি নেই শুধু প্রয়োজন সঠিক উদ্যোগ এবং তার বাস্তবায়ন। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর অনেক সুন্দর সুন্দর কথা শুনেছি। শুনেছি প্রতিশ্রুতির নানা কথাও। এখন লক্ষ্য করছি, কিছুটা ভাটার টান। কিছুদিন আগে জানা গেছে বড় ক্লাবগুলোর একটিও উৎসাহ দেখাচ্ছে না নারী দল গঠন করে লিগে অংশগ্রহণের। তাহলে নারী ফুটবল লিগের অবস্থা কী দাঁড়াবে? শোনা যাচ্ছে, নারী লিগে পুলপ্রথা চালু হবে। ‘পুল’ চালু হলে কিন্তু নারী খেলোয়াড়রা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এটির সামাল কীভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেবেন? নারী ফুটবল সব সময় চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে।
সম্প্রতি বাফুফের নারী কমিটির চেয়ারম্যান সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘ফিফার নির্দেশনা অনুযায়ী মেয়েদের লিগ হতে হবে ছয় মাসব্যাপী। অবশ্যই ডাবল লিগ এবং অন্তত ৯০টা ম্যাচ হওয়া আবশ্যক। এ বছরের লিগটা তাই নতুন করে সাজাতে চায় বাফুফে।’ বাফুফের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফাহাদ করিম সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, আমরা ঢাকায় লিগের পাশাপাশি আয়োজন করতে যাচ্ছি জাতীয় লিগ। এটিও ক্লাবভিত্তিক। ফিফার গাইডলাইন অনুযায়ী দেশের আটটি বিভাগের চারটি করে ক্লাব নিয়ে মোট ৩২ দল এই লিগে খেলবে। তিনি আরও জানিয়েছেন, বাফুফে চাচ্ছে ফুটবল সম্প্রসারণে ক্লাবগুলোকে গুরুত্ব দিতে। ফিফার নির্দেশনাও তাই। এ ছাড়া বাফুফের পরিকল্পনা হলো বছরের শেষভাগে ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টের আয়োজন করা।
বাংলাদেশ জেগেছে। নতুন করে মানুষের মধ্যে আশা-আকাঙ্ক্ষা জন্ম হয়েছে। কমেছে মানুষে মানুষে চিন্তার দূরত্ব। মানুষ ভাবতে পারছে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় সবই সম্ভব। নারী ফুটবল এখন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড। যেটি ইতিহাসের ধারা বদলে দেওয়ার মতো ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।
নারী এবং পুরুষ উভয়ের ফুটবলে সংস্কারের জন্য সংগঠকদের অঙ্গীকার ও ঐক্য দরকার। করব করব করেও বছরের পর বছর ধরে সংস্কার এজেন্ডা নিয়ে এগোনো হয়নি। ৫৩ বছরেও ফুটবলে গড়ে ওঠেনি সুস্থ সংস্কৃতি। নারী ফুটবলকে গতিশীল করতে হলে প্রথমে অসংগতিগুলো দূর করে সংশোধনের পথে হাঁটতে হবে। সেইসঙ্গে ক্রীড়াঙ্গনে গড়ে তুলতে হবে সুস্থ সংস্কৃতি।