অর্থনীতি
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৫ ১৫:৫৯ পিএম
আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৫ ১৬:০০ পিএম
নিরঞ্জন রায়
ক্রিপ্টোকারেন্সি এমন এক ধরনের আর্থিক সম্পদ, যা জন্মের আগেই অতি বেশি বড় হয়ে গেছে এবং যথেষ্ট ক্ষতবিক্ষতও হয়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির আরও একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আইনগত বৈধতা পাওয়ার আগেই এ মুদ্রা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং ধনাঢ্য ব্যক্তি তো বটেই, অনেক সাধারণ মানুষও এ কারেন্সিতে লেনদেন এবং বিনিয়োগ করছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি মূলত এক ধরনের ভার্চুয়াল মুদ্রা। একে ডিজিটাল কারেন্সিও বলা হয়। এখন পর্যন্ত বাজারে বিটকয়েন, ইথারেনাম, এক্সআরপি এবং টেথার নামে ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু আছে। এর মধ্যে বিটকয়েন সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। বিশ্বব্যাপী অনলাইন লেনদেন জনপ্রিয়তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ভার্চুয়াল কারেন্সিও মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায়।
দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, এত ব্যাপক জনপ্রিয়তা
সত্ত্বেও এ মুদ্রা এখনও আইনি বৈধতা পায়নি। দুয়েকটি ছোট দেশ ছাড়া বিশ্বের কোনো দেশের
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্রিপ্টোকারেন্সিকে বৈধ মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি
দেয়নি। এখন পর্যন্ত কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক এ কারেন্সি লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ
করে না। এমনকি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের সঙ্গে জড়িত
থাকে, তাদের ব্যাংক হিসাব খুলতে সমস্যা হয় এবং কোনোরকমে ব্যাংক হিসাব খুললেও, সেটি
বিশেষ নজরদারির মধ্যে রাখা হয়। শুধু তাই নয়, কোনোরকম বৈধ আর্থিক লেনদেন করার সুযোগ
নেই এ ভার্চুয়াল মুদ্রা ব্যবহার করে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে যদি
১০ হাজার বিটকয়েন থাকে, তবে সেই ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে কোনো কিছু কেনা সম্ভব নয়। প্রথমে
বিটকয়েন বিক্রি করে ডলার বা অন্য কোনো বৈধ মুদ্রা সংগ্রহ করতে হবে এবং তারপর সেই সংগৃহীত
মুদ্রা ব্যবহার করে কোনো কিছু কেনার কাজটি সম্পন্ন করতে হবে। এক কথায় ক্রিপ্টোকারেন্সির
জন্মই এখনও হয়নি।
বাস্তবতা হচ্ছে, ক্রিপ্টোকারেন্সির আনুষ্ঠানিক
যাত্রা না হলেও এ মুদ্রা বিশ্বব্যাপী বিশাল বাজারে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ক্রিপ্টোকারেন্সির
বাজার এখন ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এসব ক্রিপ্টো কোম্পানি এবং ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ
আবার যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরাই এগুলোর মালিক। বলার
অপেক্ষা রাখে না, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশ যেখানে একটি সেলুন দিতে গেলেও এক ধরনের
সার্টিফিকেট এবং কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হয়। অথচ সেই যুক্তরাষ্ট্রের
মতো দেশেই কোনোরকম পূর্বানুমতি না নিয়েই অবৈধ মুদ্রা হিসেবে ক্রিপ্টোকারেন্সি এত বিশাল
মার্কেটে পরিণত হয়েছে। ফলে এ বিশাল আর্থিক সম্পদের দায়দায়িত্ব কোনো একক কর্তৃপক্ষের
কাছে নেই। ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনে কোনোরকম অনিয়ম হলে, তা দেখার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত
কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেই। মাঝেমধ্যে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি),
ফেডারেল ট্রেড কমিশন জোরপূর্বক কিছু নিয়মের মধ্যে ফেলে এ ভার্চুয়াল মুদ্রার লেনদেনের
অনিয়ম তদারকি এবং এর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করেও খুব একটা সফল
হতে পারে না। কেননা নানানরকম আইনি জটিলতা দেখা দেয়।
যারা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ করেছেন,
তারা সব সময়ই এক ধরনের ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। এ ভার্চুয়াল মুদ্রার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন
না থাকলেও ইতোমধ্যে বেশ কিছু জালিয়াতি ঘটেছে। সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ক্রিপ্টো জালিয়াতির
ঘটনা হচ্ছে এফটিএক্স কেলেঙ্কারি। যুক্তরাষ্ট্রের নিবন্ধিত এ এফটিএক্স নামের ক্রিপ্টো
এক্সচেঞ্জ বন্ধ হয়ে গেছে। এর কর্ণধার আটক হয়ে বিচারের মুখোমুখি হলেও সর্বস্বান্ত হয়েছেন
হাজার হাজার বিনিয়োগকারী। এ ছাড়া এ ক্রিপ্টোকারেন্সি কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক,
বিশেষ করে দুবাইভিত্তিক কিছু জালিয়াতির ঘটনাও ঘটেছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে বিশ্বব্যাপী
অবৈধ আর্থিক লেনদেন বন্ধ এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রমের। এ ক্রিপ্টোকারেন্সি
এখন পর্যন্ত অবৈধ কিন্তু জনপ্রিয় হওয়ায় অবৈধ লেনদেন এবং মানি লন্ডারিং অপরাধ সংঘটনে
এ ক্রিপ্টোকারেন্সি অবলীলায় ব্যবহৃত হচ্ছে। বলা হয়, বিশ্বে কঠোর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ
আইন এবং বিধিবিধান প্রয়োগ করে অবৈধ আর্থিক লেনদেন এবং মানি লন্ডারিং অপরাধ প্রতিরোধে
যতটুকু অগ্রগতি হয়েছিল, তার সবই প্রায় ভেস্তে যেতে বসেছে এ ক্রিপ্টোকারেন্সির অবাধ
লেনদেনের কারণে। অথচ শুরু থেকে এ ভার্চুয়াল কারেন্সিকে একটি কঠিন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে
রাখতে পারলে এসব কিছুই হয়তো ঘটত না।
যুক্তরাষ্ট্রে আছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী,
সুশৃঙ্খল এবং সুনিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থা। এখানকার আর্থিক ব্যবস্থায় কোনো প্রতিষ্ঠান
বা প্রডাক্ট চালু করার আগে এর কঠোর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। সবদিক আটঘাট
বেঁধে যখন কোনো প্রডাক্ট বা প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকির বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে নিরূপণ করে তা
একেবারে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়, তখনই সেই প্রডাক্ট বা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন
দেওয়া হয়। এর কোনো কিছুই অনুসরণ করা হয়নি এ ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে। উল্টো একটি
সুশৃঙ্খল এবং সুনিয়ন্ত্রিত আর্থিক বাজারে কীভাবে কোনোরকম বৈধতা ছাড়া এ ক্রিপ্টোকারেন্সি
এত দীর্ঘদিন ধরে কর্তৃপক্ষের সামনে লেনদেন হতে হতে আজ ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত
হয়েছে, সেটাই একটি বড় রহস্য।
যুক্তরাষ্ট্রে বৃহৎ প্রতিষ্ঠান নিয়ে
কিছু মিথ বা ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। যেমন বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে বলা হয়
যে, ‘প্রতিষ্ঠানগুলো এতই বিশাল যে সেগুলো কখনও ধসে পড়বে না।’ আবার এমনও বলা হয় যে,
‘প্রতিষ্ঠানগুলো এতই বিশাল যে একে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।’ এ বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের ধারণাই
হয়তো বাস্তবায়িত হতে চলেছে এ ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে। এ ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজার
বাড়তে বাড়তে এত বিশাল আকার ধারণ করেছে যে, একে অবজ্ঞা করার আর কোনো অবকাশ নেই। ইচ্ছায়
হোক আর অনিচ্ছায় হোক যুক্তরাষ্ট্রকে এ অবৈধ ভার্চুয়াল মুদ্রা হজম করতেই হবে। ক্রিপ্টোকারেন্সিকে
বৈধ মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং এ আর্থিক সম্পদকে একটি সহজ নিয়ন্ত্রণের অধীন
নিয়ে আসা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ক্রিপ্টোকারেন্সিকে বৈধতা দিয়ে সহজভাবে
নিয়ন্ত্রণের দাবি দীর্ঘদিনের হলেও বাইডেন প্রশাসন কাজটি করেনি। কেননা ডেমোক্র্যাটদের
মাঝে ক্রিপ্টোসহায়ক নীতিনির্ধারকের বড় অভাব ছিল। উল্টো যে কংগ্রেসম্যানের এ ক্রিপ্টো
দেখভালের দায়িত্ব ছিল, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন অত্যন্ত ক্রিপ্টোবিরোধী। এর ফলে ক্রিপ্টোকারেন্সি
বৈধতা পাওয়ার কাজটি একেবারেই এগোয়নি। অধিকন্তু বাইডেন প্রশাসনের পুরো মেয়াদে ক্রিপ্টো
সবচেয়ে খারাপ সময় পার করেছে। গত নভেম্বরের নির্বাচনে ট্রাম্প এবং তার দল রিপাবলিকের
বিজয়ের মধ্য দিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির দুর্দিন কেটে গেছে বলেই অনেকে মনে করছেন। কেননা,
রিপাবলিকান দলের পক্ষে যেসব কংগ্রেসম্যান নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের অধিকাংশ ক্রিপ্টোপ্রেমী।
তারা নিজেরাই অনেক ক্রিপ্টোকারেন্সির মালিক। তা ছাড়া যারা ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের মালিক
বা ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের বিশাল খেলোয়াড়, তারা রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যানদের বিজয়ী
করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। বিজয়ী হয়ে তাদের অনেকেই প্রকাশ্যে ক্রিপ্টোর পক্ষে
কথা বলতে শুরু করেছেন। তা ছাড়া ট্রাম্প নিজে একজন ব্যবসায়ীবান্ধব ব্যক্তি এবং তিনিও
ক্রিপ্টোর পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। এ কারণেই নভেম্বরের নির্বাচনে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিটকয়েনের বাজারমূল্য ৮০ হাজার ডলার ছাড়িয়ে
যায়, যা বর্তমানে ১ লাখ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
সবকিছু মিলিয়ে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে
যে, ক্রিপ্টোকারেন্সি খুব সহসাই যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ মুদ্রার স্বীকৃত পেয়ে যাবে এবং সেই
সঙ্গে ডলারের মতো কোনো একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে নিয়ন্ত্রিত হয়ে এর লেনদেন চলতে
থাকবে। তেমনটা হলে এ ক্রিপ্টোকারেন্সি তখন ডলারের মতো বৈধ মুদ্রা বা লিগ্যাল টেন্ডার
হিসেবে লেনদেন নিষ্পত্তিতে ব্যবহৃত হবে। যুক্তরাষ্ট্র ক্রিপ্টোকারেন্সিকে বৈধতা দেওয়ায়
সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশও একে বৈধ মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে মোটেও দ্বিধা
করবে না। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যখন ভার্চুয়াল মুদ্রাকে স্বীকৃতি দিয়ে দেবে, তখন এ মুদ্রা
ডলার বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক মুদ্রার পাশাপাশি লেনদেন হতে থাকবে।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, ক্রিপ্টোকারেন্সির বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি এবং লেনদেন নিষ্পত্তির প্রক্তিয়া সম্পন্ন রাতারাতি হবে না। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন নিষ্পত্তিতে ব্যাপকহারে ক্রিপ্টোর ব্যবহার চালু হতে বেশ কয়েক বছর লাগবে। কিন্তু যেসব দেশ প্রথম থেকে এর অগ্রগতির ওপর খোঁজখবর এবং এ ব্যাপারে ভালো প্রস্তুতি নিয়ে রাখবে, তারা এ মুদ্রা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক লেনদেন নিষ্পত্তিতে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে। বাংলাদেশও হতে পারে এ খাতে এগিয়ে থাকা একটি দেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ কর্মকর্তা এবং ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা, যাদের কাজ হবে এ ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যাপারে হালনাগাদ খোঁজখবর রাখা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা। মোট কথা, ক্রিপ্টোকারেন্সির আগের অবস্থা যা-ই হোক না কেন, এখন এর সুদিন আসছে। আর সুদিনের সুযোগ নিতে হলে যথাযথ পূর্বপ্রস্তুতি থাকতে হবে।