বৈশ্বিক উষ্ণতা
ম্যাথিউ রাইট
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:৪৬ এএম
ম্যাথিউ রাইট
২০২৪ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময় পার করতে হয়েছে। বছরটি ছিল সবচেয়ে উষ্ণতম বছর। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে গত বছর এপ্রিলে ভয়াবহ বন্যায় শত শত মানুষ মারা গেছে। টানা খরায় আমাজন নদীর পানি ধীরে ধীরে নিচু হয়ে গেছে। গ্রিসের এথেন্সে প্রাচীন অ্যাক্রোপলিসে বিকালেও পর্যটকরা যেতে পারেননি ভয়াবহ গরমের কারণে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস নিশ্চিত করেছে, ২০২৪ সালই ইতিহাসের প্রথম বছর যখন বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াল পেরিয়েছে; যা প্রাক-শিল্পখাতের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। অস্ট্রেলিয়া ও অ্যান্টার্কটিকা বাদে সব মহাদেশেই ভয়াবহ উষ্ণতা ছিল। অন্তত ১১ মাসই তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে গেছে।

বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির মাত্রা অতীতের যেকোনো সময়কে ছাপিয়ে যেতে শুরু করেছে। আর এই বৃদ্ধির হার বাড়তেই চলেছে। কয়েক বছর ধরেই এটি একটি বড় সমস্যা হয়ে রয়েছে। এর আগে সবচেয়ে উষ্ণতম বছর ছিল ২০২৩। বিগত এক দশকেই সবচেয়ে উষ্ণতম বছরগুলো রেকর্ড করা হয়েছে। বিগত সময়ের হিসেবে ২০২৪ সালে তাপমাত্রা বৃদ্ধির মাত্রা তিনগুণ বেড়েছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং আনুমানিক জলবায়ু পরিবর্তন ও জলবায়ুর মাত্রাতিরিক্ত পরিবর্তন অনুসন্ধান করেন। এক্ষেত্রে তারা অনেক কিছু পুনর্বিবেচনাও করেন এবং স্যাটেলাইট, আবহাওয়া অধিদপ্তর এমনকি জাহাজের রেকর্ডও সংগ্রহ করেন। গত বছর তাই তাদের ব্যস্ত সময় পার করতে হয়েছে। গত বছর যে ডেটা পাওয়া গেছে, তা আমাদের আবহাওয়া ও জলবায়ু সম্পর্কে নিখুঁত চিত্র পেতে সাহায্য করছে।
২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক সমঝোতা স্মারক অনুসারে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনকে অনেক গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। অন্তত ১৯৫টি রাষ্ট্র এই স্মারকে স্বাক্ষর করে এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যায়ে বৈশ্বিক উষ্ণতাকে লক্ষ্যমাত্রার নিচে রাখার কথা বলে। ২০২৪ সালে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে যাওয়া এক হিসেবে একটি রেকর্ড। কিন্তু এক বছরেই এত তাপমাত্রা অশনিসংকেত। এক বছরেই যদি এমনটি হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এই হাল আরও বাজে দিকে মোড় নেবে।
বৈশ্বিক উষ্ণতার পেছনে এল নিনোর মতো নিরপেক্ষ প্রভাবক রয়েছে। এল নিনোর মতো অবস্থা বৈশ্বিক জলবায়ু পাল্টে দিয়েছে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অনেক বেড়েছে। এমনটি বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা যেমন বাড়াচ্ছে, তেমনি ভয়াবহ দুর্যোগ বাড়িয়ে চলেছে। নিরপেক্ষ এই প্রভাবগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবসৃষ্ট দূষণ। যদিও নীতিনির্ধারকদের দিকেই সব চাপ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে মোটামুটি স্বেচ্ছাচারী কার্যক্রমের দিকে মনোযোগ না দেওয়া একটি বড় সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিনল্যান্ডের বরফের আস্তরণ ক্রমেই গলে যাওয়ার মতো বিপর্যয়কর ঘটনাগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্ভাবনা আরও ভয়াবহ করে তুলছে। উষ্ণায়নের ক্ষেত্রে সামান্য রেকর্ডও অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
মানুষ ও বাস্তুতন্ত্রকে শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক জলবায়ু প্রভাবিত করে এবং আবহাওয়া পর্যালোচনা করে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন নানাভাবে বোঝা যায়। বৈশ্বিক জলবায়ু ও আবহাওয়ার মধ্যে সম্পর্ক অরৈখিক : ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে পৃথক তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে; যা বৈশ্বিক তাপমাত্রার গড় বৃদ্ধির চেয়ে অনেক বেশি গরম। ইউরোপে ২০২৪ সালে সবচেয়ে উষ্ণ বছর রেকর্ড হয়েছে, যা তীব্র তাপপ্রবাহে রূপ নেয়। বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপে। গ্রিস ও বলকানের কিছু অংশে দাবানলের ফলে পাইন বন এবং ঘরবাড়ির বিশাল এলাকা পুড়ে গেছে। নতুন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ১০ জুলাই বিশ্বের ৪৪ শতাংশ মানুষ তীব্র বা উচ্চতাপ চাপের সম্মুখীন হয়েছিল, যা গড় বার্ষিক সর্বোচ্চের চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় এর ফলে স্বাস্থ্যের আরও খারাপ পরিণতি এবং অতিরিক্ত মৃত্যু হতে পারে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ায় আকস্মিক বন্যায় শত শত মানুষ নিহত এবং সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। একটি প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৪ সালে বায়ুমণ্ডলীয় আর্দ্রতার পরিমাণ (বৃষ্টিপাত) সাম্প্রতিক বছরগুলোর গড়ের তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি ছিল। উষ্ণ বাতাস বেশি আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে এবং জল একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা বায়ুমণ্ডলে আরও বেশি তাপ আটকে রাখে। আরও উদ্বেগজনক হলো, এই উচ্চ আর্দ্রতার পরিমাণের অর্থ হলো চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনা আরও তীব্র হতে পারে। ২০২৪ সালে অনেক অঞ্চল ধ্বংসাত্মক বন্যার শিকার হয়েছিল, যেমন গত অক্টোবরে স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ায়। আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি হওয়ায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা এত সহজ নয় : আবহাওয়াকে পরিবর্তনকারী বাতাস এবং চাপ ব্যবস্থাও ভূমিকা পালন করে ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এর ওপর প্রভাব পড়তে পারে। এর অর্থ হলো, কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতার পরিমাণের চেয়েও দ্রুততর হতে পারে।
দীর্ঘ সময় ধরে উষ্ণতা যাতে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না হয়, তা নিশ্চিত করতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ প্রভাব এড়াতে, আমাদের দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে হবে। বর্তমান এবং ভবিষ্যতের উষ্ণতার মাত্রার কারণে সৃষ্ট অভূতপূর্ব চরম পরিস্থিতি থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য অবকাঠামোগত খাপখাইয়ে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শীতল পরিস্থিতির কারণে ২০২৫ সাল ২০২৪ সালের মতোই গরম হবে কি না, তা এখনও দেখার বিষয়। কিন্তু এই নতুন রেকর্ডটি আমাদের জলবায়ুর ওপর মানুষের বিশাল প্রভাব তুলে ধরবে এবং আমাদের সবার জন্য একটি সতর্কবার্তা হবে।
দ্য কনভার্সেশন থেকে অনুবাদ : আবেদিন আকাশ