শ্রদ্ধাঞ্জলি
অহিদুর রহমান
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৫ ১৩:৩৮ পিএম
ড. আনিসুর রহমান
‘মাইক্রো ইকোনমিকস শিখবে কৃষকের থেকে’Ñ কথাটি বলেছিলেন অর্থনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, লেখক ও গবেষক ড. আনিসুর রহমান। তিনি ছিলেন প্রাজ্ঞ ও অগ্রসর মানুষ। জন্ম ১৯৩৩ সালে। বাবা মো. হাফিজুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রিসভায় একাধিক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। আনিসুর রহমান সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুলে পড়াশোনার সময়ে সহপাঠী হিসেবে পান অমর্ত্য সেনকে। পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগ থেকে ১৯৫৫ সালে বিএ অনার্স এবং ১৯৫৬ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৫৯ সালে শিক্ষকতা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করানোর সময় তিনি প্রথম ক্লাসে বলেছিলেন, ‘তোমাদের কোনো টেক্সট বই নেই। তোমরা মাইক্রো ইকোনমিকস শিখবে কৃষকদের কাছ থেকে।’ তার লেখা বিশ্লেষণধর্মী বইগুলোর মধ্যে পথে যা পেয়েছি, উন্নয়ন জিজ্ঞাসা, যে আগুন জ্বলেছিল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ, মাই স্টোরি অব ১৯৭১, অপহৃত বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য। তিনি ১৯৬২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি লাভ করেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বিধ্বস্ত অর্থনীতি থেকে দেশকে পুনরুদ্ধারে কঠোররতামূলক ব্যবস্থার প্রস্তাব ও পরামর্শ দেন। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার পরামর্শে সাড়া না দেওয়ায় তিনি সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে সমাজতন্ত্র বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ফলে তিনি কমিশন ত্যাগ করেন। বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন ত্যাগ করা চার অধ্যাপকের মধ্যে তিনিই প্রথম।
১৯৭৫ সালের পর তিনি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় (আইএলও) যোগদান করেন। সেখানে দীর্ঘ ১৫ বছর দায়িত্ব পালন করেন। পরে দেশে ফিরে নিজেকে লেখালেখিতে নিয়োজিত করেন। ড. আনিসুর রহমান সব সময় অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনার কথা বলতেন। অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনার বিষয়টি তিনি তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রিয় করেছেন। সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ ড. আনিসুর রহমান ভালো রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। ষাটের দশক থেকে ছায়ানটের সঙ্গে ছিলেন। রবীন্দ্রসংগীতের ওপর তার একাধিক গ্রন্থ রয়েছে। যদি কাউকে রেনেসাঁ ম্যান বলতে হয়, তাহলে তিনি ড. আনিসুর রহমান। রবীন্দ্রসংগীতের জন্য ২০০৪ সালে তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। ৮ জানুয়ারি নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার কাউরাট গ্রামে ঈদগাহ মাঠের পাশে সাইডুলি নদীর তীরে পারিবারিক কবরস্থানে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। চিন্তক, লেখক ও গবেষক আনিসুর রহমানের দেশপ্রেম, তার প্রজ্ঞা এবং দেশের জন্য তার অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণীয়।