সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:৩৪ এএম
দেশের রেলপথগুলো কতটা অরক্ষিত এবং এর নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা ঠুনকো, তার এক মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত হলো ফরিদপুরে ট্রেনের ধাক্কায় মাইক্রোবাস পুকুরে পড়ে দুই নারীসহ পাঁচজন নিহতের ঘটনা। ৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার ফরিদপুর সদরের গেরদা এলাকায় রাজবাড়ী-ভাঙ্গা রেলপথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত খবরে জানা যায়, মধুমতি এক্সপ্রেস নামের ট্রেনটি খুলনা থেকে ফরিদপুর হয়ে ঢাকা যাচ্ছিল। মাইক্রোবাসটি আসছিল গেরদা থেকে মুন্সিবাজারের দিকে। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ফরিদপুর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা জানান, দুপুর ১২টা ২৮ মিনিটে খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে যান। সেখান থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আহত ব্যক্তিদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মাইক্রোবাসটি পুকুরে পড়ে যায়। এদিকে বুধবার রাত সাড়ে ৪টার দিকে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলায় তালুকদারবাড়ি মোড় এলাকায় রেলক্রসিংয়ে আরও একটি দুর্ঘটনা ঘটে। প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে রেলক্রসিং পারাপারের সময় ট্রেনের ধাক্কায় আক্রান্ত হয় সারবোঝাই ট্রাক। এতে আহত হয়েছেন ট্রেন ও ট্রাকের চালকসহ চারজন। ট্রাকটি দুমড়ে-মুচড়ে দুই টুকরো হয়ে যায়। দুর্ঘটনার পর জামালপুর-তারাকান্দি রেলপথে ট্রেন চলাচল প্রায় ৫ ঘণ্টা বন্ধ থাকে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অরক্ষিত ক্রসিংগুলো যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। অথচ রেল একটি নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা, তা সারা বিশ্বে স্বীকৃত। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে রেল নিরাপদের পরিবর্তে কতটা বিপজ্জনকÑ তা আমরা প্রায়শই দেখি। সবশেষ ফরিদপুর ও জামালপুরের দুর্ঘটনা তার প্রমাণ। ‘নিজ দায়িত্বে পারাপার হোন/পারাপারের সময় দুর্ঘটনার জন্য রেল কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়’Ñ এমন লেখাসংবলিত সাইনবোর্ড রয়েছে দেশের লেভেল ক্রসিংগুলোর দুপাশে। বহু স্থানেই নেই গেটম্যান। অরক্ষিত এসব লেভেল ক্রসিং দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যাত্রী ও পণ্যবাহী ছোট-বড় যানবাহন। অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়লেও তা প্রতিরোধে নেই শক্ত কোনো পদক্ষেপ। দ্রুত এসব ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিংয়ে ব্যারিয়ার ও গেটম্যান নিয়োগের বিষয়টি নাগরিকের স্বার্থে জরুরি।
অক্টোবর, ২০২৪ রোড সেফটি ফাউন্ডেশন (আরএসএফ) প্রকাশিত জরিপে দেখা যায়, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে সারা দেশে রেলের ১ হাজার ২২৮টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৪০৩ জন নিহত ও ১ হাজার ২৬৯ জন আহত হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, রেলওয়ের বৈধ-অবৈধ রেলক্রসিংগুলোর ৮৪ শতাংশই অরক্ষিত। রেল দুর্ঘটনায় যত প্রাণহানি ঘটে, সেগুলোর ৮৯ শতাংশই ঘটেছে অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ের কারণে। এর সর্বশেষ অসহায় শিকার ফরিদপুর ও জামালপুরে। দেশে রেলপথে মোট ক্রসিং আছে ২ হাজার ৮৫৬টি। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৩৬১টির অনুমোদন নেই আর ১ হাজার ৪৯৫টি বৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যে ৬৩২টির গেটম্যান নেই। অবৈধ ক্রসিংয়ের বেশিরভাগ রাস্তাই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) ও ইউনিয়ন পরিষদের। পরিসংখ্যানগুলো উদ্বেগজনক। আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়, যখনই রেল দুর্ঘটনা ঘটে তখন দায়ী ব্যক্তিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। তবে তদন্ত কমিটির রিপোর্টের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিশেষ নজির খুব একটা নেই।
আমরা জানি, রেলপথের একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ আইনত দণ্ডনীয়। এ আইন দেশের জনসাধারণ কতটুকু মেনে চলছে, তা দেখার কেউ নেই। রেলওয়ে অধ্যাদেশ ১৮৯০ অনুসারে বিনা অনুমতিতে রেলপথের ওপর দিয়ে হাঁটলে গ্রেপ্তারসহ দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আর কত মানুষের প্রাণ গেলে লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার মৃত্যুর মিছিল থামবে। যেহেতু দেশে ট্রেন দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ অবৈধ ও অরক্ষিত রেলক্রসিং, সেহেতু অবিলম্বে অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলো বন্ধ করতে হবে। রেল পথে জননিরাপত্তার বিষয়টি জরুরি বিবেচনায় নিতে হবে। প্রতিটি রেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান ও প্রতিবন্ধক বার থাকা নিশ্চিত করতে হবে। মৃত্যুসংখ্যা হ্রাস করার জন্য সর্বাগ্রে শক্তিশালী রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি। শুধু আইন করেই দায় শেষ করা যাবে না, এর যথাযথ প্রয়োগ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দায় যেন কেবল বক্তব্য বা বিবৃতিতেই শেষ না হয়। এ যাবৎ ঘটে যাওয়া সব দুর্ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা এবং সে অনুয়ায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অরক্ষিত রেলক্রসিং এবং অবহেলাজনিত দুর্ঘটনা যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে।