পর্যবেক্ষণ
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:২৪ এএম
মহিউদ্দিন খান মোহন
কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ৬ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে তিনি তার এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে জাস্টিন ট্রুডো বলেছেন, তিনি তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে কানাডার লিবারেল প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন জাস্টিন ট্রুডো। এরপর পরপর তিন মেয়াদে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন। বর্তমানে তৃতীয় মেয়াদের শেষ বছরে ছিলেন।
হঠাৎ জাস্টিন ট্রুডো কেন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। কেননা, একজন সফল প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই পরিচিতি ছিল তার। ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবানও। তার, তার পরিবার বা ঘনিষ্ঠ কারও বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে আর্থিক দুর্নীতিরও কোনো অভিযোগ নেই। এমনকি নেই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের ওপর জুলুম-নির্যাতনেরও কোনো অভিযোগ। এ রকম একজন সপ্রতিভ জননেতা কেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় নিষ্ক্রান্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তা নিয়ে আমাদের মতো দেশের মানুষের মনে ধন্দ সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ আমরা এ ধরনের ঘটনা দেখে অভ্যস্ত নই। বরং আমরা অভ্যস্ত হাজারো দুর্নীতি-অনিয়ম-লুটপাটের অভিযোগে জনগণের ক্ষোভ-বিক্ষোভ সত্ত্বেও জোঁকের মতো ক্ষমতার গদি আঁকড়ে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা দেখে। আমরা দেখেছি গদি টিকিয়ে রাখতে মানুষকে পাখির মতো গুলি করে মারতে। ফলে রাজনৈতিক নিস্তরঙ্গ পরিবেশে একটি উন্নত দেশের প্রধানমন্ত্রীর স্বেচ্ছায় পদত্যাগের ঘোষণা আমাদের বিস্মিত করবে, এটাই স্বাভাবিক।

সমস্যা ছিল জাস্টিন ট্রুডোরও। সংবাদ সম্মেলনে সে কথা স্বীকারও করেছেন। বলেছেন, বাধার কারণে কয়েক মাস ধরে পার্লামেন্ট পুরোপুরি অচল হয়ে আছে। একই সঙ্গে কয়েক মাস ধরে উৎপাদনশীলতার ঘাটতি রয়েছে। কানাডার রাজনীতিতে উত্তাপ কমিয়ে আনতে এখন নতুন ভাবে শুরু করার সময়। ট্রুডো বলেছেন, ‘দেশি ও আন্তর্জাতিক এ “জটিল” সময়ে দেশকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য পার্লামেন্টে একটি “নতুন শুরু” দরকার।’ মূলত গত বছরের অক্টোবরে প্রাদেশিক ও স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির কাছে লিবারেল পার্টির ভরাডুবির পর থেকেই ট্রুডোর ওপর চাপ বাড়ছিল। এরপর ডিসেম্বরে রাষ্ট্রীয় নীতি নিয়ে মতদ্বৈধতার কারণে অর্থমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ডের পদত্যাগের পর সে চাপ আরও বাড়ে। তার দলের নেতাকর্মী ও নীতিনির্ধারকরা চান আগামী পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রুডো যেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। দলের এ মনোভাবের প্রতি সম্মান দেখিয়েই তিনি সরে দাঁড়ালেন সরকার ও দলীয় প্রধানের পদ থেকে।
জাস্টিন ট্রুডো যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত হলেও বিশ্ব ইতিহাসে বিরল নয়। এর আগে আমরা দেখেছি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাককে আগাম নির্বাচন দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা ছেড়ে দিতে। বহু গণতান্ত্রিক দেশেই নানা কারণে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানদের সসম্মানে আসন ছেড়ে দেওয়ার নজির রয়েছে; যা আমাদের ইতিহাসে বিরল। এ ক্ষেত্রে একটি ভাবনা সঙ্গত কারণেই আসতে পারে, অন্য অনেক দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানরা যেটা পারেন, আমাদের সরকারপ্রধানরা কেন তা পারেন না? কেন রাষ্ট্রক্ষমতার মায়া ত্যাগ করতে তাদের কষ্ট হয়? সেটা কি তারা রাষ্ট্র অর্থাৎ দেশকে অত্যধিক ভালোবাসেন বলে? নাকি অন্য কিছু? তবে ব্যাপারটি সম্ভবত মোটেও তেমন নয়। নির্মম বাস্তবতা হলো, আমাদের রাজনীতিকরা যখন যিনি বা যারা ক্ষমতায় বসেছেন, তারাই চিরস্থায়ীভাবে তাদের অবস্থান বন্দোবস্তে রূপ দিতে তৎপর হয়েছেন। কেউই এ প্রবণতার বাইরে ছিলেন না।
এর কারণ কী? এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। সেটা হলো, আমাদের রাজনীতিকরা রাষ্ট্রক্ষমতাকে দায়িত্ব মনে করেন না, মনে করেন ‘ক্ষমতা’। এ ক্ষমতা যে ব্যক্তিগত নয়, রাষ্ট্রীয় তা-ও তারা ভুলে যান। তারা মনে রাখেন না যে, রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক লাভ-অলাভ বা স্বার্থে ব্যবহার্য নয়। অন্য দেশের রাজনীতিকরা রাষ্ট্রক্ষমতা প্রাপ্তিকে ‘দায়িত্ব প্রাপ্তি’ মনে করে সে দায়িত্ব পালনে ব্রতী হন। আর আমাদের রাজনীতিকরা, যারা সরকারে যেতে পারেন, তারা রাষ্ট্রক্ষমতাকে দায়িত্ব না ভেবে যা খুশি করার ক্ষমতা মনে করেন। বিপত্তিটা ঘটে এখানেই।
পদত্যাগের আগে জাস্টিন ট্রুডো তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। পরিবারের সদস্যরা তাতে সম্মতি দিয়েছেন বোঝা যায়। এটা সম্ভব হয়েছে, কারণ ট্রুডো তার পরিবারের কাউকে উত্তরাধিকারী বানাননি। আমাদের মতো পারিবারিক উত্তরাধিকারের প্রকোপ সেখানে নেই। তা ছাড়া ক্ষমতাধর কারও প্রভাব ব্যবহার করে পরিবার, স্বজন কিংবা ঘনিষ্ঠজনদের বৈধ-অবৈধভাবে বিত্তবৈভব অর্জনের চিন্তাও তারা করেন না। ফলে রাষ্ট্রক্ষমতার পদ থেকে সরে যেতে তাদের কষ্ট হয় না।
কিন্তু আমাদের প্রেক্ষাপট একেবারে ভিন্ন। এখানে একবার ক্ষমতাসীন হতে পারলেই বিত্ত অর্জনের কোহিনুর পাথর হস্তগত হবেÑ এমন ধারণা অনেকেরই রয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগে এক ভদ্রলোক মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমাদের একজন যদি মন্ত্রী-এমপি হতে পারে, তাহলে তার চৌদ্দপুরুষ বসে বসে খেতে পারে। আর দেখেন, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের রাজধানী আগরতলায় থাকার মতো একটি বাড়ি নেই। অন্যদিকে আমাদের মন্ত্রী-এমপিদের দেশবিদেশে বাড়ির অভাব নেই।’ উল্লেখ্য, বামপন্থি রাজনীতিবিদ মানিক সরকার ১৯৯৮ থেকে ২০১৮ সালের ৮ মার্চ পর্যন্ত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়ার পর মানিক সরকারকে উঠতে হয়েছিল পার্টি অফিসে। এটা ঠিক, সবাই মানিক সরকার হতে পারেন না। সবাই হয়ও না। তবে একজন মানুষ যদি সৎ থাকতে চান তাহলে কেউ তাকে অসৎ বানাতে পারে না। ক্ষমতাধরদের চারপাশে অনেক মোসাহেব জোটে, যাদের কারণে তারা অনেক সময় বিভ্রান্ত হন, বিপথে পা বাড়ান। কিন্তু এও ঠিক, যাদের আত্মশক্তি প্রবল তাদের কেউ সহজে বিভ্রান্ত করতে পারে না, যদি তারা নিজেদের সংযত করতে পারেন। রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত বিত্তবৈভবের পাহাড় গড়ার যে নজির গত পনেরো বছরে স্থাপিত হয়েছে, তা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে ন্যক্কারজনক হিসেবেই চিহ্নিত হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আক্ষরিক অর্থেই রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার নজিরও স্থাপিত হয়েছে ওই মুদ্দতে; যার শেষ পরিণতি সরকারপ্রধানের সপারিষদ পলায়ন।
কানাডার জাস্টিন ট্রুডো স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। আর আমাদের কোনো কোনো শাসক ক্ষমতায় টিকে থাকতে গণহত্যা করতেও দ্বিধা করেন না। আমাদের জাতীয় জীবনের এও এক নিদারুণ ট্র্যাজেডি!