ক্রিকেট
ইকরামউজ্জমান
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:০৬ এএম
ইকরামউজ্জমান
ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত ক্রিকেটের কথা ভাবলেই মনের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা এবং আনন্দের রিনিঝিনি বেজে ওঠে। দুনিয়ার অনেক মাঠে খেলা দেখেছি, কিন্তু এই সত্তরোর্ধ্ব বয়সে এখনও সুযোগ হয়নি কৃত্রিমতামুক্ত পরিবেশে গা এলিয়ে ক্রিকেট উপভোগ করার। ক্রিকেট সাহিত্যের পাতায় পাতায় তো সেখানকার মাঠগুলোর লোভনীয় ক্রিকেট পরিবেশের ছবি নিখুঁতভাবে আঁকা আছে। সব ইচ্ছে তো আর পূরণ হওয়ার নয়। তাই সাহিত্য আর সরাসরি আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া খেলা উপভোগের উপায়ও নেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট মানেই উপভোগ্য অপরূপ ক্রিকেট। এই ক্রিকেটের মাদকতাই আলাদা। ওয়েস্ট ইন্ডিজদের ক্রিকেট দর্শন এবং মূল্যবোধের সঙ্গে অন্যদের মেলানো যাবে না।

কোথায় পাবেন প্রতিপক্ষের কাছে (বাংলাদেশ) টি-টোয়েন্টি সিরিজে ৩-০ ‘হোয়াইটওয়াশ’ হওয়ার পর খেলার শেষে বিজেতা দলের কোচ বিজয়ী দলের সাজঘরে এসে হাসিমুখে খেলোয়াড়দের অভিনন্দন জানাচ্ছেন ভালো ক্রিকেট উপহার দেওয়ার জন্য। ওরা বিশ্বাস করে খেলাটা যুদ্ধ নয়। খেলা আনন্দের, আনন্দ বিতরণের। ওদের জীবন বেগবান। তাই ওদের অনুভূতি অন্যরকম। ওরা সবকিছুকে সহজভাবে নেয়। ওদের ব্যাটে বিপ্লবের বীণা বাজে। আর বলে বিষাক্ত ছোবল। দুবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটাররা প্রথম থেকেই টি-টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের অন্যতম আকর্ষণ। প্রথম দিকে ওরাই এই ক্রিকেটে আনন্দের ‘ডানাটাকে’ সাজিয়েছে। টি-টোয়েন্টি সংস্করণকে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে ওদের অবদান সবচেয়ে বেশি। স্ট্রাইক রেট, পাওয়ার হিটার, দ্রুত তির বল এবং বিভিন্ন ধরনের সাহসী উদ্ভাবনÑ সবক্ষেত্রেই তো দ্বীপপুঞ্জের ক্রিকেটাররা এগিয়ে আছেন। ওরা টি-টোয়েন্টির পুরোহিত।
টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ে চার নম্বর দলের অবস্থান ৩-০ তে পরাজয়ের পর কোথায় যাবে সহজেই এটি অনুমেয়। ইতোমধ্যেই টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হারার ক্ষেত্রে (২১৬টি ম্যাচের মধ্যে ৯৩টিতে জিতেছে, হেরেছে ১০৯টিতে। বাদ বাকি ১৪টি খেলায় টাই বা ফল হয়নি) ওয়েস্ট ইন্ডিজ নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। খাদের কিনারায় চলে গেছে ওদের টি-টোয়েন্টি! তবে স্বভাবজাত প্রতিভা আর সামর্থ্যের অধিকারী দ্বীপপুঞ্জের ক্রিকেটাররা এতে ভেঙে পড়েননি। ওরা জানে ঘুরে দাঁড়াতে। এখানে একটি কথা উল্লেখ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি, সেটি হলো ত্রিনিদাদ বার্বাডোজ, জ্যামাইকাসহ অন্য সব দ্বীপপুঞ্জের কিশোর তরুণ ও যুবকরা ভীষণভাবে বাস্কেটবল খেলার প্রতি ঝুঁকেছেন। এর পেছনে অর্থনীতি একটি বড় কারণ। ক্রিকেটের থেকে বাস্কেটবলে বেশি উপার্জন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে গিয়েছিল বাংলাদেশ। দুটি টেস্টের সিরিজ ১-১ ড্র হয়েছে। এরপর তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ। যেটি বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রদর্শনের জায়গা। তিন ম্যাচের সিরিজে লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ হোয়াইটওয়াশ হয়েছে। সংক্ষেপে এর কারণ ব্যাটিং এবং বোলিংয়ে সমানভাবে পারফর্ম করতে পারেনি দল। তিনশর বেশি রান করেও ডিফেন্ড করা সম্ভব হয়নি। ক্রিকেট দলীয় খেলা। সব বিভাগে পারফর্ম করা ছাড়া উপায় নেই। ইতিহাস কখনই তার অস্থির অতীত ভুলে যাবে না। ওয়ানডে ক্রিকেটে এগিয়ে যাওয়ার মূল চাবিকাঠি অস্থির অতীত থেকে বোঝা এবং শিক্ষা নেওয়া।
ওয়ানডে ক্রিকেটে হোয়াইটওয়াশ, এর পর টি-টোয়েন্টি দলে নেই সাকিব আল হাসান, মাহমুদ উল্লাহ, মুস্তাফিজুর রহমান এবং নাজমুল হাসান শান্ত। ক্রিকেটের তিন সংস্করণের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে দুর্বল টি-টোয়েন্টিতে। ২০১৮ সালের পর বাংলাদেশ দল টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জয় পায়নি। এবার নতুন দিন এবং সময়ে লক্ষ্য ছিল ভালো খেলে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হলেও টি-টোয়েন্টিতে সেই শোধ তুলেছে বাংলাদেশ। ব্যাটে-বলে দাপট দেখিয়ে প্রতিপক্ষকেও ফিরিয়ে দিয়েছে একই স্বাদ। ঘটনাবহুল ২০২৪-এর শেষপর্যায়ে এসে এই সিরিজ জয় স্মরণীয় জয়ের অন্যতম।
আগেই লিখেছি ওয়েস্ট ইন্ডিজ দুই দুইবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বাংলাদেশ দল কখনও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও খেলতে পারেনি। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ১৮২ টি-টোয়েন্টি খেলেছে, এর মধ্যে জিতেছে ৭১টি, হেরেছে ১০৭টিতে আর ফল হয়নি ৪টিতে। এবারের সিরিজে বাংলাদেশ জিতেছে যথাক্রমে ৭, ২৭ ও ৮০ রানে। প্রতি ম্যাচে প্রতিপক্ষ দলকে ‘অলআউট’ করেছে। তিন ম্যাচে সংগ্রহ ছিল যথাক্রমে ১৪৭, ১২৯ এবং ১৮৯ রান। বাংলাদেশ দলের বোলিং ইউনিটের পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। স্পিন ও পেস আক্রমণ দুটোতেই বাংলাদেশ দল সমষ্টিগতভাবে কামিয়াম হয়েছে। প্রথম ম্যাচে ম্যাচসেরা খেলোয়াড় মেহেদি। দ্বিতীয় ম্যাচে শামীম আর শেষ ম্যাচে জাকের আলী অনিক। আর সিরিজ সেরা হয়েছেন মেহেদি হাসান। দলের বোলাররা অসাধারণ বোলিং করেছেন। এবারের সিরিজ জয় পুরোপুরি সম্মিলিত অবদানের (ব্যাটিং ও বোলিং) ফল। তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে ব্যাটিং ও বোলিংয়ে কতগুলো নাম ভীষণ উজ্জ্বল, তারা হলেন জাকের আলী, শামীম হোসেন, সৌম্য সরকার, মিরাজ, মাহমুদ হাসান, তাসকিন, তানজিম, মেহেদি, রিসাদ প্রমুখ। এখন প্রয়োজন অবিলম্বে টি-টোয়েন্টিতে অসংগতিগুলো সংশোধন করে আগামীর দিকে নজর দেওয়া। আমরা পূর্ণশক্তির টি-টোয়েন্টি দল না নিলেও যেভাবে পূর্ণশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ধবলধোলাই করেছি, র্যাঙ্কিংয়ে নবম বাংলাদেশের জন্য তা গৌরবের। আমরা ক্রিকেটে সব সময় এমন বাংলাদেশকেই দেখতে চাই। যারা যেকোনো পরিস্থিতিতে জয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম ও মরিয়া হবে।