সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৪:২৫ পিএম
খাদ্যপণ্যের বাজারে মূল্যস্ফীতির ছায়া দীর্ঘদিনের। কখনও এ পণ্য, কখনও ও পণ্য, আবার দেখা যায় একসঙ্গে বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়ে যায় যৌক্তিক কোনো কারণ ছাড়াই। চাল আমাদের প্রধান খাদ্যপণ্য এবং এ চাল নিয়ে চালবাজি চালবাজদের বহু পুরোনো। ২৭ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভরা মৌসুমেও চড়া চালের দাম। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত ১৫ দিনে প্রতি বস্তা চালে বেড়েছে ২৫০-৩০০ টাকা। কোনো কারণ ছাড়াই ভোগ্যপণ্যের যখন তখন অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধির সম্পর্কে আমাদের সমাজে বহুল কথিত শব্দ সেই ‘সিন্ডিকেট’-এর অপছায়া যেন সরানোই যাচ্ছে না। খাদ্য মন্ত্রণালয় আমন মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে ৩৬ টাকা দরে প্রতি কেজি ধান, মিলারদের কাছ থেকে ৪৭ টাকা দরে প্রতি কেজি সেদ্ধ চাল ও ৪৬ টাকায় আতপ চাল কিনছে। কিন্তু অভিযোগ আছে, ধান-চাল সংগ্রহের এই অভিযানে আশানুরূপ চিত্র দৃশ্যমান নয়।
মাত্র কয়েক দিন আগে ভোজ্য তেল নিয়ে ‘ভোজবাজি’র বার্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ উঠে এসেছে। দেখা গেছে, কায়দা-কৌশলে ভোজ্য তেল আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা ফের কারসাজি করে আরেক দফা আখের গুছিয়েছেন। এখন ভরা মৌসুমে যৌক্তিক কারণ ছাড়াই চালের দামবৃদ্ধি সম্পর্কে মিলার-আড়তদার-মজুদদারদের সেই পুরোনো অজুহাত দাঁড় করানোর অপপ্রবণতার বার্তাটিও সংবাদমাধ্যমেই উঠে এসেছে। মজুদ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নেই কোনো সংকট, তারপরও পাইকারি থেকে খুচরা সব পর্যায়েই চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিস্ময়কর যুগপৎ প্রশ্নবোধক। সহযোগী একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু চালই নয়, আরও কিছু নিত্যপণ্যের দাম আরেক দফা বেড়ে গেছে। আমাদের সমাজে ‘মোটা ভাত, মোটা কাপড়’ এই প্রবাদটি বহুল প্রচলিত। কিন্তু আমরা দেখছি, মোটা ভাত কিংবা মোটা কাপড়Ñ এই দুই-ই মোট জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশের পক্ষে জোগাড় করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অনেক ক্ষেত্রে যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অনেক নিত্যপণ্যের দাম সিংহভাগ ভোক্তার ক্রয়সাধ্যের বাইরে রয়েছে। তারা তাদের নিত্য চাহিদায় কাটছাঁট করেও জীবনযাপন স্বাভাবিক রাখতে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন।
আমরা দেখছি, অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কার্যত কোনো কিছুই ভোক্তার জন্য সুফল বয়ে আনতে পারছে না। অন্তর্বর্তী সরকারেরও দায়িত্বশীল কেউ কেউ ‘সিন্ডিকেট’-এর কারসাজির কথা ইতোমধ্যে বহুবার স্বীকার করেছেন। আমরা প্রশ্ন রাখতে চাই, অদৃশ্য শক্তি ‘সিন্ডিকেট’-এর হোতাদের হাত কি আইনের হাতের চেয়েও লম্বা। বাজারে নজরদারি-তদারকির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে কয়েক দফা ব্যাংকের সুদহারও বাড়ানো হয়েছে। আমরা মনে করি, সবকিছুর আগে জরুরি উৎসে নজর দেওয়া। বাজার অর্থনীতির নীতিসূত্র বলে, চাহিদার নিরিখে সরবরাহ ব্যবস্থায় যদি ঘাটতি থাকে তাহলে বাজারে সংকট সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু আমরা দেখেছি, ইতোমধ্যে যতবার বাজারে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অদৃশ্য শক্তির বাজারে নাটাই ঘোরানোর প্রসঙ্গটি সামনে এসেছে। আমাদের প্রধান খাদ্যপণ্য চালও এর বাইরে থাকতে পারেনি। আমরা দেখেছি, কারসাজি করে ইতোমধ্যে কয়েক দফা চালের দাম বাড়িয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভোক্তার পকেট কেটে নিজেদের আখের গুছিয়েছেন। চালের দাম বাড়ার পেছনে মিলারদের চালবাজির বিষয়টিও নতুন কিছু নয়। ইতঃপূর্বে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনেই জানা গিয়েছিল, চালের বাজার মিলাররা নিয়ন্ত্রণ করেন এবং তাদের কারসাজির পরিসর অনেক বিস্তৃত। চাল নিয়ে অতিমুনাফাখোরদের চালবাজি থামাতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও পক্ষগুলোকে কাজের কাজ নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগ আরও গভীর করতে হবে।
টিসিবিসহ খোলাবাজারে চালের সরবরাহ বাড়িয়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি চালের বাজারে যারা কারসাজির নাটাই ঘোরাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিবিধান করার কোনো বিকল্প নেই। মিলার-আড়তদার কিংবা খুচরা ব্যবসায়ীদের পরস্পরের দোষারোপের বিষয়টিও অতি পুরোনো। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, দাম যখন বাড়ে তখন সংশ্লিষ্ট কেউ দায় নিতে রাজি হন না, উপরন্তু একে অপরকে দায়ী করে গা বাঁচানোর চেষ্টা করেন। এমন অপতৎপরতা কোনোভাবেই চলতে পারে না। আমরা আরও মনে করি, বাজার অস্থিতিশীল করে যারা ভোক্তার নাভিশ্বাস তুলে আখের গুছিয়ে চলেছেন; তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও বিকল্প কিছু নেই। বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা দুরদর্শিতা-কঠোরতার মধ্য দিয়ে জয় করতেই হবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে সরকারের দায়িত্বশীল সব পক্ষকে যূথবদ্ধভাবে। চালের বাজারে সাঁড়াশি অভিযান চালানোর ওপরও আমরা গুরুত্বারোপ করি।