× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফিলিস্তিনে হত্যাযজ্ঞ

ইসরায়েল কেন এত বেপরোয়া

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৪:১৬ পিএম

ইসরায়েল কেন এত বেপরোয়া

সচেতন মানুষ মাত্রেই, প্রধান পরিচালক হিসেবে জাতীয় কবি নজরুলের ‘লাঙল’ পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয় ২৫ ডিসেম্বর, ১৯২৫ সালে। শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ পার্টির সাপ্তাহিক মুখপত্ররূপে পত্রিকার প্রথম সংখ্যার শুরুতেই ছিল কবি চণ্ডীদাসের অমর বাণীÑ ‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ উল্লেখ্য, পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যার শুরুতেই এ বাণীটি লিপিবদ্ধ থাকত। পত্রিকাটির প্রধান লেখক-পরিচালক ছিলেন কবি নজরুল। তার লেখার জনপ্রিয়তার জন্য পত্রিকার কোনো কোনো সংখ্যা এক দিনের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যাওয়ায় আবার ছাপাতে হতো। মূলত প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘সাম্যবাদী’ কবিতাতেই তার কবিমানসের অসাধারণ বিশ্বজনীন স্বরূপ উন্মোচিত হয়। তিনি লিখেছিলেন, ‘গাহি সাম্যের গানÑ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান। যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।’ স্মরণযোগ্য বিষয় হচ্ছে, এ লাঙল পত্রিকার ত্রয়োদশ সংখ্যায় বিশ্বকবি রবিঠাকুরের ‘আশীর্বাণী’তে উপস্থাপিত হয়Ñ ‘হাল ধর বলরাম, আন তব সরুÑভাঙ্গা হল: বল দাও, ফল দাও, স্তব্ধ হোক ব্যর্থ কোলাহল।’ একই ধরনের উচ্চারণে রবিঠাকুর ‘সভ্যতার সংকটে’ মানুষকে সচেতন করার প্রয়াস চালিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘকাল পরও মানবিক সংকটের দৈন্য ঘোচেনি। ক্ষমতাবানদের স্বার্থের সমীকরণে চলছে বহুমাত্রিক মেরুকরণ।

আধুনিক কথিত উন্নয়ন বিশ্বের ক্ষমতাধর কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর যুদ্ধংদেহী মনোভাব বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে অবলোকন করছে। একদিকে মানবতার চরম বিপর্যয়Ñ মানবাধিকারের নির্লজ্জ লঙ্ঘনে হত্যা-গণহত্যার ঘৃণ্য দৃশ্যপট নির্মাণ; অন্যদিকে তাদেরই সৃষ্ট ভয়াবহ অস্ত্র প্রতিযোগিতা বিশ্বকে চরম পর্যুদস্ত করে চলেছে। শত কোটি মানুষের মানবেতর জীবনযাপনে তাদের ন্যূনতম ভ্রুক্ষেপ নেই। মানবসভ্যতা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই নতুন নতুন আধুনিক অস্ত্রের উৎপাদন-ব্যবহার এবং বিক্রি এক বিকারগ্রস্ত বিশ্ব তৈরিতে কদর্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। অর্থলিপ্সুতা ও আধিপত্যবাদ সর্বনিকৃষ্ট হিংস্রতা অবিরাম জাগিয়ে রাখছে। সত্য-সুন্দর-কল্যাণ-আনন্দের সব অনুষঙ্গ ঘৃণ্য উন্মাদনায় খুন করে বিশ্বকে লন্ডভন্ড করার ভয়ংকর অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। বিশ্বের সব জাতিরাষ্ট্রে প্রচলিত ধর্মীয় ঐতিহ্য, রাজনৈতিক আচরণ ও আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারে সাংস্কৃতিক-অসাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির বন্ধন অক্ষুণ্ন থাকলেও শক্তিমত্তায় অন্ধ রাষ্ট্রগুলো তা পরিপূর্ণ অবজ্ঞা করে চলেছে। মানবতার এ পীড়ন তো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। মানুষ যুগে যুগে শান্তির জন্য লড়েছে, শান্তি প্রত্যাশা করে আসছে।

মানবাধিকার সুরক্ষার নামে অনেক দেশে গৃহযুদ্ধ বহাল রেখে প্রাকৃতিক সম্পদসহ সামগ্রিক লুণ্ঠনে যাদের জুরি নেই তারা মহাশক্তিধর। এসব হীনকাজে লিপ্ত সব অশুভ শক্তি ঐক্যবদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের নির্মম নির্দয় অত্যাচার-অনাচার, হত্যা-গণহত্যা সভ্যতাকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে তার নির্মোহ পর্যালোচনা জরুরি। স্বল্পপরিসরে বিশদ ব্যাখ্যা সম্ভব না হলেও এটুকু নিশ্চিত বলা যায়; রোমহর্ষক গাজা উপত্যাকা-সিরিয়া ও অন্যান্য দেশে এদের বর্বর অভিযানে বিশ্ববিবেক প্রায় নিশ্চুপ। বিশ্ববাসী সম্যক অবগত আছে, ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালে ফিলিস্তিনের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে দীর্ঘকাল ধরে পরিচালিত যুদ্ধের অংশ হিসেবে হামাসের ইসরায়েল আক্রমণ কেন্দ্র করে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে গাজা ও পশ্চিম তীরে নৃশংসতম হত্যা-গণহত্যার দৃশ্যাদৃশ্য ভয়ংকররূপ পরিগ্রহ করেছে। বিশ্বের কতিপয় ক্ষমতাধর কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রনায়কের প্রত্যক্ষ মদদ ও আধুনিক সামরিক সহযোগিতা অব্যাহত রেখে নারকীয় তাণ্ডবের নজিরবিহীন দৃশ্যপট তৈরি করে চলেছে। এমনটি কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত না হলেও বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় এরই উৎকট চিত্র দৃশ্যমান। মানবসভ্যতার জন্য তা কলঙ্ক।

সমগ্র ধরিত্রীর সভ্যসমাজ বোবাদৃষ্টিতে এহেন বর্বর কর্মযজ্ঞ শুধু পর্যবেক্ষণ করছে না; তীব্র ঘৃণা ও নিন্দার সঙ্গে ইসরায়েলি বেপরোয়া অপকৌশল প্রত্যাখ্যান করছে। 

ইসরায়েলকে সরকারপ্রধানদের সমর্থন স্ব স্ব দেশে সাধারণ মানুষ কর্তৃক জঘন্য ঘৃণার চোখে দেখা হচ্ছে। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বিশ্বের সব বিবেকবান মানুষ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণ ও বাস্তবায়নে পক্ষাবলম্বন করা সত্ত্বেও কথিত প্রভাবশালী একটি দেশের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে তা নস্যাৎ হয়েছে। তথাকথিত মানবাধিকার সুরক্ষার সবক প্রদানকারীদের কঠিন হৃদয় এত বিশালসংখ্যক শিশু-কিশোর-নারী হত্যায় মোটেও বিচলিত হচ্ছে না; বরং নিষ্ঠুর সংঘাতের মনোভাব নিয়ে পুরো ফিলিস্তিনকে পরিপূর্ণ ধ্বংসের হীন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২৪ ডিসেম্বর গণমাধ্যমে প্রকাশিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২৩ ডিসেম্বর ভোর পর্যন্ত গত ১৪ মাসব্যাপী ইসরায়েলি অভিযানে গাজায় নিহত হয়েছে ৪৫ হাজার ৩১৭ জন এবং আহত হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৭১৩ জন। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নিহত ও আহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কারণ ভবনের ধ্বংসস্তূপের তলায় অনেকে চাপা পড়েছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবলের অভাবে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, গাজার হতাহতের মূল চিত্র পাওয়া যাবে যুদ্ধ শেষ হলে।

যুদ্ধ আইন-বিশ্বমানবতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনে ইসরায়েলের অমানবিক হামলায় আবাসিক ভবন-স্কুল-মসজিদ-গির্জা-অ্যাম্বুলেন্স-হাসপাতালগুলো ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমিতেও হামলা চালিয়ে নষ্ট করেছে শাকসবজিসহ অন্যান্য খাদ্যশস্য। হামলার সঙ্গে সঙ্গে দখলদার ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খাদ্যের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় অবর্ণনীয় দুর্বিষহ সময় পার করছে গাজাবাসী। জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে গাজা এখন পরিপূর্ণ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। মানবাধিকার ও দাতব্য সংস্থাগুলোর মতে, এ পর্যন্ত যে ত্রাণ গাজায় পৌঁছেছে গাজাবাসীর তুলনায় এ সাহায্য সমুদ্রে এক বিন্দু পানির মতো। জ্বালানি সংকটের কারণে এখনও চালু হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসাসেবা প্রায় বন্ধের উপক্রম হয়েছে। হাসপাতালে জরুরি সেবা ছাড়া মিলছে না অন্যান্য সেবা। ফলে বিধ্বস্ত গাজায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে গাজায় সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলাও করা হয়েছে। তবু ইসরায়েলকে এ নৃশংসতা থেকে বিরত করা যাচ্ছে না। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট ঘোষণা, হামাসকে পুরোপুরি দুর্বল-অকার্যকর এবং জিম্মিদের মুক্ত করার আগ পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।

১৯৪৮ সাল থেকে নির্যাতিত-নিপীড়িত ফিলিস্তিনিরা যুগের পর যুগ চরম অবিচারের সম্মুখীন। দেশ থেকে জোরপূর্বক বিতাড়নের মাধ্যমে ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েল যে দখলদারি শুরু করেছিল; তা রোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোনো পদক্ষেপের কার্যকারিতা পরিলক্ষিত নয়। ধারাবাহিক এ সংঘাতে নিরীহ মানুষের প্রাণহানির সঠিক পরিসংখ্যান বের করা অত্যন্ত দুরূহ। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এ সমস্যার একমাত্র ন্যায়সঙ্গত সমাধান হলেও ইসরায়েলের স্বার্থরক্ষায় বা পক্ষপাততুষ্ট আচরণের কারণে কিংবা নতুন নতুন সংকটে এ বিষয়ে তথাকথিত উন্নত-ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের নানা রকম উদ্যোগ-প্রতিশ্রুতি বারবার ব্যর্থই হয়েছে। জাতিসংঘ বা মুসলিম বিশ্বের ২২ সদস্যের আরব লিগও কোনো অর্থবহ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ২৫ বছর ধরেই শান্তি আলোচনা চলছে ধীরে ধীরে। স্বাধীনতার প্রশ্নে পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক দেশ ফিলিস্তিনের পক্ষে থাকলেও কথিত পরাশক্তি হিসেবে খ্যাত কতিপয় রাষ্ট্রের সরাসরি সমর্থন ইসরায়েলকে আরও বেশিমাত্রায় বেপরোয়া করেছে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

ফিলিস্তিনে ইসরায়েল যে গণহত্যা চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে প্রভাবশালী দেশ একেবারেই মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। এ বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরালো সমর্থন অতিশয় দৃশ্যমান। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও নিন্দা-প্রতিবাদ জ্ঞাপন সক্রিয় রয়েছে। সব অশুভ শক্তির পদলেহনে ব্যতিব্যস্ত দেশিবিদেশি মানবতাবিরোধী সরকার ও দলের অচিরেই পতনের প্রতীক্ষায় বিশ্বমানবতা তাকিয়ে আছে। অশুভ আগ্রাসন থেকে মানবমুক্তির বিরুদ্ধে সব নৃশংস কর্মযজ্ঞ অচিরেই স্তব্ধ হোক। আমাদের মহান স্বাধীনতার বিজয় মাস-খ্রিস্টীয় বড়দিন উদ্‌যাপনান্তে ও ইংরেজি নববর্ষ ২০২৫ অবগাহনে সাধারণ ফিলিস্তিনিসহ বিশ্বের সব নির্যাতিত মানুষের সার্বিক মুক্তি কামনা করি। মানুষ যেন মানুষের শত্রু হয়ে না থাকে। মানুষ দাঁড়াক মানুষের পাশে। একদল উন্মত্ত মানুষের আস্ফালনে বিশ্বজুড়ে শান্তিপ্রিয় মানুষ বিপন্ন বোধ করতেই থাকবে তা সভ্যতা-মানবতার জন্য কলঙ্ক ছাড়া কিছু নয়। জাগরণ ঘটুক উদার নৈতিকতাবাদীদের। জয় হোক মানবতার। জয় হোক সভ্যতার।

  • শিক্ষাবিদ, সমাজ ও অপরাধ বিজ্ঞানী
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা