× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মূল্যস্ফীতি

মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঠেকানো জরুরি

নীলাঞ্জন কুমার সাহা

প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:২৩ এএম

নীলাঞ্জন কুমার সাহা

নীলাঞ্জন কুমার সাহা

দেশে পটপরিবর্তনের ফলে ক্রমেই রাজনীতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। অন্যদিকে কয়েক বছর ধরে দেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা আর্থিক খাতে এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির ফলে চলমান মূল্যস্ফীতি। আর্থিক খাতে অনিয়মের ফলে ঋণ খেলাপ, ঋণ অবলোপন এবং তারল্য সংকটের ফলে গ্রাহকের আমানত সুরক্ষিত থাকছে না। এর ফলে অনেকেই ব্যাংকে আমানত রাখার বিষয়ে আর আগ্রহী থাকতে পারছেন না। মূল্যস্ফীতির বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে তো বটেই সমাজে ভীষণ উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। পটপরিবর্তন হোক কিংবা জনরায়ে নির্বাচিত সরকারÑ বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের প্রথম কাজ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। কারণ এ সমস্যা প্রাত্যহিক নাগরিক জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এমন সমস্যা উত্তরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সময় নেওয়া যাবে না। বরং দ্রুততম সময়ে বাজার ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাতে অনিয়ম দূর করতে হবে। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি বশে আনতে না পারলে সমাজের সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা থাকেÑ ঊর্ধ্বগামী মূল্যস্ফীতি রাজনৈতিক ডিনামাইটে রূপ নিতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর রিগ্রেসিভ ট্যাক্সের মতো।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ জায়েদি সাত্তার মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সমস্যার প্রকৃতি ও উৎস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া। প্রায় উপেক্ষিত এমন একটা দিক হচ্ছে মূল্যস্ফীতির ওপর বিনিময় হারের সঞ্চারণ বা ‘পাস-থ্রু প্রভাব’, এটা কমাতে মানসম্মত অস্ত্র (এবং লক্ষ্যমাত্রা যুদ্ধপূর্ববর্তী ৫.৫ থেকে ৬ শতাংশ) পৌঁছার সময়সীমা ইত্যাদি। আইএমএফ এক অসুখকর অনুভবের দিকে ঠেলে দেয়, যখন প্রতিষ্ঠানটি মনে করে যে ‘অপ্রত্যাশিত সহায়ক অভিঘাত’ না পেলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কয়েক মাস থেকে দুই বছরও লেগে যেতে পারে। দেশের অর্থনীতি সচল করতে হলে আমাদের মূল্যস্ফীতির জন্য প্রভাবকগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। প্রথমেই আমাদের শুল্ককাঠামো যৌক্তিক করতে হবে। এমনটা শুধু সমকক্ষদের সঙ্গে সমতুল্য করার জন্য নয়। রপ্তানি আরও প্রতিযোগিতামূলক এবং সংরক্ষণে রপ্তানিবৈরিতা পরিহার করার ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল আমাদের রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে এ শুল্ককাঠামো। 

শুল্কের হার কমানো বা যৌক্তিক করার ক্ষেত্রে একগুঁয়ে প্রতিরোধের পেছনে কারণ রাজস্ব হারানো।

মূলত দুটি ভূরাজনৈতিক সংকট বা যুদ্ধ সারা বিশ্বের অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিপর্যস্ত হয় সাপ্লাই চেইন। ফলে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বিশেষ করে খাদ্য, জ্বালানি এবং সারের দাম অনেক বেড়ে যায়। সে দামও চলতি বছরের শেষে কমতে শুরু করেছে বলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সমীক্ষাগুলো বলেই যাচ্ছে। এমনকি মার্কিন ডলারের সুদহারও খানিকটা কমতে শুরু করছে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে অবমূল্যায়িত হচ্ছে পেশাদারি। এমনকি ব্যবসার ক্ষেত্রেও নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই অনেকের। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কিছুটা হ্রাস পেলেও এ দুই উৎসর দ্বিতীয় পর্বের প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। দেশের মূল্যস্ফীতি প্রধানত ব্যয় বৃদ্ধিতাড়িত। বিপর্যস্ত সাপ্লাই চেইন এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন একটা সরবরাহ ধাক্কা নিয়ে আসে, যা মূল্যস্ফীতি উস্কে দেয় এবং গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো অর্থ সম্প্রসারণ দ্বারা পুষ্ট হয়। অবশ্য দ্বিতীয়টি প্রচলিত পদ্ধতি বা সুপারিশ, যা আর্থিক সংকোচন এবং সুদের হার বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক ওল্টাতে সক্ষম হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে একটা নিরপেক্ষ রাজস্ব নীতি প্রত্যাশিত, যা রাজস্ব ঘাটতি মানিটাইজেশন সীমিত রাখবে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সনাতন সংকোচন নীতি হয়তো চাহিদা সংকোচনে ভূমিকা রাখবে, কিন্তু আমদানির মূল্যবৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়নসঞ্জাত সরবরাহ অভিঘাত মোকাবিলায় উপযুক্ত নয়। 

বস্তুত আমাদের দেশে ব্যাংক কর্তৃক আরোপিত প্রকট আমদানি সংকোচনের ফলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে (স্বল্পতার সুযোগে) এবং এভাবেই সময়ের বিবর্তনে কস্ট-পুশ ইনফ্লেশনে অতিরিক্ত একটা উপাদান হিসেবে যোগ হয়। মূল্যস্ফীতির একটা বিশেষ চালকের দিকে বিশেষ গুরুত্বসহকারে মনোযোগ দেওয়া জরুরি এবং সেটা হলো বিনিময় হারে ব্যাপক অবমূল্যায়ন। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার গাড়িটি উল্টে বা উপুড় করে দিয়েছে এমন ঘটনা কারও স্মৃতিতে জাগে বলে তো মনে হয় না। বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিনিময় হার কীভাবে মূল্যস্ফীতি সঞ্চারিত করে এ ধারণা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের মাথায় রাখতে হবে এবং তা ভালোভাবে বুঝতেও হবে। এমন পাস-থ্রুর মাত্রা এবং পর্যাবৃত্ত, মূলত নির্ভর করে অর্থনৈতিক পরিবেশের ওপর; যেমন ক. বিনিময় হারের কতটুকু নমনীয়; খ. আমদানি-ভেদন (ইমপোর্ট পেনেট্রেসন) এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে আমদানির অংশ; গ. অভ্যন্তরীণ বাজার প্রতিযোগী, না একচেটিয়া কাঠামো; ঘ. বিদ্যমান বাণিজ্য অবমুক্তি এবং বাজারে সরকারি হস্তক্ষেপ।

নিকট অতীতে দেখা গেছে, সঞ্চারণ বা পাস-থ্রু ছিল প্রায় সমকালীন এবং তাত্পর্যপূর্ণ। মুদ্রার বিপুল অবমূল্যায়নের কারণে মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফন মূল্যস্ফীতি ধরে রাখে, যেহেতু একে মোকাবিলা করার জন্য সমকালীন ক্ষতিপূরণমূলক বিপরীত পদক্ষেপ দৃশ্যমান ছিল না, এমনকি আলোচনায়ও স্থান পায়নি। প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হতে পারে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি কতটুকু সঞ্চারণের কারণে? আইএমএফের এক হিসাব বলছে, বাংলাদেশে যদি মূল্যস্ফীতির হার ১০ শতাংশ হয়, তাহলে সরাসরি কিংবা ঘুরিয়ে ৫ শতাংশ বা অর্ধেক আসে মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে। যদি তা-ই হয়, তাহলে আইএমএফসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান উঁচু শুল্ক (মোট কর আদায়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) নিয়ে নীরব কেন? স্বাভাবিকভাবেই টাকার অবমূল্যায়ন অর্থশাস্ত্রে পরিচিত ধারণা। রপ্তানি বৃদ্ধি ও আমদানি হ্রাসের লক্ষ্যে একটি দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করা হয়। যেমন ১ ডলার = ৯০ টাকা থেকে ১২০ টাকা নির্ধারিত হলে এ বিনিময় হার রপ্তানি উৎসাহিত এবং আমদানি নিরুৎসাহ করে থাকে। বিষয়টি তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিকভাবেও প্রমাণিত। বিদেশি ক্রেতা ১ ডলার দিয়ে আগে ৯০ টাকার স্থলে এখন ১২০ টাকার পণ্য বা সেবা পাবেন। ফলে রপ্তানি পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়ে। কিন্তু অন্যদিকে আমদানিকারককে আমদানির নিমিত্ত প্রতি ডলারের জন্য আগের ৯০ টাকার স্থলে ১২০ টাকা দিতে হবে। অবশ্য মুদ্রার অবমূল্যায়ন রপ্তানি বৃদ্ধি ও আমদানি হ্রাসে কতটুকু সার্থকতা লাভ করবে তা নির্ভর করবে আমদানি ও রপ্তানির চাহিদা ও জোগানজনিত প্রভাবের ওপর। অর্থশাস্ত্র মতে, আমদানি ও রপ্তানির চাহিদার প্রভাব-গ্রাহকতা যদি একের বেশি হয় তবে মুদ্রার অবমূল্যায়নের প্রতিক্রিয়া হবে পজিটিভ। অতিসাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের মুদ্রা টাকার অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। আগের চেয়ে বেশি টাকায় ডলার কিনতে হবে। সুতরাং উল্লিখিত সূত্রমতে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধি ও আমদানি হ্রাস পাওয়ার কথা। 

অনেকদিন আগে থেকেই মুদ্রার অবমূল্যায়ন নিয়ে কথা হচ্ছিল। ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক সরকার কৃত্রিমভাবে এক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে এবং এর ফলে একটা সময় পরে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটেছিল, তবে সেটা খুব উল্লেখযোগ্য হারে না এবং হলেও আসলে সঠিক সময়ে সঠিক হার নয়। বিনিময় হারের সুবিধা ছাড়াও রপ্তানিকারক তথা রপ্তানি খাত উৎসাহ দেওয়ার জন্য আরও অনেক পদ্ধতি রয়েছে; যেমন ভর্তুকি, বিশেষ ঋণসুবিধা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ভর্তুকি দেওয়ার ফলে সরকারের রাজস্ব বাজেটে চাপ বৃদ্ধি পায় এবং এ ধরনের প্রোগ্রাম বেশি দিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, মুদ্রা অবমূল্যায়ন কতটুকু লাভজনক হবে তা নির্ভর করবে আমদানি ও রপ্তানি চাহিদার সামগ্রিক প্রভাব-গ্রাহকতার ওপর। তবে লক্ষ রাখতে হবে, অবমূল্যায়ন হলেও প্রকৃত অবমূল্যায়ন কত হলো। মজুরি বৃদ্ধি পেলেই যেমন সুখ বৃদ্ধি পায় না, যদি সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতিও বৃদ্ধি পায়, ঠিক তেমন অবমূল্যায়নের হার আর মুদ্রাস্ফীতির হারের মধ্যে সুসম্পর্ক বিদ্যমান। তা ছাড়া কোনো দেশের মুদ্রা অবমূল্যায়নের সঙ্গে সঙ্গে যদি তার প্রতিপক্ষ দেশেও অবমূল্যায়ন হয়, তবে ফল আশানুরূপ না-ও হতে পারে। আবার যদি ১০ শতাংশ হারে অবমূল্যায়নের পাশাপাশি ১০ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক কমে যায় এবং ১০ শতাংশ হারে রপ্তানি ভর্তুকি কমে যায় তাহলে ফল হবে শূন্য। 

সাধারণত ক্ষণস্থায়ী এবং খুব কম মাত্রার অবমূল্যায়ন যথাযথ ফল দেয় না বলেই অনেকের বিশ্বাস। সুতরাং আশানুরূপ ফল লাভ করতে হলে বড় ধরনের অবমূল্যায়নই কার্যকর। আবার যদি গুজব রটে যে আবার অবমূল্যায়ন হতে পারে শিগগিরই, তবে অবমূল্যায়নের ফলে বাইর থেকে অর্থ জোগান বাড়তে পারে। তা না হলে দেশের ভেতর থেকে বিদেশে অর্থ পাচার হতে পারে। সবশেষে মুদ্রার অবমূল্যায়নের ফলে মুদ্রাস্ফীতি ঘটতে পারে, তবে তার মাত্রা নির্ভর করবে মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির ওপর।

  • অধ্যাপক, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা