× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শুভ বড়দিন

যীশুর জন্মের তাৎপর্য

রেভারেন্ড জেমস রানা বিশ্বাস

প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:১৯ এএম

যীশুর জন্মের তাৎপর্য

আকাডেমি বিদ্যার্থী বাংলা অভিধানে, যিশুখ্রিস্টের জন্মোৎসব খ্রিস্টমাস উৎসবটিকে বংলায় ‘বড়দিন’ আখ্যা দেওয়ার কারণটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘২৩ ডিসেম্বর থেকে দিন ক্রমশ বড় হতে আরম্ভ করে।’ 

খ্রিস্টীয় বিশ্বাস অনুসারে বড়দিন হলো যিশুখ্রিস্টের জন্মোৎসব। বাইবেলের পুরাতন নিয়মে সেই বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। ‘অতএব প্রভু নিজে তোমাদেরকে একটি চিহ্ন দেবেন; দেখ, একজন কুমারী কন্যা গর্ভবতী হয়ে পুত্র প্রসব করবে ও তাঁর নাম ইম্মানুয়েল [আমাদের সঙ্গে ঈশ্বর] রাখবে’ (যিশাইয় ৭:১৪)। এবং যিশাইয় ৯:৬ পদে বলা হয়েছেÑ ‘কারণ একটি বালক আমাদের জন্য জন্মেছেন, একটি পুত্র আমাদেরকে দেওয়া হয়েছে; আর তারই কাঁধের ওপরে কর্তৃত্বভার থাকবে এবং তার নাম হবে ‘আশ্চর্য মন্ত্রী, বিক্রমশালী ঈশ্বর, সনাতন পিতা, শান্তির রাজা’।’

যিশুখ্রিস্টের জন্ম কাহিনী বড়দিন উৎসবের মূলভিত্তি। যিশুখ্রিস্টের জন্মের পর তাকে একটি যাবপাত্রে রাখা হয়েছিল। লুক ২:৭ আয়াতে বলা হয়েছে- ‘আর তিনি তার প্রথমজাত পুত্র প্রসব করলেন; এবং তাকে কাপড়ে জড়িয়ে যাবপাত্রে রাখলেন, কারণ পান্থশালায় তাদের জন্য কোনো স্থান ছিল না।’ প্রচলিত ধারণা অনুসারে, এটি বেথলেহেমের চার্চ অব দ্য নেটিভিটির অভ্যন্তরে। 

খ্রিস্টিয়ানরা নানাভাবে বড়দিন উৎসব পালন করে। বড়দিন উৎসব পর্বের অন্যতম অঙ্গ গৃহসজ্জা, ক্যারল, উপহার আদান-প্রদান ও মণ্ডলীতে উপাসনা ও প্রার্থনায় যোগ দেওয়া। বড়দিন উপলক্ষে বিশেষ ধরনের সাজসজ্জার ইতিহাসাট অতি প্রাচীন। প্রাক খ্রিস্টীয় যুগে, রোমান সাম্রাজ্যের অধিবাসী শীতকালে হরিৎ বৃক্ষের শাখাপ্রশাখা বাড়ির ভিতরে এনে সাজাত। খ্রিস্টিয়ান এই জাতীয় প্রথাগুলোকে তাদের সৃজ্যমান রীতিনীতির মধ্যে স্থান দেয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর লন্ডনের একটি লিখিত বর্ণনা থেকে জানা যায়, এই সময়কার প্রথা অনুসারে খ্রিস্টমাস উপলক্ষে প্রতিটি বাড়ি ও সকল গ্রামীণ মণ্ডলী ‘হোম, আইভি ও বে এবং বছরের সেই মৌসুমের যা কিছু সবুজ, তাই দিয়েই সুসজ্জিত করে তোলা হতো। প্রচলিত খ্রিস্টীয় বিশ্বাস অনুসারে, হৃদয়াকার আইভি লতার পাতা মর্ত্যে যিশুখ্রিস্টের আগমনের প্রতীক; হলি প্যাগান (নন-খ্রিস্টিয়ান, পৌত্তলিক) ও ডাইনিদের হাত থেকে রক্ষা করে; এর কাঁটার ক্রুশবিদ্ধকরণের সময় পরিহিত যিশুখ্রিস্টের কণ্টকমুকুট এবং লাল বেড়িগুলো ক্রুশে যিশুখ্রিস্টের রক্তপাতের প্রতীক। 

খ্রিস্টমাস বৃক্ষ ও চিরহরিৎ শাখাপ্রশাখার ব্যবহার দক্ষিণ অয়নান্তককে ঘিরে প্যাগান প্রথা ও অনুষ্ঠানগুলোর খ্রিস্টীয়করণের ফলশ্রুতি; এক ধরনের প্যাগান বৃক্ষপূজা অনুষ্ঠান থেকে এই প্রথাটি গৃহীত হয়েছেল। ইংরেজি ভাষায় ক্রিসমাস ট্রি শব্দটির প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে, শব্দটি গৃহীত হয়েছিল জার্মান ভাষা থেকে। মনে করা হয়, আধুনিক খ্রিস্টমাস বৃক্ষের প্রথাটির সূচনা ঘটেছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর এবং জার্মানিতে। যদিও অনেকের মতে, এই প্রথাটি ষোড়শ শতাব্দীতে মার্টিন লুথার চালু করেছিলেন। প্রথমে তৃতীয় জর্জের স্ত্রী রানী শার্লোট এবং পরে রানী ভিক্টরিয়ার রাজত্বকালে আরও সফলভাবে প্রিন্স অ্যালবার্ট জার্মানি থেকে ব্রিটেনে এই প্রথাটির আমদানি করেন। ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ খ্রিস্টমাস বৃক্ষের প্রথাটি সমগ্র ব্রিটেনে যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছিল। ১৮৭০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের জনগণও খ্রিস্টমাস বৃক্ষের প্রথাটি গ্রহণ করে। খ্রিস্টমাস বৃক্ষ আলোকসজ্জা ও গহনা দ্বারা সুসজ্জিত করা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পোইনসেটিয়া নামে একটি দেশজ বৃক্ষ খ্রিস্টমাস প্রথার সঙ্গে যুক্ত হয়। অন্যান্য জনপ্রিয় হলিডে গাছ হলো হলি, মিসলটো, লাল অ্যামারিলিস ও খ্রিস্টমাস ক্যাকটাস। খ্রিস্টমাস বৃক্ষের সঙ্গে মমালা ও চিরসবুজ পত্রসজ্জায় সজ্জিত এইসব গাছ দিয়েও বাড়ির অভ্যন্তর সাজানো হয়ে থাকে। 

বড়দিন উৎসবে আরেকটি অন্যতম আনন্দের বিষয় হলো উপহার আদান-প্রদান। বিশ্বের অনেক দেশেই বড়দিন হলো বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে উপহার আদান-প্রদানের মৌসুম। বড়দিন ও উপহার আদান-প্রদানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একাধিক খ্রিস্টীয় ও পৌরাণিক চরিত্রের উদ্ভবের সঙ্গেও বড়দিন উৎসব অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্তÑ এঁরা হলেন ফাদার খ্রিস্টমাস বা সান্টাক্লজ, পেরে নোয়েল, ওয়েনাকসম্যান; সেন্ট নিকোলাস বা সিন্টারক্লাস; ক্রাইস্টকাইল্ড; ক্রিস ক্রিঙ্গল; জৌলুপুক্কি; বাব্বো নাতালে; সেন্ট বাসিল; এবং ফাদার ফরেস্ট। 

আধুনিককালে এই চরিত্রগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় হলো লাল পোশাক পরিহিত পৌরাণিক উপহার প্রদানকারী সান্টাক্লজ। সান্টাক্লজের উৎস একাধিক। সান্টাক্লজ নামটি ডাচ সিন্টারক্লাস নামের অপভ্রংশ; যার সাধারণ অর্থ সেন্ট নিকোলাস। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর নিকোলাস ছিলেন অধুনা তুরস্কের মিরার বিশপ। অন্যান্য সন্তসুলভ আবদানগুলোর পাশাপাশি শিশুদের পরিচর্যা, দয়া ও উপহার প্রদানের জন্য তিনি খ্যাতনামা ছিলেন। অনেক দেশে তার সম্মানে ৬ ডিসেম্বর উপহার আদান-প্রদানের মাধ্যমে উৎসব পালিত হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, বিশপের পোশাক পরিহিত নিকোলাস তার সহকারীদের সহায়তায় বিগত এক বছরে শিশুদের আচরণের খোঁজখবর নিতেন; তারপর স্থির করতেন সেই শিশু উপহার পাওয়ার যোগ্য কি না। 

আমরা যিশুখ্রিস্টের জন্মের তাৎপর্যের বিষয়টি যেন ভুলে না যাই। ঈশ্বর আমাদের তার সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস, তার একমাত্র পুত্র যিশুখ্রিস্টকে আমাদের জন্য উপহার হিসেবে দিয়েছেন। তিনি আমাদের সকলের জন্য ক্রুশে রক্ত দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন এবং তৃতীয় দিনে আবার পুনরুত্থিত হয়েছেন। তিনি আমাদের জন্য পরিত্রাণের ব্যবস্থা করেছেন। ‘শাস্ত্র অনুসারে যিশুখ্রিস্ট আমাদের পাপের জন্য প্রাণ দিলেন ও তাকে কবরস্থ করা হলো, আর শাস্ত্রানুসারে তিনি তৃতীয় দিনে উত্থাপিত হয়েছেন’ (১ করি ১৫:৩-৪)। এবারের বড়দিনে আপনি ঈশ্বরকে দেওয়ার জন্য কি প্রস্তুত করেছেন? আপনি সুন্দর খ্রিস্টমাস ট্রি দিয়ে এবং আলোকসজ্জা করে ঘর সাজিয়েছেন? অনেক অর্থ তার জন্য ব্যয় করবেন, কয়েকশ ডলার উৎসর্গ করবেন? কিন্তু এটি শুধুমাত্র বাণিজ্যিক লেনদেনে সক্রিয় হতে পারে। আপনি অনেককে দাওয়াত দিয়ে বিরাট ভোজের আয়োজন করেছেন? অনেককে সুন্দর সুন্দর উপহার দিবেন? সবই ভালো পরিকল্পনা- সবকিছুই ভালো, কিন্তু যথেষ্ট নয়।

একটি ভালো প্রার্থনা তাকে উপহার দিবেন? একটি ভালো গান তার জন্য উপহার হিসেবে দিবেন? একটি ভালো প্রচার প্রস্তুত করেছেন? কিন্তু এটিও যথেষ্ট নয়। মনে রাখুন, ঈশ্বর তার সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও মূল্যবান উপহার আমাদেরকে দিয়েছেন খ্রিস্টমাসের রাতে। খ্রিস্টমাসের সময়, ঈশ্বরের কাছে আপনার যোগ্য উপহার, যা তিনি আপনার কাছে আশা করেন সেটি হলো আপনার হৃদয়, আপনার উৎসর্গকৃত জীবন, ঈশ্বরের প্রতি আপনার প্রেম এবং ঈশ্বরের জন্য আপনার ভবিষ্যৎ জীবন। ‘অতএব হে ভাইয়েরা, ঈশ্বরের নানা করুণার অনুরোধে আমি তোমাদেরকে বিনীত করছি, তোমরা নিজ নিজ দেহকে জীবিত, পবিত্র ও ঈশ্বরের প্রীতিজনক বলী হিসেবে উৎসর্গ কর, এ-ই তোমাদের চিত্তসংগত আরাধনা। আর এই যুগের অনুরূপ হয়ো না, কিন্তু মনের নতুনীকরণ দ্বারা সম্পূর্ণ রূপান্তরিত হয়ে উঠো, যেন তোমরা পরীক্ষা করে জানতে পার ঈশ্বরের ইচ্ছা কী। ঈশ্বরের ইচ্ছা যা উত্তম, গ্রহণযোগ্য ও সিদ্ধ।’ রোমীয় ১২:১-২ পদ।

আপনার জন্য ঈশ্বরের একটি বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে, আপনি তার পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছেন। হতে পারে আপনি এটি দিতে অস্বীকার করতে পারেন কিন্তু এটি মহা মূল্যবান এবং ব্যায়বহুল ঈশ্বরের কাছে। পবিত্র বাইবেলে বলা হয়েছেÑ ‘প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ অন্তরে যেমন সংকল্প করেছে সেই অনুসারে দান করুক, মনোদুঃখপূর্বক কিংবা আবশ্যক বলে না দিক; কেননা ঈশ্বর হৃষ্টচিত্ত দাতাকে ভালোবাসেন।’( ২ করি ৯:৭)। 

সুতরাং আজকে আপনি আপনার অন্তর খুলে দিন, আপনি আজকে উন্মুক্ত এবং আপনি আজকে তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারেন। আপনার সমস্ত জীবনকে তাকে দিতে পারেন। মনে রাখবেন, আপনার জীবন ঈশ্বরের কাছে মহামূল্যবান এবং আপনার এই জীবনকে রক্ষার জন্য ঈশ্বর তার একমাত্র পুত্রকে পাঠিয়েছেন, যিনি সর্বজনীন ও সবার জন্য। ‘কারণ ঈশ্বর জগৎকে এমন প্রেম করলেন যে, তার এক জাত পুত্রকে দান করলেন, যেন যে কেউ তাতে বিশ্বাস করে সে বিনষ্ট না হয়, কিন্তু অনন্ত জীবন পায়।” যোহন ৩:১৬।

  • খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ববিদ, পুরোহিত ও মানবাধিকার কর্মী
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা