× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

রাজনীতি কেন অনিষ্টের আঁতুরঘর হবে

ড. মো. শামসুল আলম

প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৩৮ এএম

ড. মো. শামসুল আলম

ড. মো. শামসুল আলম

পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে রাজনীতিকরা দায়িত্ব নেবেন এমন প্রত্যাশা সচেতন মহলে থাকলেও সঙ্গত কারণেই জাতীয় নির্বাচন বিলম্বে হবে বলেই মনে হয়। রাজনীতি যেন এখনও ব্যবসা শব্দের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সবখানেই স্বার্থান্বেষী প্রচেষ্টা মাত্রাতিরিক্ত আকার ধারণ করেছে। শীতের কুয়াশার মতোই রাজনীতি ব্যবসা শব্দটি প্রচলিত এবং এর স্পষ্ট উত্তর রাজনীতিকরাই দিতে পারবেন। কারণ তারাই এ ধারণার প্রবর্তক। কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে এমন ধারণা সংযুক্ত করা মানে এ দেশের রাজনীতি পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এ দিগ্‌ভ্রান্ত-লক্ষ্যভ্রষ্ট রাজনীতি দেশের মুক্তিকামী শান্তিপ্রিয় মানুষের ভালোর জন্য কিছু করবে এমন প্রত্যাশা করাও ভুল। বরং অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রাজনীতি এ দেশের অনেক অনিষ্টের আঁতুড়ঘর। ফলে রাজনীতি সুষ্ঠু ধারায় নিয়ে আসা এ দেশের সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ। একবার যখন কোনো ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যায় বিশেষত রাষ্ট্রকাঠামোয় ঘুণ ধরে তখন আবার পুরোনো অবস্থায় ফেরা কঠিন হয়ে যায়। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের মাথায় শুধু  নির্বাচনই ঘুরপাক খাচ্ছে। তাদের নিজ দলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কিংবা জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না। এজন্যই সংবাদমাধ্যমে প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নামে বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ আসছে। সাধারণ মানুষের মনেও বিষয়টি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করছে। তারা ভাবছে, নির্বাচনের আগেই যদি এমন অবস্থা হয় তাহলে পরে কী হবে। ফলে রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে। এই বার্তা রাজনীতি দেশের জন্য বিপদ। এমনটি হওয়ার কথা নয়। রাজনৈতিক দলের কাছে মাঠপর্যায়ে তাদের তাত্ত্বিক রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। যদি তা না করতে পারে তাহলে দেশের রাজনীতির ঘুণ সরানো যাবে না। এক্ষেত্রেও জরুরি সংস্কার।

রাজনীতি একটি ভালো শব্দ হলেও আমরা এ ধারণা পচিয়ে ফেলেছি। রাজনীতির বিষবাষ্প আমাদের সামাজিক শিক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, অফিস-আদালত-প্রশাসন, নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ, অর্থব্যবস্থা ক্রমেই ধ্বংস করে ফেলছে। এটা দলীয় তর্কের ঊর্ধ্বে। এ ব্যবস্থা আগে মেরামত করা জরুরি। অনেকেই বিষয়টি কখনওসখনও বুঝেও না বোঝার ভান করেন। এখানেই যত বিপত্তি। আসলে কথাটা ‘ব্যবসায়িক রাজনীতি’ নাকি ‘রাজনীতির ব্যবসা’ তা স্পষ্ট নয়। দেশে এ শব্দটিই কেন জানি গোলমেলে হয়ে গেছে। এসব ধারণার বাস্তব প্রয়োগ দেশে পুরোপুরি হচ্ছে বলেই উদ্বেগ বাড়ছে। রাজনীতি এখন ব্যবসার টাকার কাছে নতজানু হয়ে গেছে। রাজনীতি টাকা কামানোর হাতিয়ার, আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানোর রক্ষাকবচ। অনেক ব্যবসায়ী অবৈধ পথে ব্যবসা করছেন, আবার রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করছেন। রাজনৈতিক তরিকা মোতাবেক কাজ করছেন। এমন ব্যবস্থা এখনও দলগুলো অনুসরণ করে চলেছে। রাজনীতির সঙ্গে আদৌ পরিচয়ই ছিল না এখন এমন কেউ কেউ সরাসরি রাজনীতিও করছেন। ব্যবসায়ীরা রাজনীতি করতে পারবেন না, এমন কোনো কথা নেই। সমস্যা হলো, অনেক ব্যবসায়ীই ব্যবসায় রাজনৈতিক পুঁজি খাটাচ্ছেন। অতি অল্প সময়ে অঢেল টাকার মালিক হচ্ছেন। রাজনৈতিক দাপট দেখিয়ে যা খুশি তা-ই করছেন। দেশের আর্থিক সুবিধা ধ্বংস করছেন এবং এজন্য তার বিচার-আচারও সহসা হয় না। বিচারের আওতায় আনা হলেও বিষয়টি বিচারের দীর্ঘসূত্রতার ফাঁদে ফেলে কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন।

দেশব্যাপী অধিকাংশ পণ্যের ভেজালের মহোৎসব চলছে। ব্যবসার মাঠে নীতি-নৈতিকতার বড্ড খরা চলছে। ব্যবসায়ীদের অনেকেরই মূল্যবোধ কিংবা নৈতিকতা এ খরায় ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। পটপরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকে বইপত্রে পড়ে আসছি, রাজনীতি মানে জনসেবা, সমাজসেবা, দেশসেবা, নিজের স্বার্থ মানুষের জন্য ত্যাগ করা এমন অনেক কিছু তাদের জানা। রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রেও হয়তো তা-ই লেখা আছে। এখন শিক্ষার্থীদের অনেকেই খোলামেলা কথা বলে। অথচ রাজনীতির বাস্তবতা ভিন্নরূপ। রাজনীতি করতে হলে মিথ্যা বলা ও টাকা ছাড়া নাকি এক পা-ও এগোনো যাচ্ছে না। পদ পেতে গেলেও টাকা, নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইলেও টাকা, নির্বাচন করতেও টাকা। বর্তমানে রাজনীতিই একটা টাকার খেলা। অঢেল টাকা কামানোর জন্য রাজনীতি কিংবা রাজনীতির জন্য টাকাÑ দুটি কথাই এ দেশে সমভাবে খাটে। টিআইবি কয়েক বছর আগে গবেষণায় উঠে এসেছে এমপিদের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির তথ্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বইতে রাজনৈতিক দলের যে কার‌্যাবলি রয়েছে, সেগুলো কি ভুলে যাব?

বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদ, সাম্যবাদ, লেনিনবাদ, মাওবাদ ইত্যাদির ঢেউ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে। এসব কিছুর জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে দেশের মুক্তবাজার অর্থনীতি ও ‘জনকল্যাণবাদ’। এ দেশও মনে হয় অনেক ‘বাদ’ বাদ দিয়ে ফেলেছে। আমাদের দেশেও রাজনৈতিক দলের আদর্শের কথা দলীয় গঠনতন্ত্রে থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ নেই বললেই চলে। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ওগুলো নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি না করতে পরামর্শ দিই। বলি ভিন্ন কথা। কোনো রাজনৈতিক দল বা কোনো দলীয় জোট নির্বাচনের আগে ক্ষমতায় গেলে তারা দেশের উন্নতি ও জনকল্যাণের জন্য কী কী ব্যবস্থা নেবে, কীভাবে নেবে সবটুকুই দেশের নাগরিকদের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিখিত ও দফা আকারে জানাতে হবে। ভোটাররা সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখবেন। ভোটার তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন, কর্মসূচি ও কর্মপদ্ধতি দেখে, সম্পদ লুটতরাজ করা লোকের কর্মসম্পৃক্ততা দেখে। রাজনীতিতে কি বর্তমান ধারাই থাকবে, নাকি নতুন কোনো ধারার প্রবর্তন করা হবে? জানা দরকার, ভোটব্যবস্থায় নিজের ভোট নিজে দেওয়ার সুব্যবস্থা থাকবে, না থাকবে না? অতীতের প্রেক্ষাপটে এখন আমাদের অনেক কিছুই স্পষ্ট জানা দরকার। আমাদের যেহেতু কোনো ফোরাম নেই, পত্রিকার মাধ্যমেই আমরা প্রয়োজনীয় কিছু কথা জিজ্ঞেস করতে পারি। দেশের মানুষ নির্বাচনের পরও কাজের সঙ্গে কথা মিলিয়ে দেখে পরবর্তী দিনের সিদ্ধান্ত নেবে।

সে ক্ষেত্রে বিএনপির প্রকাশিত ৩১ দফার পরিবর্তে তাদের আরও বিস্তারিত কথা বলতে হবে। অনেক বিষয় আছে, যা না বলা রয়ে গেছে। দেশের সামাজিক শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে, ব্যবসায়িক রাজনীতির অস্তিত্ব থাকবে, নাকি ঢেলে সাজাতে হবে; রাজনীতিকরা আধুনিক ব্যবসাবাণিজ্য চালিয়ে যাবেন, নাকি দেশসেবা-সমাজসেবার পুরোনো মডেল ও নীতি আঁকড়ে ধরে সামনে এগোবেনÑ সব কথা খোলামেলা জানাতে হবে। এ দেশের নিকষকালো রাজনীতি কীভাবে খোলনলচে বদল করে ভালো করা হবে সে কথাও লিখতে হবে। ফারসি ভাষার নামকরা এক কবির সারকথাটা এ রকম : বিড়ালের যদি পাখা গজাতে দেওয়া হতো, তাহলে ঘরের চালে বসবাসকারী শান্তিকামী চড়ুই পাখিগুলোর জীবনসংহার হয়ে যেত। এ দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণের স্বার্থে বিড়ালের পাখা গজাতে দিতে আমরা রাজি নই। এ দেশের প্রতিটি সচেতন মানুষের এ বোধোদয় যত তাড়াতাড়ি হয়, ততই সবার জন্য মঙ্গল। সব রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকদের কাছে আমাদের অনুরোধ, তারা যেন কোনোভাবেই বিড়ালের পাখা গজাতে না দেন। বিদ্যমান বাস্তবতায় প্রশ্ন হচ্ছেÑ আমরা কি অতীত নিয়েই থাকব? নাকি আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এবং ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠা কয়েক প্রজন্মের কথা ভাবব? যেকোনো জাতি তার ভবিষ্যতের সঙ্গে আপস করে না।

একমাত্র আমরাই ভবিষ্যৎ ভাবার বদলে অতীত নিয়ে মেতে থাকি। দেশের দিকে তাকালে প্রবাসী বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের মনে যে বেদনা জাগে, তা-ও অকপটে বলা যায় না। বন্ধুরাও মনে করে, বিদেশে আরামে বসবাস করা মানুষের এসব বলার অধিকার নেই। আসলে কি তাই? যারা দেশের রেমিট্যান্সে অবদান রেখে দেশের অর্থনীতি বেগবান করেন, তাদের বলার অধিকার থাকবে না? সমাজ নির্মাণে রাজনীতি কথাটা উঠছে এ কারণে যে, এখন দেশে আসলে কোনো রাজনীতি নেই। শুধু বাংলাদেশে না, পৃথিবীর কোনো দেশেই আগের মতো রাজনীতি নেই। না থাকার বাহ্যিক কারণ ‘প্রযুক্তি’। ডিজিটাল মিডিয়া, বিশেষত হাতে হাতে মোবাইল ফোন আসার পর তরুণ সমাজ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এটা দুনিয়াময় সত্য। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করে লাভ হবে না। যেসব দেশ বা সমাজে গণতন্ত্র আসন পেতেছে, সেখানে নির্বাচনে নিশ্চিন্তে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা যায়। তাদের আর আমাদের বাস্তবতা এক নয়। আমাদের দেশে গণতন্ত্র এখনও সোনার হরিণ। যারা যখন বিরোধী দলে থাকে, তারাই গণতন্ত্র চাই বলে সমাজে আওয়াজ তোলে। অথচ দেশ শাসনে থাকার সময় তারা গণতন্ত্রের কথা বেমালুম ভুলে যায়! এমনটি অনেকের মতে নগ্ন স্ববিরোধীতা।

  • অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা