× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সমাজ

সামাজিক সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন সময়ের দাবি

রোকেয়া ইসলাম

প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৩৫ এএম

রোকেয়া ইসলাম

রোকেয়া ইসলাম

শহুরে জীবন যখন উৎপাদনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল, তখন যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে শুরু করল। শহরকেন্দ্রিক শিল্পকাঠামোয় পুরুষ তার কর্মসংস্থান গড়ে তোলে। এই কর্মসংস্থান গড়ার পর একসময় তার নিজের সুবিধার জন্য পরিবার গড়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। নিজের স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে একক পরিবারের সূচনা এভাবেই। এ ধরনের পরিবার ব্যবস্থায় আস্তে আস্তে নারীকেও কর্মক্ষম হয়ে ওঠার তাগিদ দেখা দেয়। শহর কাঠামোতে শিক্ষার প্রচার-প্রসারে নারী পায় পর্যাপ্ত সম্মান। আবার শহুরে ব্যবস্থায় তার নিরাপত্তা ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমের স্বীকৃতি এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হন। এক্ষেত্রে শিশুদের কথা উল্লেখ করা যাচ্ছে না। কারণ শিশুরা উদীয়মান সূর্য। পরিবারে বাবা-মা তো বটেই, অন্যদেরও তাদের প্রতি একধরনের মমত্ববোধ কাজ করে। অপরদিকে অস্তগামী সূর্য প্রবীণদের অনেক পরিবারে বোঝা হিসেবেই দেখা হয়। এমন ভাবনা থেকে বেরোতে না পারা একটি বড় সামাজিক সমস্যা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের সঙ্গে অবহেলামূলক আচরণ করা হয়। আবার পরিবারে আত্মনির্ভরশীল অনেক প্রবীণ থাকেন। তাদের জমানো অর্থ কিংবা জমিজমা অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের অবহেলা থেকে তাদের রক্ষা করে। কিন্তু প্রবীণ হিসেবে তাদের যে সম্মান প্রাপ্য তা নিশ্চিত হয় না। এটি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি বড় চিত্রই বলা যায়। 

যেহেতু পরিবারে পুরুষ প্রবীণদের অনেক ক্ষেত্রেই অভিভাবকের ভূমিকায় দেখা যায়, তাই তাদের বড় সমস্যায় পড়তে দেখা যায় না। প্রবীণ নারীরাই সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। দেশের অধিকাংশ নারী সারা জীবন সংসারে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রম বিলিয়ে দেওয়ায় তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা সেভাবে গড়ে ওঠে না। ফলে বৃদ্ধ বয়সে তার নিজস্ব একটি গণ্ডি বা নিরাপত্তা নিশ্চিতেরও সুযোগ থাকে না। এক্ষেত্রেও তাকে স্বামী কিংবা সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। উদাহরণ হিসেবে যৌথ পরিবারের খণ্ডিত অংশের মাধ্যমেই বাস্তবতা দেখানো যাক। কোনো নারীর দশ সন্তান। নয় মাস তাদের গর্ভধারণ করেন অথচ একসময় দেখা যায় দশ সন্তানের কেউই মায়ের দায়ভার নিতে রাজি হন না। শহুরে জীবনের ব্যয়ভারের চাপে অভিভাবকের এই দায় তারা এড়িয়ে যেতে চায়। তবে মানবিক মূল্যবোধ থাকলে এমনটি হওয়ার ছিল না। এ ধরনের সমস্যায় দেখা যায়, সন্তানেরা ভাগাভাগি করে থাকে। অর্থাৎ মা এবং অনেক ক্ষেত্রে বাবাকেও একেক সন্তানের বাড়িতে নির্দিষ্ট সময় রাখা হয়। ফলে বৃদ্ধ বয়সে নিজ ইচ্ছায় প্রবীণরা থিতু হতে পারেন না। মানুষের জীবনে যে স্থিরতা থাকে তা প্রবীণের জীবন থেকে এভাবেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণের ঠাঁই হয় বৃদ্ধাশ্রমে, যা আরেক যন্ত্রণার অধ্যায়। বাস্তবে প্রবীণরা অতিথির জীবনযাপন করেন। সন্তানদের বাড়িতে তারা যেন অতিথি। তাদের সঙ্গে অতিথির মতোই আনুষ্ঠানিক আচরণ করা হয়। তাদের খাবার-দাবার কিংবা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও যত্ন-আত্নির ক্ষেত্রেও দেখা যায় আনুষ্ঠানিকতাই থাকে। এমন জীবন চরম অসম্মানজনক। এক্ষেত্রে নারীরাই সবচেয়ে বেশি অসম্মানের শিকার হয়। 

নিজের শরীরের পুষ্টি দিয়ে, নয় মাস কষ্ট সহ্য করে, পৃথিবীতে একটি প্রাণের সঞ্চার ঘটান মা। ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন বাবা। অপত্য স্নেহই সন্তানদের বড় করে তোলে। সাংসারিক বোঝা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সন্তানের চাহিদা এবং ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বাবা-মা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজের শখ-আহ্লাদ ও ইচ্ছাপূরণ করতে পারেন না। কিন্তু তারা সন্তানকে তা বুঝতে দিতে নারাজ। এই বাবা-মাই একসময় সন্তানের অবহেলার শিকার হন, যা আমাদের সমাজের মানবিক বোধের অবক্ষয়। নিজ প্রয়োজন ও সুখ বিসর্জন দিয়ে বাবা-মা উভয়ই সন্তানের জন্য সম্পদ গড়েন। তাদের ভবিষ্যতে স্বচ্ছলতার ভিত গড়েন। প্রবীণ বয়সে এই বাবা-মায়ের সম্পদের প্রতি অধিকার থাকলেও সম্পদের প্রয়োগে অধিকার থাকে না। পারিবারিক জটিলতা ও সম্পদের হিসাবের সমীকরণে শুরু হয় একধরনের অশান্তি। এমন সামাজিক অবক্ষয় থেকে কি পরিত্রাণের উপায় আছে? পরিত্রানের পথ খুঁজতে গেলে অবশ্য স্বার্থপর সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ আসে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সঞ্চয়ের সুবিধা রয়েছে। আজকে যারা তরুণ এবং কর্মক্ষম হয়ে উঠবে, তাদের দূরদর্শী হতে হবে। আমাদের দুই ধরনের প্রবাদ রয়েছে। ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই জ্ঞানীর কাজ। আরেকটি প্রবাদÑ বর্তমানকে ফেলে ভবিষ্যৎকে নিয়ে ভাবে বোকারা। দুটোই সত্য। তবে পার্থক্য হলো, প্রথম প্রবাদটি বোঝায় দূরদর্শিতাকে। আর দ্বিতীয়টি বোঝায় বর্তমানে থাকা দায়িত্বপূরণের তাগিদকে। তাই কর্মক্ষম হওয়ার পর দূরদর্শী ভাবনা থেকেই সঞ্চয়ের বিষয়টিকে জোর দিতে হবে। 

আমরা দেখি, অনেক পরিবারে সন্তানেরা বাবার প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থের দিকে তাকিয়ে থাকেন। সন্তানের স্বার্থে বাবা অনেক সময় এ অর্থ তাদের হাতে তুলে দেন। এ অর্থ দেওয়ার পর নিজের সম্বল বলে আর কিছু থাকে না। বৃদ্ধ বয়সে তখন তাদের নিজস্ব চাহিদা থাকলে তা পরনির্ভরশীলতায় চলে যায়। অনেক ক্ষেত্রে তা পূরণ হয় না। এমন অসম্মানজনক জীবন তাদের প্রাপ্য ছিল না। অর্থই জীবনের সব নয়। কিন্তু আমাদের সমাজ বাস্তবতায় অর্থ স্বচ্ছলতার এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তাই জীবনের কর্ম অধ্যায়ে বিভিন্ন সময়ে সঞ্চয়ের কাজটি করতে হবে। এজন্যও অবশ্য কিছুটা ত্যাগ ও হিসাবি জীবনযাপন করতে হবে। কিন্তু তা করতে পারলে একসময় অন্তত অসম্মানের এবং স্থির নয় এমন জীবনযাপন করতে হবে না। দেশে শ্রেণিভিত্তিকভাবে পরিবারের আন্তরিকতা নির্ভর করে। সব সময় বাবা-মা এই আন্তরিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করেন। 

উচ্চবিত্ত পরিবারে দেখা যায়Ñ প্রতিবছর সন্তানদের জন্য কেনাকাটা করা হয়। আবার মধ্যবিত্তদের থাকে ভিন্ন বাস্তবতা। সেই আন্তরিকতা থাকে। কিন্তু আজ যে সন্তান আগামীতে সেও বাবা কিংবা মা হবে। তাদের নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কিছু সঞ্চয় করতে হবে। তারা যেন সন্তানের জন্য বোঝা হয়ে না ওঠেÑ এমন ভাবনা গড়ে তুলতে হবে। সমস্যা হলোÑ আমাদের সমাজে বাবা-মায়েরা সচরাচর সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন। অথচ সন্তানের সংসার হলে তার ওপরও নতুন অনেক দায় আসে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক সমস্যা এবং আবাসন সংকটের বিষয়গুলো ভাবনায় নিলে অনেক সময় বাবা-মাকে সম্পূর্ণ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া সন্তানের পক্ষে সম্ভব হয় না। এই পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থা কিংবা অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার বিষয়টিকে ভাবনায় রাখতে হবে। সঞ্চয়ের মাধ্যমে নিজেদের কিছু প্রাথমিক খরচ করতে পারলে সন্তানের ওপর বাড়তি চাপ কমে। তাই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখা জরুরি। 

সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে। সেখানকার অবস্থার উন্নতিও ঘটেছে। কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে প্রবীণরা থাকতে চান না। তারা অপমান সহ্য করে হলেও সন্তানের সঙ্গে থাকতে চান। এক্ষেত্রে তাদের মনে থাকা মায়া বা মমত্ব প্রভাব রাখে। অন্তত সন্তানের সঙ্গে তো দেখা হবে। পরিবারের অংশ হওয়ার শান্তিটুকু মিলবে। প্রবীণদের সংকটের বিষয়টি শুধু পারিবারিক সমালোচনা করলেই হবে না। আমাদের গোটা সমাজই প্রবীণদের বাঁকা চোখে দেখে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রবীণদের অবহেলা করার প্রবণতাও দেখা যায়। অথচ এই প্রবীণই একসময় সমাজের চোখে সফলতা কিংবা অনুপ্রেরণার প্রতীক ছিলেন। প্রবীণদের সামাজিক মর্যাদা সঙ্গত কারণেই নিশ্চিত করতে হবে। একজন প্রবীণ সমাজের বোঝা নন, অভিজ্ঞতার স্মারক। তার অভিজ্ঞতা সমাজের জন্য হতে পারে হিতকর। আমরা দেখি, প্রবীণরা কেনাকাটা করতে গেলে তাদের অনেকক্ষণ অপেক্ষা করানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণদের যে জরুরিভিত্তিতে কিছু প্রয়োজন হতে পারেÑ এ ভাবনা সমাজের অনেকের মধ্যেই নেই। প্রবীণ যেন সব সময় স্থিতিশীল, তার বাড়তি গতিশীলতার জরুরি নেইÑ এমন ভাবনা সমাজে জিইয়ে থাকলে প্রবীণদের সামাজিক সম্মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রবীণদের সম্মান রক্ষার্থে সামাজিক পর্যায়ে নানা কার্যক্রম নিতে হবে। এ বিষয়ে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। আমাদের সমাজে অনেক নারীর অল্প বয়সে বিয়ে হয় এবং স্বামীর মৃত্যুর পর তাকে দীর্ঘ বৈধব্য পালন করতে হয়। এ ধরনের জীবনের দুর্দশা কথায় প্রকাশ করা কঠিন। নারীদের এই সমস্যার বিষয়ে সরকার ভাতা প্রচলন করলেও তা প্রাত্যহিক জীবনযাপনের জন্য পর্যাপ্ত নয়। ষাট বছর বয়সের ওপরে থাকা সবাই প্রবীণ। প্রবীণদের সামাজিক, পারিবারিক নিরাপত্তা ও উপযুক্ত সম্মান নিশ্চিতকরণে তাই ভাবতে হবে গভীরভাবে।

  • চেয়ারম্যান, প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা