প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষা
মো. অহিদুর রহমান
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৩২ এএম
মানবসৃষ্ট কারণ এবং হাওর, পাহাড়, সমতলে অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে পরিবেশ ও প্রতিবেশ আজ বেশি সংকটাপন্ন। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যসমৃদ্ধ একটি দেশে যুগ যুগ ধরে ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছে পরিবেশ ধ্বংসের কাজে। জলাভূমি দখল, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ, পাহাড়-প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংসের মাধ্যমে আামদের দেশটাকে পৃথিবীর সামনে পরিবেশ-প্রতিবেশ বিপর্যস্ত দেশ হিসেবে উদাহরণ তৈরি করানো হয়েছে। উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে। বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। সবুজ সংহতির মাধ্যমে গড় তুলতে চাই সবুজ পরিবেশ। ময়মনসিংহ গীতিকার চারণভূমি, মহুয়া, মলুয়া, কংকের কাহিনী খ্যাত হাওর, নদী-নালা, খাল-বিল, জলজলাশয়, পাহাড়, বনবাদাড়, নলখাগড়ায় ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যের লীলাভূমি এ অঞ্চল। ভূপ্রকৃতির কোথাও হাওরের সুবিশাল জলাভূমি, কোথাও পাহাড়, কোথাও সমতল কৃষিভূমি। এ জেলার মেঠো পথে ছড়ানো রয়েছে গায়ের কিংবদন্তি শত শত পুকুর, নদী, গাছ ও পাহাড়, নানা প্রজাতির পাখি, মাছ, সাদা মাটির গল্প। এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান; বাঙালি, গারো, হাজং, হদি, বানাই, কোচ, ডালু, আদিবাসীসহ নানা বৈচিত্র্যের মানুষ মিলেমিশে একসঙ্গে বাস করে। প্রকৃতি ধ্বংস করে বাংলাদেশের বৈচিত্র্য রক্ষা ও উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রকৃতি সংরক্ষণে বেশ পিছিয়ে বাংলাদেশ।

এ অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্য জলাশয়মিশ্রিত, জলাভূমির অবগাহন, জলাভূমির জলে পরিশুদ্ধি, জলে চাষাবাদ। জলাভূমি দিয়েছে, নদী দিয়েছে; আমরা নিয়েছি; এভাবে জলাভূমি নিজেকে উজাড় করেছে। আমরা থেমে থাকিনি, আমাদের অভাব পূরণ হয়নি। আামাদের অনেকেরই লোভ-লাভ সীমাহীন। নদীকে নদী হয়ে নদীর কাছে নদীরূপে থাকতে দিইনি। পরিবেশ ভাবনা আমাদের ভাবিত করেনি। আমাদের অপরাধ আছে, আমাদের বোধ নেই। বিবেক আছে, তাড়না নেই। জলাভূমি আমাদের অস্তিত্বের অংশ। মাতৃদুনিয়ার রক্তাক্ত লাশের ওপর দাঁড়িয়ে আজ আমরা নিদারুণভাবে ‘প্রাণবৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়ন’ এবং ‘সবুজ-অর্থনীতি’ সবুজ সংহতি নিয়ে কথা তুলেছি। কিষান-কিষানিরা বলেছিল, বীজ আমাদের সম্পদ, এ বীজ রক্ষা করুন। রাষ্ট্র এ কথা শোনেনি। গ্রামের বীজঘর শূন্য করে বীজসম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির কাছে চলে যায়। গ্রামের হাওরের পাহাড়ের সব পেশার মানুষ হাত জোড় করে বলেছিল, এ মগড়া, সোমেশ্বরী, ধনু, মহাঢেউ, সাইডুলি নদ-নদীগুলো মায়ের মতো। এগুলো বাঁচাতে হবে। কেউ কথা শোনেনি। মধুপুরে প্রাকৃতিক বন কেটে ইউক্যালিপটাস, বোতলব্রাশ, শিশু, অ্যাকাশিয়া, ইপিল ইপিল, বেলজিয়াম আগ্রাসি গাছের বাণিজ্যিক বাগান তৈরি করা হলো। মিঠা পানির মাছের কথা চিন্তা না করে পিরানহা, সাকার, অস্ট্রেলিয়ান মাগুর, গ্রাস কার্পসহ রাক্ষুসি মাছ নিয়ে আসা হলো। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ এমন এক পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বেছে নিয়েছে যা কোনোভাবেই দেশের প্রাণ-প্রকৃতির ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি।
পুরাতন ব্রহ্মপুত্র পললগঠিত সমতলভূমি ও হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের জীবনজীবিকা, সম্পদবিনিময় ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা টিকিয়ে রেখেছিল এ অঞ্চলে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ৯৫টি নদ-নদী, খাল। কংস, মগড়া, সোমেশ্বরী, উব্দাখালী, ধনু, ঘোড়াউৎড়া, বিষনাই, ধলাই, সাইডুলী, পাটেশ্বরী, গণেশ্বরীসহ প্রায় শত নদ-নদী, সহস্রাধিক খাল-বিল, ৩৫ হাজার ৮৩৩ পুকুর ও ছোটবড় ১৩৫টি হাওর রয়েছে বৃহত্তর নেত্রকোণায়। হাওরের নানিদ, মহাশোল, বেদুরি, বাচা, হিলংসহ অসংখ্য মাছ হারিয়ে গেছে। নদ-নদীতে ছিল নানা বৈচিত্র্যের মাছ, ছোটবেলায় শুনেছি মাছের গল্প, মাছ ধরার গল্প, উইজ্যার গল্প, কাডা দিয়ে নদীতে মাছ ধরার কাহিনী। আজকাল আর নেত্রকোণার পাহাড়ি নদী, হাওর, বিল, খাল, জলজলাশয়ে মাছ কমে গেছে, মাছের বংশ ধ্বংস হওয়ার মতো পরিবেশবিধ্বংসী কাজ ও উন্নয়নের নামে বিষ-কীটনাশক, নদীতে-হাওরে বাঁধ দিয়ে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজননে বাধাগ্রস্ত করার ফলে মাছের বৈচিত্র্য আর থাকছে না।
কেন্দুয়ার হারুলিয়ার ৮০০ বছরের পুরোনো গাইনের মসজিদ, খোজার দিঘি, আটপাড়ার সাতপুকুর ও হাসানকুলি খাঁর মাজার, কেন্দুয়ার বাউল জালাল খাঁর বাড়ি, লোকসংস্কৃতি সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দের বসতভিটা, কবি কংকের বাড়ি, উকিলমুন্সি, আবেদ আলী, আবদুল মজিদ তালুকদার, কবি রওশন ইয়াজদানীর বাড়ি, আটপাড়ার কৃষ্ণপুরের চর্যাপদের কবি কাহ্নপার ভিটে, দুর্গাপুরের টংকু আন্দোলনের নেত্রী রাশমণির স্মৃতিসৌধ, সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী, কেন্দুয়ার গোগ বাজারের ত্রিমোহনী, মদনপুরের শাহ সুলতানের মাজার, শাহ সুখুল আম্বিয়ার মাজারের পাশে মোগল যুগের এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ, কমলাকান্দা ও দুর্গাপুর সীমান্ত অঞ্চলের পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিরিশিরি আদিবাসী সাংস্কৃতিক একাডেমি, কবি নির্মলেন্দুর কাশবন সাংস্কৃতিক বলয়, বিজয়পুরের চীনামাটির পাহাড়, লেংগুড়া সাতশহীদের মাজার, কুমুদিনী স্তম্ভ, কমরেড মণি সিংহের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি স্মৃতিস্মম্ভ, পাগলপন্থি আন্দোলনের টিপু শাহর দরগা, রোয়াইলবাড়ী প্রাচীন দুর্গ, পুকুরিয়ার ধ্বংসপ্রাপ্ত দুর্গ, দুর্গাপুরের মাসকান্দা গ্রামের সুলতানি যুগের এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ, আটপাড়ার শুনুই গ্রামের প্রাচীন শালিককেন্দ্র, নোয়াদিয়া ঠাকুরের ভিটে, কেন্দুয়ার নোয়াপাড়ায় প্রাচীন গান্ধার শিল্পের নিদর্শন, ধ্বংসপ্রাপ্ত পঞ্চরত্ন মন্দির, কালীমন্দির ও বিশালাকৃতির দুই আনি বাড়ির দিঘি, ফচিকা ফকির বাড়ির আলী হোসেন শাহর মাজার, নলিনী রঞ্জন সাংস্কৃতিক পল্লী, রানীকং মিশনসহ অর্ধশতাধিক দর্শনীয় ও শিক্ষণীয় স্থান। যে স্থানগুলো আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, প্রকৃতি নিয়েই গড়ে উঠেছিল।
যে শিশু ঘুম ভেঙে আকাশ দেখতে পারে না, খালি পায়ে ঘাসে হাঁটতে পারে না, পাখির ডাক শুনতে পারে না, ঝিরিঝিরি বাতাসে খিলখিল করে হাসতে পারে না, মাছের সঙ্গে সাঁতার কাটতে পারে না, গাছের ফুল-ফল ফোটা দেখে না, পোষা প্রাণীর সঙ্গে খেলা করে না, নদীর স্রোত দেখে না, ভাটা দেখে না সে বাপঠাকুরদার মতো সৃজনশীল, বিবেকবান, ন্যায়, সৎ, সাহসী ও আবেগপ্রবণ হবে না, বৈচিত্র্যময় হবে না, হতে পারে না। গাছ, মাছ, পাখি, মৌমাছি, ব্যাঙ, নদী, শামুক, ধান, গরু, প্রজাপতি একে একে সব পেশাজীবী মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে একে অনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধবোধ, সম্মানবোধ। আমাদের জানা উচিত প্রতিটি প্রাণীই আমাদের জীবনের জন্য, উন্নয়নের জন্য, মুক্তির জন্য, সুন্দরের জন্য বিশেষ প্রয়োজন। একটি ছাড়া অন্যটির জীবন বিপন্ন। বৈচিত্র্যই আমাদের জীবন, উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধি। বৈচিত্র্য আছে বলেই আমাদের জীবন এত সুন্দর। আসুন সবাই মিলে রক্ষা করি আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি। বৈচিত্র্যের ওপর ভর করে পারস্পরিক নির্ভরশীলতায় টিকে আছি আমরা, আমাদের এ সুন্দর বাংলাদেশ। সবকিছু নিয়ে গড়ে তুলতে চাই প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি স্বপ্নের বাংলাদেশ।