ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২২ ১২:১৯ পিএম
আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২২ ১২:৫০ পিএম
অলঙ্করণ : জয়ন্ত জন
আমার পঞ্চাশ বছরের শিক্ষকতা ও গবেষণা কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষার মানোন্নয়নে দ্রুত বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিষয়টির প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টায় ইতঃপূর্বে আমার আরও কয়েকটি লেখা ছাপা হয়েছে। আমি যে কারণে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে এত চিৎকার করছি—জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলাকে নিয়ে, তা আজ বাস্তব, দৃশ্যমান। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে আজ অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। জাতি হিসেবে বিশ্বে আজ গর্বিত আমরা। দেশের প্রতিটি খাতে কল্পনাতীত উন্নয়ন দৃশ্যমান। তবে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। অন্যান্য খাতের মতো উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে আমরা অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছি। তাই আমার আলোচনা আজ উচ্চশিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখব।
বিগত দুই দশকে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্বে যে বিপ্লব ঘটেছে, বিশেষায়িত শিক্ষার ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, আমরা তা থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছি। সামগ্রিকভাবে উচ্চশিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে। শুধু তাই নয়, শিক্ষাকে অর্থবহ, কর্মমুখী, উৎপাদনশীল এবং সৃজনশীল করতে হবে। কাজটি কেমন করে করতে হবে এবং কোথা থেকে শুরু করতে হবে—এ বিষয়ে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো ধারণা আছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। প্রথম কথা হলো, আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে সমস্যাগুলো বিরাজমান, তা ভালোভাবে চিহ্নিত করতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়নে যথাযথ কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে বিগত দুই দশকে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নিতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের দেশে এইচএসসি-পরবর্তী পর্যায়ে বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুমানিক ৩৬ লাখ। তাদের মধ্যে প্রায় ৫৬ হাজার শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় লেখাপড়া করে। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩ লাখের ওপরে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হবে কারিগরি, কৃষি, মেডিকেলে ভর্তি শিক্ষার্থী। এ শিক্ষার্থীর সংখ্যাও সর্বমোট ২ লাখের মতো। বাকি শিক্ষার্থীরা অর্থাৎ ৩০ লাখের কিছু বেশি শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজে লেখাপড়া করছেন। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শতকরা ৮৩% বিভিন্ন কলেজে উচ্চশিক্ষা নেন।
প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান নিয়ে আমরা যে এত কথা বলছি—মানোন্নয়নের চেষ্টায় পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছি, কিন্তু বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ এ কলেজগুলোয় (আনুমানিক ২ হাজারের ওপর) পাঠদান, শিক্ষার মান, শিক্ষক সংখ্যা, শিক্ষকদের যোগ্যতা, অবকাঠামো ইত্যাদি বিষয়ের কী অবস্থা তা আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি! যারা বিভিন্ন সূত্রে কলেজগুলোর সঙ্গে জড়িত, তাদের কাছ থেকে জানা যায়, সেখানে ভয়াবহ এক নৈরাজ্যকর অবস্থা বিরাজমান। অধিকাংশ কলেজে পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক নেই। অনার্স, মাস্টার্স শ্রেণিতে পড়াবার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের ঘাটতি আছে। হাতেগোনা অল্প কিছুসংখ্যক কলেজ ছাড়া বাকি কলেজগুলো এ সংকট নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত বেশ কয়েকটি কলেজে নতুন কয়েকটি বিভাগ চালু করা হলেও শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। কবে, কীভাবে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে তা স্পষ্ট নয়। একই শিক্ষকবৃন্দ পরিচালনা করছেন এইচএসসি ও অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ের লেখাপড়া। শুধু তাই নয়, অনেক সময় অন্য বিভাগ থেকে শিক্ষক ধার করে এনে পাঠদান করানো হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের একজন শিক্ষককে বলা হচ্ছে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ক্লাস নিতে। যদি হিসাববিজ্ঞানে ব্যবসায় প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোর্স চালু থাকে তাহলে এমন কিছু করতে দোষ নেই। কিন্তু হিসাববিজ্ঞানেরই বিষয় পড়াতে অন্য বিভাগের শিক্ষক ডেকে আনা কতটা যুক্তিযুক্ত? কলেজগুলোয় গবেষণার কোনো ব্যবস্থা নেই। শিক্ষকদের মধ্যে কেউ গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তাদের মধ্যে গবেষণার আগ্রহও তেমন নেই। এসব কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা সনদ নিয়ে শিক্ষিত বেকারে পরিণত হচ্ছেন। এ বিষয় নিয়ে আমরা কি ভেবেছি? আর চোখ-কান বন্ধ করে থাকা আদৌ উচিত হবে না।
অবস্থা যখন এমন, তখন সঙ্গত কারণেই উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞানশিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। চাকরিস্বল্পতাই এর মূল কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আইনস্টাইনের মতে, যদি কাউকে একদমই আয়-রোজগারের কথা চিন্তা করতে না হয়, তাহলে তার জন্য বিজ্ঞান অবশ্যই আশীর্বাদস্বরূপ। তবে সব বিষয় অধ্যয়নের মাধ্যমেই যে চাকরি পাওয়া যাবে এ কথা সত্য নয়। শিক্ষার মূল লক্ষ্য যদি হয় চাকরি, তখন জ্ঞান-বিজ্ঞান, উন্নয়নের অন্যান্য পথ নেবে কারা? একজন গবেষকের ভূমিকা বিচার করে দেখলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তিনি চাকরি করেন বিষয়টি এমন নয়। তবে তার কাজেরও একটি অর্থনৈতিক পরিসর আছে। সেই পরিসর রাষ্ট্রের সার্বিক অগ্রগতির সঙ্গে জড়িত। এজন্যই অধিকাংশ রাষ্ট্র গবেষণার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। ২০১০ সালে প্রকাশিত ইউজিসির প্রতিবেদনে দেখা যায়, সে সময় ৩১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত মোট ১৫ লাখ ৭২ হাজার ৪৭৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে কলা ও মানবিক বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫ লাখ ৩১ হাজার ২০৭ জন, সামাজিক বিজ্ঞান ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬৯৮ জন, বিজ্ঞান, কৃষি ও কারিগরি ক্যাটাগরিতে ৩ লাখ ৩ হাজার ৫৪২ জন, বাণিজ্যে ৪ লাখ ৬২ হাজার ৫৫৪ জন, আইনে ৩১ হাজার ৮৫২ জন এবং ডিপ্লোমা/সার্টিফিকেট কোর্সে ৫ হাজার ৬২১ জন। এসব শিক্ষার্থীর বেশিরভাগ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কলেজ ও ইনস্টিটিউটে অধ্যয়নরত। আবার এক্ষেত্রে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবসায়িক স্বার্থে তারা ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে সম্প্রতি বিজ্ঞানশিক্ষার বিষয়েও তারা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। প্রকৌশল ও অন্যান্য প্রযুক্তিকেন্দ্রিক বিদ্যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী ও গবেষণায় আগ্রহী করে তুলছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।
সরকার অবশ্য উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের অর্থসহায়তায় এইচইকিউইপি (হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট) গ্রহণ করেছিল ২০০৯ সালে এবং সেটি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে। সেখানে কিছু ভালো ভালো অর্জন আছে। এই প্রকল্পের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কিছু কিছু গবেষণার অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। গবেষকরা সেখানে মানসম্মত গবেষণা করতে পারছেন। এইচইকিউইপির একটি অঙ্গ হচ্ছে বিডিআরইএন (বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন নেটওয়ার্ক), যার আওতায় দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদেশের সঙ্গে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। বহু অর্থ ব্যয়ে প্রতিষ্ঠিত এই নেটওয়ার্ক এখনও কার্যকরভাবে ব্যাপক ব্যবহার করা হচ্ছে না। আমাদের গবেষণা ও পঠন-পাঠনের সীমাবদ্ধতার কারণে এটি হচ্ছে। আমার আশঙ্কা, বিডিআরইএনের আওতায় স্থাপিত নেটওয়ার্ক আগামীতে তার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। এইচইকিউইপির আরেকটি অঙ্গ হলো কিউএইউ (কোয়ালিটি আস্যুরেন্স ইউনিট)। এই কিউএইউয়ের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক প্রোগ্রামকে আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করে মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার অবকাঠামোসহ সামগ্রিকভাবে উন্নত করার প্রক্রিয়া প্রচলন করার পথ দেখানো হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশের ৬৯টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইকিউএইউ (ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি আস্যুরেন্স ইউনিট) গড়ে তোলা হয়েছে—যে সেলের কাজ হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে দিকনির্দেশনা প্রদান করা ও শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে উদ্বুদ্ধ করা। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, এটি হচ্ছে এইচইকিউইপি প্রকল্পের সবচেয়ে সফল অংশ। এই মানোন্নয়ন প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএসি) নামে একটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে ২০১৭ সালে—যদিও এর কার্যক্রম এখনও শুরু করা যায়নি, অনেকটা আন্তরিকতার অভাবে। মানোন্নয়নে ও মানের স্বীকৃতি (অ্যাক্রেডিটেশন) প্রদানই হবে এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
দেশের কলেজগুলোতে এখন পর্যন্ত মানোন্নয়নের কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি, যদিও কলেজগুলোতে সিংহভাগ ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় সরকার কলেজ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (সিইডিপি) নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর আসল উদ্দেশ্য হলো কলেজ শিক্ষকদের মালয়েশিয়ার নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরা দেশে ফিরে অন্যান্য কলেজ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেবেন। যে গতিতে বা যে সংখ্যক শিক্ষক নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে তাতে শিক্ষার মানোন্নয়ন ১০০ বছরেও হবে না। আমরা যে তিমিরে ছিলাম, সেই তিমিরেই থাকব। অথচ উচ্চশিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে, মানসম্মত শিক্ষা দিয়ে আমাদের মানবসম্পদ উন্নয়ন করতে পারলে দেশ দ্রুত উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতো। আমাদের পক্ষে অদূর ভবিষ্যতে জাপানকে ছাড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব হবে না। এখন আমাদের দরকার মানসম্মত, কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং এজন্য অবিলম্বে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলকে পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করা।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক