সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২১ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:৩৬ পিএম
মিসরের রাজধানী কায়রোতে ১১তম ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যে আহ্বান জানিয়েছেন তা অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং বিদ্যমান বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ বলে আমরা মনে করি। ১৯ ডিসেম্বর তিনি তার ভাষণে উদ্যোক্তা ও উচ্চতর শিক্ষার মধ্যে দূরত্ব ঘোচানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ডিজিটাল বিপ্লবের পূর্ণ সুবিধা গ্রহণ করে তরুণদের দক্ষ করে তোলার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ফলমুখী সংযোগ গড়ে তোলার এবং শিক্ষা প্রবর্তনের প্রস্তাবও করেছেন। উদ্যোক্তা ও উচ্চতর শিক্ষার মধ্যে দূরত্ব ঘোচালে এর বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হবে, তা প্রত্যাশার বাইরে নয়। ডি-৮ দেশগুলোর নেতাদের বৈশ্বিক ব্যবসা ও শিল্পের তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকা নিশ্চিত করতে উপযুক্ত করে গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন। পাশাপাশি ডি-৮ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কাঠামো নতুন করে ঢেলে সাজানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। আমরা মনে করি, ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিদ্যমান বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই বিষয়গুলো প্রস্তাব আকারে তুলে ধরেছেন।

উল্লেখ্য, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় আঞ্চলিক জোটগুলোর গুরুত্ব সংগত কারণেই অনেক বেড়ে গেছে। আমরা জানি, উন্নয়নশীল আটটি দেশ নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা ডি-৮ একটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন জোট। বাংলাদেশ, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ইরান, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান এবং তুরস্ক এই আটটি নিয়ে গঠিত হয় ডি-৮ সংস্থা। এর উদ্দেশ্য হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নতি সাধন করা ও বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করা। পাশাপাশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সুবিধা বৃদ্ধি করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সবার অংশগ্রহণ বাড়ানোর ও মানসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করাও সংস্থাটির লক্ষ্য। এর সহযোগিতার প্রধান খাতগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ আর্থিক, ব্যাংকিং, গ্রাম্য উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মানবকল্যাণ ও মানবাধিকার, কৃষি, জ্বালানি, পরিবেশ এবং স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন। সংস্থাটির সহযোগিতার খাত কিংবা লক্ষ্যগুলো যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়, এর গুরুত্ব অনেক বেশি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ওই সম্মেলনের ফাঁকে কায়রোর একটি হোটেলে ১৯ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গেও বৈঠক করেন। তিনি খুব সংগত কারণেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে একাত্তরের অমীমাংসিত সমস্যা মীমাংসা করে সম্পর্কের সেতু মজবুত করার যে প্রস্তাব রেখেছেন আমরা তাতেও সাধুবাদ জানাই। তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জিইয়ে থাকা বিষয়গুলোর চিরতরে সুরাহা করার যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন, তাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে আমরা মনে করি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। এই দুই নেতার আলোচনায় দক্ষিণ এশিয়ার জোট সার্ক ইস্যুও উঠে আসে। উভয়ই এই সংস্থাটিকে গতিশীল করার ওপর জোর দেন। আমরা মনে করি, প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক ক্ষেত্র থেকে প্রতিটি দেশকেই এখন বৈশ্বিক পরিসরে ভিন্নভাবে সম্পর্কের সেতু মজবুত করার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। যেকোনো দেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরাপত্তাসহ আনুষঙ্গিক আরও কিছু জরুরি বিষয় রয়েছে।
আমাদের স্মরণে আছে, ১৯৯৭ সালের ১৫ জুন ইস্তাম্বুল ঘোষণার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ডি-৮ সংস্থা তার যাত্রা শুরু করেছিল। এর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল, বিশ্ব অর্থনীতিতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অবস্থানকে শক্তিশালী করা, বাণিজ্যের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা, আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং সদস্য দেশগুলোর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি লক্ষ করা গেলেও আমরা মনে করি, তা আরও সম্প্রসারিত করার সুযোগ রয়েছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নানা পর্যায়ে মানবাধিকারসহ উন্নয়নের অনেক ক্ষেত্রেই অভিঘাত লাগছে। সংঘাতময় বিশ্ব পরিস্থিতিতে শান্তি যেন ক্রমেই সুদূরপরাহত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ডি-৮ সহ প্রত্যেকটি আঞ্চলিক সংস্থার বিশেষ ভূমিকা পালনের অবকাশও রয়েছে।
ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য বৈচিত্র্য ও উদ্ভাবনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে আলোকপাত করার পাশাপাশি সদস্য দেশগুলো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং পারস্পরিক প্রবৃদ্ধি উৎসাহিত করতে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয়ও দৃশ্যমান হয়েছে। আমরা মনে করি, সদস্য দেশগুলোর যূথবদ্ধ প্রয়াসে এবং সময়ের দাবির প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করে এগিয়ে গেলে এর বহুমাত্রিক সুফল হয়তো দেশগুলোর জনগণের জন্য দৃশ্যমান হবে। আমরা আরও মনে করি, উত্তপ্ত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির বাতাবরণ সৃষ্টি করে অশান্তির দাবানল নেভানোর ক্ষেত্রেও প্রত্যেকটি আঞ্চলিক জোটই কোনো না কোনোভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এমনটি সময়ের দাবি। আমরা ডি-৮-এর লক্ষ্য অর্জনে সাফল্য কামনা করি।