× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা

গণতন্ত্রের হৃত ঐতিহ্য ফিরুক

ড. ফরিদুল আলম

প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:১০ এএম

ড. ফরিদুল আলম

ড. ফরিদুল আলম

সম্প্রতি হাইকোর্ট কর্তৃক সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলবিষয়ক যে রায় প্রদান করা হয়েছে, তা এককথায় যুগান্তকারী। আদালত রিটকারীদের আবেদনের ভিত্তিতে এ সংশোধনীটি পুরোপুরি বাতিল না করে কিছু বিষয় পরবর্তী সংসদের বিবেচনার জন্য সুপারিশ করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সমাধানটি এসেছে, তা হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনবিষয়ক যে বিধানটি পঞ্চদশ সংশোধনীর অধীনে বাতিল করা হয়েছিল তা আদালতের রায়ে বাতিল হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে কোনো সংক্ষুব্ধ পক্ষ যদি এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল না করেন, কিংবা আপিলেও এ রায় বহাল থাকে, তাহলে ধরে নিতে হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হলো।

যদিও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়া হিসেবে বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করে দিয়েছে, যার অধীনে রাষ্ট্রের কার্যাবলি নিয়ন্ত্রিত হবে। তবে এ ক্ষেত্রে এ কমিশনের সুপারিশগুলো উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কার্যকর হলেও অনিশ্চয়তা থেকে যায় পরবর্তী সরকার এগুলো কতটুকু বৈধতা দেবে বা আদৌ দেবে কি না তার ওপর। আদালতের রায় অন্তর্বর্তী বা নির্বাচিত সরকার সবার জন্যই পালন অত্যাবশ্যকীয়। এ ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে যে রায় এসেছে, তা পরিবর্তনের কোনো এখতিয়ার ভবিষ্যতের সংসদের হাতে থাকবে না। তাই ধরেই নেওয়া যায়, দেশের নির্বাচনব্যবস্থায় আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে এলো, এর ব্যত্যয় হওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে মহামান্য আদালতের রায়ের মাধ্যমে এটা নিয়ে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে।

আদালতের রায়ে এ তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু ছাড়া আরও কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের সমাধান এসেছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের অনুচ্ছেদগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশের পরিবর্তন আনে। এ রায়ের মাধ্যমে কয়েকটি ছাড়া এসব পরিবর্তন বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে বিজ্ঞ আদালত যে বিষয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেননি সেগুলো হচ্ছে সংবিধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি, ৭ মার্চের ভাষণ এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণাসংক্রান্ত বিষয়গুলো। এর মধ্য দিয়ে কার্যত আইন অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা, ৭ মার্চ এবং ২৬ মার্চ বৈধতা পেল, অর্থাৎ এর ব্যত্যয় আইনের ব্যত্যয় বলে পরিগণিত হবে, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পরবর্তী সংসদ কী করবে না করবে তা সময় বলে দেবে। রাজনৈতিক সরকারের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অথবা ব্যাপকভিত্তিক রাজনৈতিক মতৈক্যের মধ্য দিয়ে সংবিধান সংশোধন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি প্রক্রিয়াগত বিষয় এবং কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মধ্য দিয়ে গঠন করা কোনো সরকার চাইলেই, কিংবা অন্য দলগুলো না চাইলে এবং সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে এবং সেই সঙ্গে নির্দিষ্ট বিষয়গুলোর বিষয়ে ঐকমত্য না থাকলে সংবিধান সংস্কার করা সম্ভব নয়। সে বিবেচনায় বলা যায়, উচ্চ আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কিছু মৌলিক বিষয়ের নিষ্পত্তি ঘটেছে।

তা হচ্ছে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে তখনকার ক্ষমতাসীন সরকার দেশকে আজকের এ অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। খুব ঠুনকো অজুহাত কেন্দ্র করে নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে গিয়ে তারা নিজেদের কার্যত খাদের কিনারে নিয়ে গেছে, যার মধ্য দিয়ে একসময়ের ব্যাপক জনপ্রিয় দল, যে দলের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল এবং যে মহান নেতার নেতৃত্বে এবং দূরদর্শিতায় দেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই দল এবং নেতাকে পর্যন্ত আজকের সময়ের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে, অস্তিত্ব সংকট থেকে নিজেদের রক্ষা করার মতো কোনো উপায় এখন পর্যন্ত তারা নির্ধারণ করতে পারছে না। এটাই হচ্ছে নির্মম নিয়তি! ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে গিয়ে সময়ের কাছে আজ তারা বহুবিধ অপরাধে অপরাধী।

যে বিষয়টির ওপর ভিত্তি করে ২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয়, তা হচ্ছে আপিল বিভাগের একটি রায়। ২০১১ সালের ১০ মে এ রায়ে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশধনী অবৈধ ঘোষণা করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বে আদালতের রায়টি সর্বসম্মত ছিল না, সাতজন বিচারপতির মধ্যে তিনজন এবং ১০ জন অ্যামিকাস কিউরির মধ্যে আটজনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের বিপক্ষে তাদের মত দিয়েছিলেন। আদালত এসব অগ্রাহ্য করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রায় দিয়েছিলেন, যদিও সে রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়টি পুরোপুরি নাকচ করে না দিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে পরবর্তী দুটি নির্বাচন এ ধরনের সরকারের অধীনে হতে পারে বলে মত দেওয়া হয়েছিল। আরেকটু বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ২০১০ সালে আপিল বিভাগ এক রায়ে জিয়াউর রহমানের আমলের সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেন, যার মধ্য দিয়ে অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বিষয়টি সামনে চলে আসে। মূলত এটিকেই ভিত্তি করে তৎকালীন সরকার ভবিষ্যতে অগণতান্ত্রিক পন্থায় যেন কেউ আর রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে না পারে সে লক্ষ্যে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর উদ্যোগ নেয়। এ লক্ষ্যে ১৫ সদস্যের সংসদীয় কমিটি করে দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, এ কমিটিতে বিএনপি এবং জামায়াতের কোনো সদস্য যোগ না দেওয়ার ফলে এটি এককভাবে আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে গঠিত হয়। সংসদীয় কমিটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করে, যেখানে প্রায় সবাই নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। কমিটির সদস্যরা নিজেরাও এর পক্ষে ছিলেন। একই বছরের ২৭ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংসদীয় কমিটির বিশেষ সভায় শেখ হাসিনা নিজেও এর পক্ষে মত দেন। কিন্তু পরে ১০ মে আপিল বিভাগের রায়ের পর ৩০ মে আবারও সভায় যোগ দিয়ে এর বিপক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। বলা যায় এটি সে সময়ের প্রধানমন্ত্রীর একক চাওয়া ছিল এবং সেটাই সবাইকে মেনে নিতে হয়েছিল, যা পরে ৩০ জুন সংসদের বাজেট অধিবেশনে পাস হয়। আর এটি সম্ভব হয়েছিল সে সময়ের সংসদে তাদের এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন থাকার সুবাদে।

এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বক্তব্যে এ ধরনের সরকারব্যবস্থার ফলে অগণতান্ত্রিক সরকারের আগমন হতে পারে বলে যুক্তি প্রদর্শন করা করেছিলেন এবং এ ক্ষেত্রে ১/১১-এর উদাহরণ টানা হয়েছিল বারবার। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, এসব যুক্তি যে ধোপে টেকে না এর সর্বশেষ জ্বলন্ত উদাহরণ হলো ৫ আগস্ট, যখন তার পতনের পর অনির্বাচিত একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করল। পঞ্চদশ সংশোধনীর অধীনে সংবিধানবহির্ভূত উপায়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণসংক্রান্ত সংবিধানের ৭ক এবং ৭খ অনুচ্ছেদ আদালত কর্তৃক বাতিল ঘোষিত হয়েছে। এটি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি রক্ষাকবচ হলেও এর দ্বারা সত্যিকার অর্থে সুফলভোগী হয়েছে আওয়ামী লীগ। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নিজ দলের অধীনে পরপর তিনটি নির্বাচনে তারা যেভাবে বিজয়ী হয়েছিল, সেটাও গণতন্ত্রের প্রতি এক বড় চপেটাঘাত বই কিছু নয়।

আদালতের রায় বর্তমান সরকারের জন্যও একটি বার্তা। যদিও আদালত এ অন্তর্বর্তী সরকার গঠনকে জাতির প্রয়োজনে একটি ক্রান্তিকালীন সরকার হিসেবে মত দিয়েছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহালের মাধ্যমে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হলে এ সরকারের মেয়াদ যত স্বল্প হবে ততই জাতির জন্য মঙ্গলজনক। রাষ্ট্র সংস্কারের যে কথাগুলো সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এগুলো আসলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়, যা রাজনৈতিক সরকারের মাধ্যমে সাধন করাই শ্রেয়। তবে এ ক্ষেত্রে যেহেতু আদালতের রায়ের মাধ্যমে গণভোটের বিধান ফিরে এসেছে, তাই জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বর্তমান সরকারের বৈধতাবিষয়ক একটি গণভোট আয়োজন করা সময়ের দাবি।

পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত রায়ের পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয়ের অবতারণা ঘটেছে। তা হচ্ছে এর মাধ্যমে যে বিষয়টি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেটি হলো গণতন্ত্র। আমাদের মনে রাখা দরকার, এ রায়ের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিনির্মাণে এবং এর প্রতিপালনে জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে। এই রায়ে জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সব পক্ষের কর্তব্য গণতন্ত্রের হৃত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য নিজেদের মেয়াদসংক্রান্ত একটি গণভোটের আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের বৈধতা নির্ধারণ সমাপনান্তে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দ্রুত নির্বাচনের পথ সুগম করাই উত্তম। এর মাধ্যমে সরকারও সম্মানিত হবে, জাতিও উপকৃত হবে।

  • কূটনীতি ও রাজনীতি বিশ্লেষক। অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা