নারী নির্যাতন
নাজমুন নাহার হেলেন
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:০৭ এএম
প্রতিটি মুহূর্তেই ঘরে বাইরে ট্রেনে বাসে শিক্ষাঙ্গনে সর্বত্র নারীরা শিকার হচ্ছেন সহিংসতার, নির্যাতনের। দিন দিন বেড়েই চলছে নারীর প্রতি সহিংসতার গ্রাফ। নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে, রাস্তাঘাটে এমনকি নিজের পরিবারেও। নারীর প্রতি সহিংসতা যেন কমছেই না। অথচ পুরুষতান্ত্রিকতায় বলে ঘরেই নারীরা নিরাপদ, কিন্তু আদৌ কি তাই? সনাতন যুগ থেকেই সতীদাহের মতো ভয়ংকর সহিংসতা চলত নারীদের ওপর। সেই প্রথা বিলুপ্ত হলেও নারীদের ওপর থেকে সহিংসতা একটুও কমেনি বরং ধরনটা পাল্টেছে। এখন বেড়েছে জুলুমের রকমফের। যেমনÑ খুন, ধর্ষণ, নারী পাচার, নারী বেচাকেনা ও পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা, যৌতুকের জন্য অত্যাচার। এ ছাড়াও সামান্য কারণেই চলে নারীদের ওপর পৈশাচিক অত্যাচার, তরকারিতে নুন কম হওয়ায় পিটিয়ে মেরে ফেলা অথবা বাপের বাড়ি বেড়াতে যেতে চাওয়ায় মোটরসাইকেলের পেছনে বেঁধে রাস্তায় চালানোর (পাশের দেশ ভারতে) মতো নির্যাতনও চলে নারীর ওপর। প্রায় প্রতিটি দিনই খবরের কাগজে উঠে আসে নারীর প্রতি সহিংসতার কোনো না কোনো লোমহর্ষক ঘটনা। কিন্তু এর শেষ কোথায়? কীভাবে সম্ভব নারীর প্রতি দিন দিন বেড়ে চলা এই সহিংসতা প্রতিরোধ করা? এ দায়িত্ব কার?

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বিশ্বে ২০২৩ সালে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ও স্বজনদের হাতে প্রতিদিন গড়ে ১৪০ জন নারী ও মেয়ে খুন হয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয় যে, গত বছর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী এবং জনদের হাতে খুন হওয়া নারী ও মেয়েদের বৈশ্বিক সংখ্যা ৫১ হাজার ১০০। সংখ্যাটা আগের তুলনায় বেড়েছে। বিশ্বজুড়ে ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৮ হাজার ৮০০। কেন নারীর প্রতি এই পৈশাচিকতা? কেন থামছে না এই সহিংসতা?
দেশে বিগত দুই সরকারের প্রধান হিসেবে দুই নারী যুগের পর যুগ দেশ শাসন করলেও নারী নির্যাতনের গ্রাফে কদর্যতার ছাপ রয়েই গেল। নারী নির্যাতন বন্ধে তেমন কঠিন পদক্ষেপও দৃশ্যমান হয়নি। অথচ দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে দেশে অনেক আইন আছে। নারীর সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সরকারি-বেসরকারি অনেক সংস্থা কাজও করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এতসব উদ্যোগ আয়োজন সত্ত্বেও নারী নির্যাতন কমছে না। বরং সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিতই দিচ্ছে। সরকারিভাবে কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এবং সামাজিক প্রতিরোধ না এলে এই মহামারিতে কেবল নারীই নিপীড়নের শিকার হয় না, দেশের সমূহ সম্ভাবনাকেও তা নস্যাৎ করে দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে আশঙ্কাজনক হারে নারী ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে এবং সংখ্যায় প্রায় ৭৫ শতাংশই নারী। পুরো বিশ্বেই নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্র ভয়াবহ। কিন্তু আমাদের দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা হলে, নির্যাতিতার পাশে দাঁড়ানোর মতো বন্ধু, স্বজন ও সাপোর্ট দেওয়ার মানুষ অপ্রতুল। সহিংসতার শিকার নারী দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং আঘাতজনিত পরিণতির শিকার হওয়ার কারণে মানসিক চাপ মস্তিষ্কের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষত, কোর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোনের উচ্চমাত্রা মস্তিষ্কে স্মৃতি এবং চিন্তা সম্পর্কিত অংশগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে; যা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। আবেগ অবদমনে বাড়ে ডিপ্রেশন, যা ডিমেনশিয়ার অন্যতম কারণ। সহিংসতার শিকার নারী সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে মানসিক অবসাদ এবং একাকিত্বের সৃষ্টি করে; যা মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক বা মানসিক সহিংসতার ফলে নারীর ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং শারীরিক, মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমাদের সমাজে নারী কোথাও নিরাপদ নন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা ঘরে যেমন পুরুষ সদস্যদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন, তেমনি বাইরেও। বিশেষ করে যানবাহন ও কর্মস্থলে নারীকে প্রায়ই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়। চলন্ত বাসে নারী ধর্ষণের ঘটনাও বেড়েছে। কেন এই নির্যাতন কমছে নাÑ এ বিষয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। কেননা, এত কঠিন কঠোর আইন থাকার পরও যখন নির্যাতন কমছে না, তখন এ বিষয়ে মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা জরুরি। আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ যদি পরিবর্তন না করা যায়, তাহলে কেবল আইন দিয়ে বা রাষ্ট্রীয় হাজার উদ্যোগে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা যাবে না।
আমাদের সমাজে নারীর প্রতি প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি খুবই নেতিবাচক। একজন নারী রাস্তা দিয়ে একা হেঁটে যাওয়া মানে অসংখ্য পুরুষের কামার্ত, বিকৃত দৃষ্টিকে মোকাবিলা করে পথচলা। বন্ধু পরিমণ্ডলে কমবেশি সবাই নারীর শরীর সৌন্দর্য ও কাম নিয়ে খুবই তাচ্ছিল্যপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে অবলীলায় আলোচনা করে। নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা খুব কম পুরুষেরই আছে। পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারী কেমন হবে, সেই সিদ্ধান্ত যেমন পুরুষের; তেমনি নারী কী করবে, কী পরবে, সেই সিদ্ধান্তও তাদের। এটা খুবই জটিল একটা প্রক্রিয়া। ঠিক এই কারণে পুরুষের চেয়ে নারীর মনস্তাত্ত্বিক সংগ্রামটাও দ্বিগুণ।
প্রতিটি জায়গায় নারীদের নিজের ওপর আস্থা ও সাহস রাখতে হবে। নারীসহ সবাইকে সচেতন করতে হবে যে, নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীর নিজের কোনো দোষ নয়, বরং নির্যাতনকারীই এর জন্য দোষী। সবাইকে একত্রিত করে চিন্তা ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নারীর প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধ করতে হবে। পারিবারিক এবং সামাজিক পরিমণ্ডলে নারীর সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। স্কুল-কলেজ, কর্মক্ষেত্র কিংবা পারিবারিক পরিবেশে নারীর প্রতি যেন কোনো ধরনের হয়রানিমূলক আচরণ করা না হয়, তার জন্য শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক ও পারিবারিক অবকাঠামোতে নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে এবং প্রাত্যহিক জীবনে কীভাবে তা পরিচর্যা করা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। ছেলেশিশু এবং মেয়েশিশুকে সমান গুরুত্ব দিয়ে মানবিকতার শিক্ষা পরিবার থেকেই দিতে হবে। পারিবারিক মূল্যবোধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা যদি নারীদের সত্যিকার অর্থে সম্মান করতে শেখার অভ্যাসটা গড়ে তুলতে পারে, তবে সেটি তার পরবর্তী প্রজন্মসহ সামগ্রিক সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন আনবে।
সর্বোপরি নারীর প্রতি সহিংসতা রুখতে রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে এবং সহিংসতা বন্ধে রাষ্ট্রের সহায়তায় সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নির্যাতনের শিকার নারীকে সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে আনতে পদক্ষেপ নিতে হবে সবার। এ ছাড়াও মাদক ও পর্নোগ্রাফি বন্ধ করা জরুরি। আইনের তাৎক্ষণিক কঠিন ও কঠোর পদক্ষেপ কমাতে পারে নারী নির্যাতনের হার।