পাভেল পার্থ
প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৪৯ এএম
পাভেল পার্থ
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ‘গেরিলা গ্রাফিতি’গুলো সমগ্র বাংলাদেশ দেখতে পারেনি। বন্দুক, বারুদ, রক্তস্রোত আর বাহাদুরির ভেতর জানবাজি রেখে স্প্রে বা স্টেনসিলে করা সেই সব লড়াকু গ্রাফিতি। কর্তৃত্ববাদী রেজিমের পতনের পর আমরা দেখেছি ‘সামাজিক গ্রাফিতি’ ও দেয়ালচিত্র। একজন বা বহুজনে মিলে রঙ-সরঞ্জাম নিয়ে সেই সব গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে। চারধারে তখন কোনো জুলুম বা জবরদস্তি ছিল না। অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে তৈরি হয়েছিল এক আসমুদ্রহিমাচল স্বপ্নময় আকাঙ্ক্ষা। বিগত রেজিমগুলো যা আমাদের চুরমার, খানখান, ওলটপালট করে ফেলেছিল। গ্রাফিতির ভেতর দিয়ে জেন-জিসহ তরুণ প্রজন্ম কর্তৃত্ববাদী রেজিমকে প্রশ্ন করেছে। বহু গ্রাফিতি আছে প্রজন্ম তাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে হাজির করেছে। ইনক্লুশন থেকে সংস্কার, পাহাড় থেকে সমতল, সর্বধর্ম থেকে প্রাণিকল্যাণ নানাকিছু হাজির হয়েছে গ্রাফিতিতে। শতসহস্র বিষয় নিয়ে গ্রাফিতি আছে, দুর্দান্ত প্রশ্ন আছে, সাহসী সব জরুরি উচ্চারণ আছে। কিন্তু খাদ্য নিয়ে একটি গ্রাফিতিও নেই। নতুন প্রজন্ম কেমন খাদ্যব্যবস্থা আকাঙ্ক্ষা করে বা কেমন খাবার খেতে চায়Ñ এই প্রশ্ন তো জরুরি। কারণ উৎপাদন থেকে গ্রহণ সামগ্রিক খাদ্যব্যবস্থা ঘিরেই জারি আছে প্রবল কর্তৃত্ববাদ, দুর্নীতি, দূষণ, দখল, লুটতরাজ, ব্যাটাগিরি, অন্যায় দুঃসাশন, নিয়ন্ত্রণ, বৈষম্য, ভোগবাদী মুনাফা বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ, উপনিবেশিকতা, সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ এবং সহিংসতা। তাহলে এই খাদ্যপ্রশ্ন কেন জেন-জি প্রজন্মের কাছে জরুরি প্রশ্ন হইয়া উঠল না? কেন এখনও পর্যন্ত ছাত্র, নাগরিক কমিটি, রাজনৈতিক দল বা নাগরিক প্রতিক্রিয়া খাদ্যপ্রশ্নকে রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম মৌলিক জিজ্ঞাসা হিসেবে হাজির করলেন না? অথচ এই খাদ্যব্যবস্থা ঘিরেই যাবতীয় দ্বন্দ্ব, দম্ভ, দূষণ কিংবা দখলের রাজনীতি। খাদ্য ছাড়া আমরা কেউ বাঁচব না। আমাদের কী জানাবোঝা জরুরি না যে, এই খাদ্য আমাদের থালায় কীভাবে আসছে, কারা কীভাবে, কেন আনছে, কী আনছে কিংবা কী আনছে না? জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান প্রবল কর্তৃত্ববাদী রেজিমের পতন ঘটিয়েছে। কিন্তু খাদ্যব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা প্রবল কর্তৃত্ববাদী রেজিম ও রাজনীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখনও নিউলিবারেল বাহাদুরি দিয়াই আমাদের খাদ্যব্যবস্থা বহাল তবিয়তে চলতেছে। আমরা এর বিরুদ্ধে কোনো সাহসী গ্রাফিতি আঁকতে পারিনি এখনও। ক্ষমতার রেজিম জুরমার হইল। কিন্তু বাজারে কোনো জিনিসের দাম কমল কি? ভাত-ডাল-চালের স্বাধীনতা নিয়া বিগত রেজিমে এই একটুখানি প্রশ্ন তুলতে না তুলতে ক্ষমতার গদি নাখোশ হইছিল। তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠছিল। কিন্তু ভাত-ডালের স্বাধীনতা কি নিশ্চিত হইছে? রেজিম পরিবর্তনের পরও মাংস, ডিম, আলুর দাম অবিশ্বাস্যভাবে বাড়ছে। সিন্ডিকেট তেল লুইকাছে, দাম বাড়াইয়া আবার গর্ত থেকে বাইর করছে। এখন কি বাজারে রাসায়নিক বিষ ও সিনথেটিক সারমুক্ত দেশি ধানের চাল ও নিরাপদ শস্য ফসল পাওয়া যাইতেছে? না এসব আমাদের খাদ্যব্যবস্থা বদলায় নাই। বিগত ক্ষমতার রেজিমে যেসব বৈষম্য, কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ছিল, সেসব আছে। কিন্তু আমরা এইসব দখল, দূষণ ও দুর্বৃত্তায়ন চাই না। আমরা আমাদের খাবারের থালার স্বাধীনতা চাই। আমরা জলবায়ু-ন্যায্য খাদ্য-সার্বভৌম ব্যবস্থা চাই। খাদ্যব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে কৃষক-জেলে ও খাদ্য আহরণকারী জনগণ। বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ থেকে আমাদের খাবারের থালা মুক্ত করতে হবে। গণঅভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতাকে খাদ্য-রাজনীতি বিষয়ে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে। ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়িয়ে একই সঙ্গে ম্যাকডোনাল্ডসের বিরুদ্ধে বিশ্বসংহতিও জোরদার করতে হবে। জেন-জি প্রজন্মকে প্রলুব্ধ করা এইসব ফুড চেইনশপ ইসরায়েলি সেনাদের সেবাদানের মাধ্যমে গণহত্যা ও যুদ্ধকে জায়েজ করে। কোক-পেপসিতে আচ্ছন্ন থাকা নতুন প্রজন্মকে কোক-পেপসির প্লাস্টিক দূষণ নিয়া প্রবল প্রশ্ন তুলতে হবে। মনস্যান্টো, সিনজেনটা, কারগিল, ডুপন্ট, বায়ার, বিএএসএফের কোম্পানিরা বিশ্বের কৃষি উপকরণের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। মূলত তাদের বাণিজ্য ও মুনাফা ঠিক রাখার জন্য আমাদের খাদ্যকে রাসায়নিক দূষণে বিষাক্ত করে। আমরা প্রতিদিন পোল্ট্রি মুরগি, পাঙাশ বা তেলাপিয়া মাছ, হাইব্রিড ধানের ভাত কিংবা শাকসবজির মাধ্যমে একই সঙ্গে বিষও গিলি। আমাদের সবার শরীরে প্রতিদিন জমা হচ্ছে বিপজ্জনক ভারী ধাতু। সিসা, ক্যাডমিয়ামের মতো ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান। আমরা আমাদের অবুঝ শিশুদেরও এই বিষাক্ত বিপজ্জনক খাবারই গিলাতে বাধ্য করছি। প্রমাণিত হয়েছে কেবল অনিরাপদ খাদ্যব্যবস্থার কারণেই আমাদের স্বাস্থ্যহানি ঘটছে, রোগব্যধি বাড়ছে ও মৃত্যু বাড়ছে। জারি থাকা বৈষম্যমূলক বিপজ্জনক খাদ্যব্যবস্থার কারণে এই যে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণহানি এটি একই সঙ্গে ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’। খাদ্যব্যবস্থা ঘিরে জারি থাকা এই কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড এবং প্রবল বৈষম্যমূলক দখল-দূষণকে কি আমরা প্রশ্ন করব না? তাহলে আমরা রাষ্ট্রের কী সংস্কার করব? যেখানে খাদ্য ও কৃষি উৎপাদন আমাদের জীবনধারণ ও বেঁচেবর্তে থাকার অন্যতম প্রাথমিক মৌলভিত্তি। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর এখনও আমরা বৈষম্যহীন ন্যায্য স্বাধীন খাদ্যব্যবস্থা প্রশ্নে কোনো জোরালো আওয়াজ পাইনি। দৃশ্যত কোনো তৎপরতাও দেখিনি। বরাবরের মতোই পেঁয়াজ-আলুবীজ লাগাইয়া কৃষক সর্বস্বান্ত হলো, মাথায় হাত দিয়া জমির মাটিতে আছারিপিছারি কইরা কানল। রাষ্ট্র বা নাগরিক প্রতিক্রিয়া কেউ কৃষকের কান্ধে একটু হাত রাখল না। কেউ রাস্তায় কৃষকের পক্ষে ও বহুজাতিক বীজ-বেইমানির বিরুদ্ধে একটা মিছিল বা মানববন্ধনও করল না। কৃষক আগেও বাজার থেকে কোম্পানির বীজ কিনে প্রতারিত হইছে, রেজিম পরিবর্তনের পরও হইতেছে। কারণ খাদ্যব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণকারী প্রবল কর্তৃত্বাবাদী মনস্তত্ত্ব ও ব্যবস্থা বদলায়নি। এই রাজনীতি ও অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো নতুন প্রজন্মকে ওঠাতে হবে। কারণ বৈষম্যহীন ইনক্লুসিভ ন্যায্য সমাজ গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে দূষণ ও দখলমুক্ত করা। খাবারের থালার মুক্তি। এটি কেবল ক্রেতা-ভোক্তার রুচি-সংস্কৃতি-স্বাস্থ্য-সামর্থ্যের সঙ্গে জড়িত বিষয় নয়, পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তির ক্ষেত্রেও অতি জরুরি প্রশ্ন।
খাদ্য উৎপাদনের নামে আমরা ষাটের দশকের পর থেকে বহুপাক্ষিক ব্যাংক, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি এবং দাতা সংস্থার খবরদারিতে যেসব নিদারুণ ঘটনা ঘটিয়েছি, সেসব বিশ্লেষণও নতুন প্রজন্মকে জানা জরুরি। পারিবারিক কৃষি ঐতিহ্যের দেশে আজ তরুণ প্রজন্ম কৃষি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে। আজকের নতুন প্রজন্ম স্বাধীন উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী। তাহলে কৃষি ও খাদ্য উদ্যোক্তা হিসেবেও তরুণদের বহুজন এই খাদ্যব্যবস্থায় অবদান রাখতে পারে। খণ্ডবিখণ্ড হয়ে পড়ে থাকা জমিনগুলোকে চাঙ্গা করে তোলা দরকার। অধিক খাদ্য ফলানোর নামে আরেকটা সর্বনাশা ‘সবুজবিপ্লব’ এই সময়ে আমাদের দরকার নেই। কারণ এই ধরনের প্রকল্প মানুষসহ বাস্তুতন্ত্রের কারও খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিতে পারে না। এমনকি জেনেটিক ফসল বিক্রির করপোরেট ধান্ধাগুলোকেও প্রশ্ন করা জরুরি, এই সময়ে আমাদের নতুন কোনো ‘জীন বিপ্লবেরও’ দরকার নেই। দেশের মাটি-জল-হাওয়া আর প্রাণসম্পদের প্রতি আস্থা ও মমতা জাগানোই এখন টিকে থাকার মূল রসদ। দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা অগণিত লোকায়ত কৃষি কারিগরি আর প্রাণসম্পদ আমাদের ক্রান্তিকাল সামাল দিতে দারুণভাবে সহযোগিতা করতে পারে। উৎপাদন থেকে পরিবহন, বিপণন, মজুদ, বিক্রয়, পরিবেশন, বণ্টন, প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা বিনিময়; খাদ্যব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে দেশের সব নাগরিকের ঐক্যপ্রতিষ্ঠা জরুরি। বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের জনজীবন ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় খাদ্যের পরিসর এবং মানেও বৈচিত্র্যময়। এই বৈচিত্র্যকে শক্তি হিসেবে বিকশিত করা দরকার।
সচরাচর আমরা যখন খাদ্যের কথা বলি, তখন কেবলমাত্র মানুষের খাদ্য ও পানীয় নিয়েই কথা বলি। কিন্তু বাংলাদেশের গ্রামীণ নিম্নবর্গ খাদ্য বলতে কেবলমাত্র মানুষের নয়, গবাদি পশুপাখিসহ অপরাপর প্রাকৃতিক প্রাণবৈচিত্র্যের খাদ্য প্রসঙ্গটিও যুক্ত করেন। তারা মনে করেন, খাদ্য কেবলমাত্র একটিমাত্র একক প্রজাতির ওপর নির্ভর করে না, এর সঙ্গে অপরাপর প্রজাতিরাও জড়িত। অনেকে বলে থাকেন খাদ্য এক অব্যর্থ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মারণাস্ত্র। আবার বাংলাদেশের গ্রামীণ নিম্নবর্গের কাছে খাদ্য আপাদমস্তক এক সাংস্কৃতিক নির্মাণ ও বিনির্মাণও বটে। বাংলাদেশ ২০ হাজার ধানের জন্মভূমি। বেগুনের আদি উৎপত্তিস্থল। বহু কচুর জাত কেবল দেশেই আছে। ১৯৩৪ সালে দুনিয়ার প্রথম গভীর পানির ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরি হয় হবিগঞ্জের নাগুড়ায়। ১৮৮৪ সালে বেগুন নিয়ে প্রথম গবেষণা শুরু হয় জামালগঞ্জের চৈতন্য নার্সারিতে। খাদ্য উৎপাদনের নামে বাংলাদেশ কোনো দেশ বা কোম্পানির খেলার পুতুল হতে পারে না। এমনকি আমরা নিউলিবারেল ব্যবস্থার রোবটও না। খাদ্যব্যবস্থার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মকে নিতে হবে। নানা জটিল-কুটিল দখল, দূষণ ও দুর্বৃত্তায়ন থেকে আমার দেশের বৈচিত্র্যময় খাদ্যথালাকে মুক্ত করতে দায় ও দরদের রাজনীতিকে প্রশস্ত করতে হবে।