আহমাদ মোস্তফা কামাল
প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৪২ এএম
আহমাদ মোস্তফা কামাল
মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি সর্বাত্মক জনযুদ্ধে অসাধারণ বিজয় অর্জন এবং স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের ৫৩ বছর পরও একটি প্রশ্ন খুব জোরেশোরে উচ্চারিত হয়Ñ যে স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমরা ও-রকম এক মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, সেসব কি পূরণ হয়েছে? অবধারিতভাবে উত্তর আসেÑ না, হয়নি। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন, কী ছিল সেই স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা, যার জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধা করেনি কেউ, দেখবেন, দেশের অধিকাংশ মানুষ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে, উত্তর দেবে না। আপনার হয়তো মনে হবেÑ এ প্রশ্নের উত্তর তাদের জানা নেই। হয়তো বিস্মিত হয়ে ভাববেন, এ দেশের নিরস্ত্র-নিরীহ মানুষ পাকিস্তানিদের চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় যুদ্ধকে জীবন বাজি রেখে প্রতিরোধ করে স্বাধীনতার দুর্লভ সূর্য ছিনিয়ে এনেছে বটে, কিন্তু জানেই না যে, যুদ্ধটা কিসের জন্য! হয়তো এ-ও ভাববেন, একটি সর্বব্যাপী যুদ্ধের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার কথা এভাবে ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক নয়, বরং জনগণের যৌথ অবচেতনে তা স্থায়ীরূপে রয়ে যাওয়াই সংগত। কিন্তু আপনি যদি গভীরভাবে তাদের দিকে তাকান, যদি আপন হয়ে উঠতে পারেন তাদের, তাহলে দেখবেন, তারা কিছুই ভোলেনি এবং সত্যিই প্রজন্মান্তরে যুদ্ধের স্মৃতি, সাহস, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা তারা বয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে কিছু বলছে না। কেন বলছে না? ভয়ে, শঙ্কায় ও অবিশ্বাসের জন্য। কারণ যুদ্ধজয়ের পর থেকেই তাদের ভুলিয়ে রাখার সব রকম চেষ্টা করা হয়েছে, হচ্ছে এবং যারা এটি করেছে জনগণ আপনাকে ওই শ্রেণিভুক্ত বলেই ভেবেছে।

আমাদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা যে পূরণ হয়নি, তা স্বীকার করেন সবাই, এমনকি রাজনীতিবিদরাও, যাদের দায়িত্ব ছিল পূরণ করার। সেই ১৯৭২ সাল থেকে তারা বলে যাচ্ছেন, স্বাধীনতার সুফল/ফসল ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু সুফল বলি আর ফসল বলি, তা কেবল পৌঁছেছে সেই ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদ আর তাদের অনুগত গোষ্ঠীর ঘরে। অর্থাৎ কেবল নির্দিষ্ট একটি শ্রেণিই ভোগ করেছে সমস্ত সুফল ও ফসল, তাও কোনো বৈধ পন্থায় নয়, সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে। আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে, অবাধ চুরি-ডাকাতি-লুটপাট করে অগাধ বিত্ত-বৈভব-সম্পদের মালিক হয়েছে তারা, যার বড় একটি অংশ পাচার করে দিয়েছে বিদেশে। অন্যদিকে স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ শিকার করেছিল যে আমজনতা, তাদের ভাগ্যে কিছুই জোটেনি, বরং ধীরে ধীরে তারা পৌঁছে গেছে প্রান্তিক সীমানায়, খাদের কিনারে।
তা কী ছিল সেই স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা? স্বল্প পরিসরে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ যেহেতু নেই, সেজন্য বলি, আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যে প্রতিশ্রুতি জনগণকে দেওয়া হয়েছিল, সেখানেই জনগণের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি ছিল। পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছিলÑ বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি। অল্প কথায় কী অপূর্ব সুন্দর এবং তাৎপর্যপূর্ণ এক ঘোষণা! ভেবে দেখুন তো প্রিয় পাঠক, আমাদের জন্য কি সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? দেশে কি সামাজিক ন্যায়বিচার বলে কিছু আছে? আমরা কি মানবিক মর্যাদায় অভিষিক্ত? সবগুলোর উত্তরÑ না। এমনকি শব্দগুলোর গভীরতর অর্থ ও তাৎপর্যও আমরা ভুলতে বসেছি। রাষ্ট্র যেসব সুবিধা তার নাগরিকদের দেওয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তা সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে, এই হলো সাম্যের সহজ মানে। অর্থাৎ আপনার আর আমার সামাজিক অবস্থান-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-পেশা আলাদা হতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্র আমাদের আলাদা চোখে দেখবে না, বরং রাষ্ট্রের সুবিধাদি পাওয়ার অধিকার আমাদের সমান থাকবে। সামাজিক ন্যায়বিচার মানে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকারসমূহের সমবণ্টন। আর মানবিক মর্যাদা মানে মানুষ হিসেবে আপনার-আমার সম্পূর্ণ মর্যাদা পাওয়ার অধিকার। এর কোনো কিছুই আমরা পাইনি। তার মানে, আমরা স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে অনেক দূরে সরে এসেছি এবং সরে আসার জন্য জনগণের কোনো দায় নেই, দায় সম্পূর্ণভাবে শাসকগোষ্ঠীর এবং তাদের তাবেদারদের। তারা নিজেদের স্বার্থে জনগণের প্রাপ্য অধিকারসমূহকে অস্বীকার করে দেশে অবাধ লুটপাট-অন্যায়-অবিচার-অনাচার-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছে। আর নিজেদের এইসব অপকর্মকে জায়েজ করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যবহার করেছে ঢাল হিসেবে। সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাপার হলো, জনগণকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, মুক্তিযুদ্ধ কোনো ব্যক্তি বা দলের একক যুদ্ধ ছিল না, বরং ছিল এক সর্বাত্মক জনযুদ্ধ, দেশের সব মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সমর্থনেই এসছে বিজয়, এসেছে স্বাধীনতা। ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই বিজয়ের মালিকানা জনগণের, স্বাধীনতার মালিকানা জনগণের, দেশের মালিকানা জনগণের, রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের। বলার অপেক্ষা রাখে না, জনগণের সঙ্গে সবচেয়ে বড় প্রতারণাটি করেছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দলটি। তারা মুখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলত, কিন্তু অন্তরে বিন্দুমাত্র ধারণ করত না। পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার তো বুলিই হয়ে গিয়েছিল, ‘আমার বাবা দেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন’। শুধু তার বাবা? আর কারও কোনো অবদান ছিল না? ত্যাগ-তিতিক্ষা ছিল না? যদি না-ই থাকে তাহলে তিরিশ লাখ শহীদকে আমরা কোথায় রাখব? দুই লাখ নির্যাতিত নারীকেইবা কোথায় স্থান দেব? কোথায় রাখব কোটি কোটি মানুষের অবিশ্বাস্য ত্যাগ ও তিতিক্ষাকে? শেখ হাসিনা কেবল ভুলিয়ে দিয়েই ছাড়েননি, তিনি তার অপরিসীম দম্ভ, অহংকার আর রূঢ়তা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, এ দেশকে তিনি পৈতৃক সম্পত্তি মনে করতেন এবং জনগণকে মনে করতেন তার দাস। জনগণকে ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা দিতেও রাজি ছিলেন না তিনি, ন্যায়বিচারের বদলে তিনি উপহার দিয়েছিলেন অভাবনীয় স্বেচ্ছাচারিতা, এমনকি উচ্চ আদালতের রায়ও ছিল তার ইচ্ছাধীন, আর সাম্যকে তিনি পরিণত করে নিয়েছিলেন নিপীড়নমূলক বৈষম্যে। তার এবং তার দলবলের স্বেচ্ছাচারিতা, চুরিচামারি, লুটপাট, গুম, খুন, ধর্ষণ, ভোট চুরিÑ এসব নিয়ে কথা বলতে গেলেই তাকে ট্যাগ দেওয়া হতো রাজাকার বলে। অর্থাৎ, হয় আপনি তার/তাদের সমস্ত অপকর্মের পক্ষে থাকবেন, অথবা রাজাকার পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকবেনÑ এ রকম এক দুঃসহ অবস্থা তৈরি করেছিলেন তিনি এবং তার অপকর্মের সহযোগীরা। কিন্তু এই অপমান আর অসম্মান জনগণ মেনে নেয়নি, এক সর্বব্যাপী গণঅভ্যুত্থানে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের পর জনগণ বারবার আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তাদের অধিকার ফিরে পেতে চেয়েছে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান আর চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে দুটো মাইলফলক হয়ে থাকবে। নতুন এক বাস্তবতার ভেতরে এখন দেশ। আওয়ামী লীগ যথারীতি তাদের পুরোনো বয়ানে এই গণঅভ্যুত্থানকে স্বাধীনতা-বিরোধী চক্রান্ত হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু লাভ হচ্ছে না। তাদের নিপীড়নের প্রমাণ এখন শত শত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ছড়িয়ে আছে। মানুষ জানে, কীভাবে তাদের সেই অপপ্রচারের জবাব দিতে হয়।
নতুন এই পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী? মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাতিঘর, যেকোনো সংকটে মুক্তিযুদ্ধই আমাদের পথ দেখাবে। সুতরাং, এই মুহূর্তের করণীয় হলো, স্বাধীনতার ঘোষণার কাছে ফিরে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা-দেশ-রাষ্ট্র এসব কিছুর মালিকানা জনগণকে বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাই এখনকার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। একটা কথা মনে রাখা দরকার, সাম্য না থাকলে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘকালের অপশাসনে আমাদের সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। সেজন্যই এত অস্থিরতা চারদিকে, এত বিকার, এত উগ্রতা।
এই নতুন সময়ে দাঁড়িয়ে প্রত্যাশা করি, দেশের মানুষ তাদের মানবিক মর্যাদা ফিরে পাক, সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক। দেশে একটা অবাধ এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হোক। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিক। যারাই নির্বাচিত হবেন তারা যেন মনে রাখেন, ‘শাসনক্ষমতা’ নয়, তাদের দেওয়া হয়েছে ‘রাষ্ট্র পরিচালনা’র দায়িত্ব। আমরা আর শাসক ও শাসন দেখতে চাই না, দেখতে চাই যোগ্য পরিচালক ও জনবান্ধব সরকার।