× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্পাদকীয়

সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের আলো ছড়াক

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:০৩ এএম

সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের আলো ছড়াক

‘...এই কালো রাত্রির সুকঠিন অর্গল / কোনোদিন আমরা যে ভাঙবই / মুক্ত প্রাণের সাড়া জানবোই। / আমাদের শপথের প্রদীপ্ত স্বাক্ষরে / নূতন সূর্যশিখা জ্বলবেই ’ Ñ কবি ও গীতিকার সিকান্‌দার আবু জাফর-এর ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’ শিরোনামে গানের এই স্বরলিপি একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছিল। বাঙালি জাতি সেই সূর্যশিখা জ্বালিয়েছিল একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্বে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। বাঙালি জাতির গৌরব এবং ইতিহাসে বাঁকপরিবর্তনের আলোকোজ্জ্বল দিন ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে আমরা তাদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি যাদের আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের ফসল এই রক্তস্নাত বাংলাদেশ। যাদের ত্যাগে অর্জিত এই বিজয় তাদের এবং সব বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতিও জ্ঞাপন করি শ্রদ্ধা। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত বিস্তৃত এবং ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বাঙালির সংগ্রাম-আলেখ্যর ধারাবাহিকতার অর্জন এই বিজয়। 

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একাত্তরের পঁচিশ মার্চ কালরাতে নিধনযজ্ঞর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের সহায়তায় বর্বরতা-পৈশাচিকতার যে নিষ্ঠুর অধ্যায়ের সূচনা করে তা ব্যাপ্ত ছিল মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসব্যাপী এবং হানাদার বাহিনী তাদের নিশ্চিত পরাজয় জেনে ১৪ ডিসেম্বর জাতিকে মেধাশূন্য করতে চূড়ান্ত বর্বরতার নিদর্শন রাখে। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর রক্তগঙ্গা পেরিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পর নবপ্রত্যয়ে যে যাত্রা আমাদের শুরু হয় সেই পথটিও নিষ্কণ্টক ছিল না। স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে নিকষ অন্ধকার বহুবারই জেঁকে বসেছে। একটানা দীর্ঘদিন শাসনের নামে কুশাসনের মধ্য দিয়ে রক্তস্নাত বাংলাদেশকে বারবার পশ্চাৎমুখী করার চক্রান্তও কম হয়নি। নজির আছে, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে অনেক নগ্নতারও। জুলাই-আগস্ট ২০২৪, যে প্রেক্ষাপট তৈরি করে এবং যে প্রত্যয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে চূড়ান্তরূপে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে বিগত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বাধ্য করে, এর পেছনের কারণগুলোও সচেতন মানুষের অজানা নয়। 

ঘাত-প্রতিঘাত-প্রতিকূলতার পথ মাড়িয়ে ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার যে অঙ্গীকার ধারণ করে রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করে সেই অঙ্গীকারগুলোও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে নয়। আমরা মনে করি, সাম্যর ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় স্বাধীন দেশে বারবার হোঁচট খেয়েছে এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে উদযাপিত বিজয় দিবসে সেই প্রত্যয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আরও শানিত হবে। আমরা বিশ্বাস করি, রাজনীতির নীতিনির্ধারকরা পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে জন-আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার নিরিখে পথচ্যুত রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনবেন রাষ্ট্র ও জনকল্যাণের পথে। আমাদের ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে যেমন রয়েছে অনেক গৌরবগাথা-উপাখ্যান, তেমনি রয়েছে বেদনাকাতর অধ্যায়ও। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জনরায়ে রাজনীতিকদের স্কন্ধেই দেশ পরিচালনার ভার অর্পিত হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা এও দেখেছি, রাজনীতির মাধ্যমে হীনস্বার্থ চরিতার্থের জন্য রাজনীতিকরা ৫৩ বছরের এই বাংলাদেশে কদাচার-অনাচার-দুরাচারের অনাকাঙ্ক্ষিত অধ্যায়ও কম তৈরি করেননি। জুলাই-আগস্ট প্রেক্ষাপট এরও নিরসনের পথ খুলে দিয়েছে।

আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধপর্ব নিয়ে আলোচনায় নিমগ্ন হই তখন সংগত কারণেই কিছু বিষয় আমাদের নতুন করে নাড়া দেয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতা অর্জনের পর আমরা পাঁচ দশকেরও বেশি সময় কাটিয়ে এসেছি বটে কিন্তু স্বাধীনতার সুফল সবার ঘরে সমভাবে পৌঁছেনি। বৈষম্যের ছায়া এখনও অনেক বিস্তৃত এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ-চেতনা পরিপন্থি অনেক কিছুই যখন কখনও কখনও অনভিপ্রেতভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে তখন জিজ্ঞাসার তালিকা আরও দীর্ঘ হয়। অনস্বীকার্য যে, মুক্তিযুদ্ধপর্ব বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অধ্যায়। কিন্তু সেই অধ্যায়ের চেতনার সড়ক ধরে আমরা লাখ লাখ আত্মত্যাগী মুক্তিকামী মানুষের স্বপ্ন কতটা পূরণ করতে পেরেছি, এই প্রশ্নও সামনে আসে। কিন্তু আমরা এখন সব প্রশ্ন চাপা দিয়ে সংস্কারের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে চাই সামনের দিকে। অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাঠামো কিংবা প্রতিষ্ঠান সংস্কারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বেশ কিছু সংস্কার কমিশন গঠন করেছে এবং এই কমিশনগুলোর কার্যক্রম চলমান। আমাদের দাবি, যথাযথ সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থার ঔজ্জ্বল্য ফিরিয়ে আনা হোক, যার সুফল জনগণ ভোগ করতে পারে। নাগরিক সেবার প্রতিটি স্তরে এবং অধিকারের ক্ষেত্রে সমতল মাঠ নিশ্চিত করা যেমন জরুরি তেমনি রাষ্ট্র পরিচালকসহ রাজনীতিকদের আত্মোপলব্ধি এবং একই সঙ্গে আত্মজিজ্ঞাসার প্রয়োজনে আরও সজাগ ও দায়িত্বশীলতার তাগিদও সামনে আসে। রাজনীতির নামে অপরাজনীতি তো বটেই একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক স্তম্ভে কুঠারাঘাতের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে দেওয়ার কিংবা অকার্যকর করার যে অপপ্রয়াস দীর্ঘদিন চলেছে এরই দায় বহন করছে দেশের রাজনীতি। আজকের প্রেক্ষাপটে এসবই আত্মজিজ্ঞাসার কারণ বটে। 

স্বাধীনতা-উত্তর পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে আমাদের অর্জন কম নয় কিন্তু এও সত্য, অনার্জন রয়ে গেছে আরও অনেক কিছু, তেমনি বিসর্জনের খতিয়ানও কম দীর্ঘ নয়। বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক, অনুশীলনের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে পরিশীলিত বাংলাদেশ তো বটেই, এমনকি অনিয়ম-দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার ক্ষেত্রেও অনার্জন অস্বীকার করা যাবে না। এই প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কিংবা ব্যবস্থার পথ সুগম করা সময়ের দাবি। আমরা মনে করি, দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তাতে রাষ্ট্র বিনির্মাণের একটি নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রের ও জনস্বার্থের বিষয়গুলো অগ্রগণ্য রেখে বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পাশাপাশি স্বচ্ছ নির্বাচনী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে জনরায়ে নির্বাচিত সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার পথ সুগম করতে যা কিছু করণীয় এর পরিসমাপ্তিতেই যেতে হবে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় উত্তরণে। আমরা জানি, মূল্যস্ফীতি-জননিরাপত্তাহীনতাসহ বেশ কিছু কারণে জনজীবন সংকটের মুখে পড়েছে। 

আমরা আশা রাখতে চাই, বিদ্যমান বাস্তবতার চুলচেরা বিশ্লেষণে সরকারসহ রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মধারা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যে স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল, শহীদদের আত্মত্যাগের পেছনে যে স্বপ্ন ছিল, এর কতটা আমরা পূরণ করতে পেরেছি, কতটা পারিনি এই আত্মজিজ্ঞাসার দায় ভুলে গেলে চলবে না। মানবতাবিরোধী যেকোনো কর্মকাণ্ড যেকোনো দেশের নাগরিক সমাজের জন্য অত্যন্ত মর্মন্তুদ অধ্যায়ের সৃষ্টি করে। আমরাও এই পরিস্থিতিতে বহুবার নিপতিত হয়েছি। কিন্তু পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণের যে পথ খুলেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মশাল নিয়ে সেই পথে যেন আমরা হাঁটতে পারি তা-ও সমগুরুত্বেই মনে রাখা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি। 

সাম্প্রদায়িকতা-বৈষম্য ও বিভেদের ছায়া দূর করতে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলরা যেন যথাযথ ভূমিকা পালনে তাদের দায়বদ্ধতার কথা ভুলে না যান; জুলাই-আগস্ট ২০২৪, নবজাগরণ সেই তাগিদও ফের দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল সবাইকে স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। দায় ও দায়িত্ব পালনে অধিকতর নিষ্ঠ হতেই হবে। মহান বিজয় দিবসে আমাদের পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, এজেন্ট, লেখক, হকার ভাইসহ শুভানুধ্যায়ী সবার প্রতিই শুভেচ্ছা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা