× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিজয় দিবস

ফিরে দেখা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

অরূপরতন চৌধুরী

প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৪০ এএম

অরূপরতন চৌধুরী

অরূপরতন চৌধুরী

‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ ইতিহাসসমৃদ্ধ, গৌরবোজ্জ্বল একটি নাম। বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা একটি প্রতিষ্ঠান। যুদ্ধে বাংলার যোদ্ধাদের মনোবলকে উদ্দীপ্ত করতে এবং যুদ্ধে দিকবদলের পালে হাওয়া দিয়েছে এই বেতার কেন্দ্র। অপরদিকে শত্রুপক্ষের মনে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়া শব্দবুলেট ছুড়ে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রাখা মুক্তিযুদ্ধের একটি সেক্টর হলোÑ ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। সাধারণ মানুষ থেকে যোদ্ধারা অধীর আগ্রহ নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান, সংবাদের জন্য অপেক্ষায় থাকত।

পাকিস্তানি জল্লাদবাহিনীকে বাংলার পবিত্র মাটি থেকে বিতাড়িত করার জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি যে যুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সাহস জুগিয়েছে, সাড়ে ৭ কোটি বাঙালিকে অনুপ্রেরণা এবং হানাদার বাহিনীকে সর্বক্ষণ রেখেছে ভীত-সন্ত্রস্তÑ তা হলো ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’। আর এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাক সরকারের দখলকৃত এলাকার ৬টি বেতার কেন্দ্র থেকে অবিরাম প্রচণ্ডভাবে মুক্তিযোদ্ধা ও বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে ভয়াবহভাবে মিথ্যাচার এবং অপপ্রচার চালানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে জবাব দেওয়া হয়েছে একমাত্র বেতার কেন্দ্র থেকে। মুক্তিযুদ্ধ-বিরুদ্ধ অপপ্রচারের বিরুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল শক্তিশালী একটি প্ল্যাটফর্ম। এই বেতার কেন্দ্রে তখন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যথার্থ না থাকলেও বেতার কেন্দ্রে প্রত্যেকের উদ্যম ছিল। বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িটির দোতলার ছোট কক্ষটিতে (যেখানে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ থাকতেন) দুটি ভাঙা টেপরেকর্ডার, সীমিতসংখ্যক বাদ্যযন্ত্র, কতিপয় যন্ত্রশিল্পী, চাদর টাঙানো রেকর্ডিং রুমেই চলে রেকর্ডিংয়ের কাজ। দুটি কক্ষে গাদাগাদি করে প্রায় ৭০ জন রাত্রী যাপন করতাম। 

রক্তক্ষয়ী ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে দেশের অজস্র বীর সন্তান অকাতরে জীবন দিয়েছেন। তাদের এ অবদান অবিস্মরণীয়। দেশমাতৃকা স্বাধীন করতে জীবনকে তুচ্ছ ভেবে শত্রুর মোকাবিলায় তারা অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। এমনও কিছু মুক্তিযোদ্ধা আছেন যারা অস্ত্র হাতে তুলে নেননি কিন্তু তাদের কণ্ঠ, তাদের আওয়াজ মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের মুক্তি সেনানীদেরকে, আমাদের স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণকে এগিয়ে নিয়েছেন। অনুপ্রেরণা আর উৎসাহ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সফলতায় ভূমিকা রেখেছেন। দেশকে স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন তারা হলেনÑ স্বাধীন বাংলা বেতারের শব্দ সৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা।

প্রথম পর্যায়ে চট্টগ্রাম বেতারের কালুরঘাট ট্রান্সমিটারে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র সংগঠিত হয়েছিল চট্টগ্রাম বেতারের দশজন নিবেদিত কর্মী (দুজন বেতার কর্মী ছিলেন না), স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, জনগণ এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সহযোগিতায়। এই বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের ১০ জন সার্বক্ষণিক সংগঠক ছিলেন সর্বজনাব বেলাল মোহাম্মদ, আব্দুল কাশেম সন্দ্বীপ, সৈয়দ আব্দুল শাকের, আব্দুল্লাহ আল ফারুক, মোস্তফা আনোয়ার, রাশেদুর হোসেন, আমিনুর রহমান, শারফজ্জামান, রেজাউল করিম চৌধুরী এবং কাজী হাবিব উদ্দিন। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন বেলাল মোহাম্মদ।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণের পর প্রবাসী সরকার কাজ শুরু করে। ১৯ এপ্রিল এই সরকারের মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে আব্দুল মান্নানকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ২৪ মে দুটি রেকর্ডার মেশিন এবং মাত্র ১টি মাইক্রোফোন দিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৫ মে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে কলকাতার ২৫ মাইল দূরে ৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রে কোরআন তেলাওয়াত ও বক্তৃতার মাত্র ১০ মিনিটের প্রচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বেতারের অস্তিত্বের প্রকাশ ঘটে। মিডিয়াম ওয়েভ ৩৬১.৪৪ মিটার ব্যান্ডে সেকেন্ড প্রতি ৮৩০ কিলোসাইকেলে প্রতিধ্বনিত হয় এটি। শুরুতে কেন্দ্রটিকে বেশ সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত অত্যধিক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল ‘চরমপত্র’। এ ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের গান, যুদ্ধক্ষেত্রের সংবাদ, রণাঙ্গনের সাফল্য কাহিনী, সংবাদ বুলেটিন, ধর্মীয় কথিকা, বজ্রকণ্ঠ, নাটক, সাহিত্য আসরসহ কিছু অনুষ্ঠান পরিধি বেড়ে দৈনিক ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত নিয়মিত প্রচার হতো। আর এই বেতার কেন্দ্রের একজন কণ্ঠ সৈনিক ছিলাম আমি। যার জন্য নিজেকে গর্বিত মনে করি।

স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য প্রথমে যাই আগরতলা, সেখানে কলেজটিলায় গণসংগীতের একটি দল, যারা ইতোমধ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু করেছে। সেখানে এক মাস থাকি। কাজ ছিল প্রতিদিন সন্ধ্যায় মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য দেশাত্মবোধক, উদ্দীপনামূলক গান শোনানো। এরপর পল্লীগীতি শিল্পী মরহুম সরদার আলাউদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে আগরতলা থেকে কলকাতায় ৫৭/৮, বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পৌঁছি। সেখানে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গান শুরু করি।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এবং সেখানে রেকর্ডকৃত বেশিরভাগ গানেই আমার কণ্ঠ আছে। এই সময় পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, নোঙর তোলো তোলো, ও আমার দেশের মাটি, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি ইত্যাদি দেশের গান গাওয়া হতো দলবেঁধে। বিভিন্ন মুক্তিযুদ্ধ কলকাতায় ক্যাম্পে প্রখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে আমরা গান গাইতাম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হলো, স্বাধীন বাংলা বেতারে একদিন প্রখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী হরলাল রায় আমাকে দিয়ে একটি দ্বৈত সংগীত গাওয়ালেন নাসরিন আহম্মদ শীলু আপার সঙ্গে। গানটির কথা ছিল ‘জ্বলছে জ্বলছে প্রাণ আমার দেশ আমার’, গানটি লিখেছিলেন গীতিকার শহিদুল ইসলাম। এই গানটি ছিল আমার গাওয়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রথম দ্বৈত সংগীত। গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারের দিন প্রথমবারের মতো আমার নাম ঘোষণা করা হয়। দিনটি ছিল ২১ অক্টোবর ১৯৭১, দ্বিতীয় অধিবেশনে গানটি প্রচার হয় এবং সেই দিনই আমার বাব-মা বাংলাদেশ থেকে জানতে পারেন আমি জীবিত আছি, এটা আমার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ১৯৭১ সালের ২৫ মে মুজিবনগর থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু করে, যা ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রর এই অবদানের কথা যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি এই বেতার কেন্দ্রের সকল শিল্পী কলাকুশলীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি ও যুদ্ধে তাদের ভূমিকা প্রশংসনীয় ও সকল পর্যায়ে সমাদৃত। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠানসমূহ সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধাদের মনে আশার আলো সঞ্চার করেছিল। এই বেতার কেন্দ্র দীর্ঘ ৯ মাস অমিত তেজ ও তেজস্বিনী ভাষা আর দৃপ্তকণ্ঠে দুর্বার অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে বাংলা ও বাঙালির অতন্দ্রপ্রহরী ‘মুক্তিযোদ্ধাদের’ সার্বক্ষণিত অনুপ্রেরণা, শক্তি ও সাহস দিয়ে দিশাহারা মুক্তিকামী বাঙালি জাতিকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে।

একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করেছে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি যখন পাক-হানাদার বাহিনীর আক্রমণে দিশাহারা, শোকাতুর, কামানের গোলায় পুলিশ লাইন ভস্মীভূত এবং যখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ই-পি-আর-এর কিছু বঙ্গশার্দুল স্ব স্ব দায়িত্বে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন, অন্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছিলেন প্রতিরোধ সংগ্রামে, ঠিক তখনই জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র। এই বেতার কেন্দ্রের প্রথম অনুষ্ঠান শোনামাত্র বহু বাঙালি অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। সে অশ্রু ছিল আনন্দের, স্বস্তির, গৌরবের। বাঙালি আবার উঠে দাঁড়াল গভীর আত্মবিশ্বাসে। বীর মুক্তিযোদ্ধারা পেলেন শত্রুর ওপর আঘাত হানার নতুন প্রেরণা।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলার ইতিহাসে ইতোমধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতারের সকল কর্মী তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন। নতুন প্রজন্ম যেন তাদের কথা ভুলে না যায় সেজন্য স্বাধীন বাংলা বেতারের গান, নাটক, কবিতা, সংবাদ যা এখনও আমাদের মনকে, স্মৃতিকে আন্দোলিত করে সেগুলো যথাযথ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। ২০১৮ সালে কলকাতার ৫৭/৮ বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডে বেতার কেন্দ্র ভবনটি দেখতে গিয়েছিলাম এবং অবাক হয়ে দেখলাম, আজও বীরদর্পে মাথা উঁচু করে ঠিক সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভবনটি।’ বয়সের ভারে মলিন হয়েছে রঙ, আশপাশে উচ্চ ভবনের পাশে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মূল ভবনটিকে ছোট মনে হয়। কিন্তু, আমাদের হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা অনন্য এই স্থাপনাটির অবস্থান আজীবন আকাশ সমান!

নতুন প্রজন্মের কাছে যেন সেই কথা, আমাদের সেই অনুভূতি যেন অব্যক্ত থেকে না যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধে এই কেন্দ্রটির অসামান্য অবদান ইতিহাসের আড়ালে যেন চাপা না পড়ে। এজন্য বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের তরফ থেকে ভবনটির যথাযথ সংরক্ষণ ও মুক্তিযুদ্ধের দলিল হিসেবে এটি জাদুঘরে রূপান্তর করা প্রয়োজন। যাতে আগামী প্রজন্ম মহান মুক্তিযুদ্ধে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের’ সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে।

  • বীর মুক্তিযোদ্ধা, একুশে পদকপ্রাপ্ত শব্দসৈনিক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা