সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৩৭ এএম
ষড়ঋতুর এই দেশে প্রকৃত ঋতুচরিত্রের পরিবর্তন অনেকাংশেই ইতোমধ্যে ঘটেছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে। এর ফলে আমাদের হতে হচ্ছে বহুমাত্রিক সমস্যা-সংকটের মুখোমুখি। এর বিরূপ প্রভাব যে শুধু জনজীবনেই পড়েছে তা নয়, আমাদের অন্যতম প্রধান অবলম্বন কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায়ও অভিঘাত ফেলেছে। ঋতুবৈচিত্র্যের চরিত্রগত পরিবর্তনের কারণে আমরা কী পরিস্থিতিতে পড়েছি তা কখনও কখনও খুব উদ্বেগজনকরূপে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। চলছে শীতকাল কিন্তু শীতের তীব্রতা ঋতুর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এখনই এত প্রকট হয়ে ওঠার কথা নয়, যা পৌষ-মাঘ মাসে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ১৪ ডিসেম্বর এই বার্তাই উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়, রাজশাহী ও চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ বইছে এবং তা আরও বাড়তে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, জানুয়ারিতে তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রিতে নামতে পারে। গত বছরের চেয়ে এবার যে শীত বেশি, তা এরই মধ্যে অনুভূত হয়েছে। গত বছরের এ সময় তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এবার একই সময়ে তাপমাত্রা ১-২ ডিগ্রি কমেছে।

আমরা মনে করি, আবহাওয়া অধিদপ্তরের বার্তা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রেখে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা প্রয়োজন। দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের জীবনযাপন এমনিতেই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থায় পড়েছে। মূল্যস্ফীতিসহ নানারকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষে স্বাভাবিক জীবনযাপন যেখানে কঠিন সেখানে তীব্র শীতে তাদের আত্মরক্ষা অত্যন্ত কঠিন। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের তাদের সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। মানবিক উদ্যোগে আমাদের সমাজে অনেক ভালো কাজের নজির রয়েছে। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে অনেকের হাত যেমন প্রসারিত হয়েছে বিপন্নদের দিকে, তেমনি যেকোনো বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলায় যূথবদ্ধ প্রয়াসও দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়েছে। আমরা আশা করি, কঠিন সময়ের আগাম বার্তায়ও সমাজ সচেতনসহ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি ব্যক্তি উদোগ্যের প্রচেষ্টা গতিশীলতা পাবে।
আমরা মনে করি, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের মাধ্যমে পরিস্থিতি অধিকতর খারাপ হতে পারে সেই এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দরিদ্র ও ছিন্নমূল মনুষের কল্যাণে এখনই প্রস্তুতি শুরু করা দরকার। পাশাপাশি যেসব এলাকায় শৈত্যপ্রবাহ বইছে সেইসব এলাকায় শীতবস্ত্র বিতরণের সঙ্গে সঙ্গে বিপন্নদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতামূলক কার্যক্রম চালানো উচিত। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে, উত্তরাঞ্চলের অনেক মানুষের প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রও নেই শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। আমাদের আশপাশেও এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। সড়কের পাশে, বাস ও ট্রেন স্টেশনে, বাজার-ঘাটে রাতের বেলা এমন অনেক অসহায় মানুষকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। অনেকের সময় যখন কাটে সুখ নিদ্রায়, তখন ছিন্নমূল কিংবা হতদরিদ্র মানুষের রাত কাটে নির্ঘুম অবস্থায় শীতের প্রকোপে জবুথবু হয়ে। যার পেটে ভাত নেই তার গায়ে গরম কাপড় কিংবা শীতবস্ত্র জুটবে কোত্থেকেÑ এমন প্রশ্ন আমাদের সমাজে নতুন নয়। এই প্রেক্ষাপটে মধ্যবিত্তরাও করতে পারেন অনেক কিছু। অসহায়দের প্রতি তাদেরও রয়েছে কিছু নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের উপার্জিত অর্থের সামান্য পরিমাণও যদি অসহায়দের জন্য আমরা বরাদ্দ করি তাহলে বিন্দু বিন্দু সে দান শীতার্তদের কষ্ট লাঘবে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে। বড় অঙ্কের অর্থ দান মুখ্য কথা নয় । আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সঙ্গে অল্প দানও অনেক মূল্যবান। তা ছাড়া আমাদের অতিরিক্ত শীতবস্ত্র দান করার মাধ্যমেও আমরা তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি।
আমরা মনে করি, সবচেয়ে জরুরি হলো যথাযথ উদ্যোগ ও পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নে যূথবদ্ধ প্রয়াস। শীতার্ত মানুষের সাহায্যার্থে প্রথমে এগিয়ে আসার কথা রাষ্ট্রের। নানা সংস্থা, সংগঠনকেও শীতার্ত অসহায় মানুষের পাশে এগিয়ে আসতে হবে। সংবাদমাধ্যম তাদের খুঁজে বের করার উদ্যোগ নিতে পারে। দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিত্তশালীদের। শীতজনিত রোগব্যাধি থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই। যার যার জায়গা থেকে আমরা সবাই যতটুকু সম্ভব মানবতার পাশে দাঁড়ালে পথে-ঘাটে মানুষের আর্তনাদ বহুলাংশে অদৃশ্যমান হবে। শীতার্তদের পাশে দাঁড়ানো মানুষের নৈতিক দায়িত্ব হয়ে উঠুক। মানুষ মানুষের জন্যÑ এই সত্যের আলো ঘুচাক বিদ্যমান সামাজিক ও মানবিক সংকট।