প্রজন্মের ভাবনা
তানভীর হাসান তপু
প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:২৬ এএম
ঋতুরাজ বসন্তের আগে শীতবুড়ি আসে আরও আড়ম্বর নিয়ে। এই শীতে লুকিয়ে আছে বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি। মাঘ মাসে সারা দেশে তথা গ্রামবাংলার সবুজ ধানপাতা ছড়ায় তার রঙের অপূর্ব সমারোহে। আর সেই সবুজের হিল্লোলে দিশাহারা হয়ে কবিরা বার্তা প্রেরণ করে তার কবিতার মাধ্যমে। তেমনি কুয়াশার আস্তরণ মাড়িয়ে শীতার্ত কিষান রাত পোহানোর আগেই পৌঁছে যায় মাঠে। ধানপাতার গন্ধ ম-ম করে প্রান্তরের বাতাস, হরেক রকমের শাকসবজি রঙে-রঙে ভরে ওঠে গ্রামবাংলা ও শহরের আনাচে-কানাচে। এই হিমশীতল প্রকৃতির গর্ভে অঙ্কুরিত হয় বসন্তের ভ্রূণ। এদেশের গ্রামাঞ্চলে অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিনের সঙ্গে মিশে আছে নবান্ন উৎসব। শীতের সকালে পিঠ পেতে রোদ পোহানোর দৃশ্য ভুলে না যাওয়ার মতো। দেশে ঋতুবৈচিত্র্যের রয়েছে এক নৈসর্গিক গর্বিত ঐতিহ্য।
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি ও টিভি চ্যানেল সংস্কৃতির যুগে আগের মতো না হলেও আমাদের বিনোদনের একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে যাত্রা ও পালাগানের আবেদন একেবারেই ফুরিয়ে যায়নি তা আমরা টের পাই শীত এলেই। শীত এলেই যাত্রা ও পালাগানের শিল্পীরা বেরিয়ে পড়ে গ্রামের পথে-প্রান্তরে, এমনকি অনেক শহর-বন্দরেও যাত্রা উৎসবের শুরু হয়। বাংলা ভাষা সাহিত্যে, কাব্যে গানে কবিতায় নাটকে চলচ্চিত্রে শীতের পিঠা এবং মেয়ে জামাইকে শীতের পিঠার নিমন্ত্রণের পালা নানা অনুষঙ্গে যোগ হয়েছে। দিনে দিনে এর পরিধি বেড়েছে। এখন শুধু পিঠাকে কেন্দ্র করে উৎসব আয়োজন হয় আমাদের আবহমান সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে সবার মাঝে তুলে ধরার জন্য। ঢাকাসহ সারা দেশেই শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় পিঠা উৎসবের প্রস্তুতি। বিভিন্ন জায়গায় পিঠা উৎসবের আমেজ নিয়ে বাহারি, মজাদার পিঠা খাওয়ার জমজমাট আয়োজন করা হয়। পাটিসাপটা, দুধকুলি, ভাজাকুলি, নারিকেলি, ভাপা, চিতই, নকশিপিঠা ইত্যাদি। শীতে দুধে ভেজানো পিঠা কার রসনাকে উসকে না দেয়! একসময় পিঠা ছিল গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। কালের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এখন তা শহরের বিলাস খাদ্যে নাম লিখিয়েছে। ফুটপাত থেকে নামি-দামি খাদ্যভাণ্ডারে এখন দেখা যায় পিঠার বিশেষ মেন্যু, বিশেষত শীতকালে। একসময় পিঠার পাশাপাশি মোয়া, মুড়কি, লাড্ডু, বরফি ছিল প্রায় অনিবার্য পদ।
বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে একসময় শীতকালে অনেক ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। এ সময় গ্রামবাংলায় শীতসন্ধ্যায় কেচ্ছা বলার ধুম পড়ত। জারি, সারি, বাউল, হাছন রাজার গানের আসর বসত পাড়ায় পাড়ায়। পাঠের সুর হিমেল বাতাসে ছড়িয়ে পড়ত গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। তখন অবশ্য গ্রামবাংলার উঠানে-উঠানে বসত ‘বিষাদ সিন্ধুর’ পাঠের আসর, রাতভর মারফতি, মুর্শিদি গানের সেই শীত তাড়ানো আনন্দ এখন বিরল। এখন আর শীতের মধ্যরাতে কবিয়ালদের ঢাক-ঢোলক ছন্দে মুখর হয় না। একসময় উত্তর বাংলার গম্ভীরা গান ছিল শীত ঋতুর প্রধান বিষয়। গ্রামবাংলার শীত সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান বিষয় ‘যাত্রাপালা’ এবং ‘নাটক’। শীতের শুরু থেকে সাড়ম্বরে চলত আয়োজন। পাড়ায়-পাড়ায় জমে উঠত যাত্রা-নাটকের রিহার্সেল। খড়ের বিছানায় বসে রাতভর যাত্রা দেখতেন দর্শকরা। এখন যাত্রাপালা নেই বললেই চলে। কিছুটা শহুরে আদলে নাট্য মঞ্চস্থ হয়। এই শীতের দাপট ও কিছুটা রুক্ষতার কথা বাদ দিলে শীত আমাদের সবার কাছেই প্রিয় ঋতু। এই ঋতুতে আমরা নিজেদের সাজাই অন্যরূপে। এই সময়টাতে গোলাপ, বেলিফুল, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, বকুল, চামেলির সৌরভ ও সৌন্দর্য ফুটে ওঠে শীতের ছোঁয়ায়।