বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক
ইমতিয়াজ আহমেদ
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:৩৯ পিএম
ইমতিয়াজ আহমেদ
বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সব সময়ই যে ঊর্ধ্বমুখী ছিল এমনটি বলার অবকাশ কম। স্বাধীনতার পর বিগত ৫৩ বছরে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের উঠাপড়া পরিলক্ষিত হয়েছে। এ কথা সত্য, মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারত প্রত্যক্ষভাবে আমাদের সহযোগিতা করেছে। একাত্তরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন একাত্তরে দেশ বধ্যভূমিতে পরিণত করার কাজে মত্ত, তখন ১ কোটির বেশি শরণার্থীকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। ভারতেই মুজিবনগর সরকার তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। স্বাধীনতার পরও ভারতের সঙ্গে কয়েক বছর সুসম্পর্ক বজায় থাকে যা আবার ১৯৭৫ সালে অবনতির দিকে গড়ায়। এরপর দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং নানা ঘটনার পালাক্রমে ভারতের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কখনও অবনতি, আবার কখনও সামান্য ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। মূলত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে এক ধরনের আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং এ সম্পর্ক ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছিল। তখন আওয়ামী লীগের সঙ্গেই ভারতের বিশেষ সম্পর্ক ছিল। একটি বিশেষ দলের প্রতি তাদের পক্ষপাতিত্বও দৃশ্যমান হয়েছে নগ্নভাবে।
এ ধরনের সম্পর্ক গড়ার কারণে বিগত ১৫ বছরে ভারতের সঙ্গে বিরোধী দল, অন্য রাজনৈতিক দল বা সংগঠন এবং বাংলাদেশের মানুষের কোনো সরাসরি সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। গড়ে ওঠেনি বলেই জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরও তারা নিজস্ব ন্যারেটিভে বিচার করে গেছে সব ঘটনাক্রম। এর ফলে যে ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে তা আমাদের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে ভারতের সংযোগ না থাকায় এ দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদার প্রতি তাদের বড় কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পালস ও এরপর পরিবর্তিত রাজনৈতিক অবস্থা ও মানসপট তারা যাচাই করে দেখতে চায়নি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে আমাদের জাতীয় স্বার্থের তুলনায় ভারতের স্বার্থই বেশি সংরক্ষিত হয়েছিল। কারণ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন বাংলাদেশ-ভারত অভিন্ন নদী এবং সীমান্তহত্যার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধানে পৌঁছাতে পারিনি এবং এ বিষয়ে ভারতকে একাধিকবার সতর্ক করা হলেও আমরা ফেলানী হত্যাকাণ্ডের মতো অমানবিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছি। এমনকি সীমান্তের আশপাশে এখনও মানুষ মারা যাচ্ছে।

এসব আমাদের দেশের মানুষের মনে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে তা অল্প কদিনে ঘটেনি। পনেরো বছর ধরেই আস্তে আস্তে পুঞ্জীভূত হয়েছে এবং পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে শুরু করেছে। দিল্লিবাড়ি পর্যন্ত এ বার্তাটি পৌঁছায়নি। তারা নির্দিষ্ট একটি দলের ওপরই পর্যবেক্ষণ রেখেছে। অবস্থাদৃষ্টে এমনটি প্রতীয়মান হচ্ছে, জুলাইয়ে দেশের মানুষ স্বৈরাচার সরকারের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলন ক্রমেই বেগবান করে আগস্টে যে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে তার সঠিক বার্তা দিল্লি নিজেও যাচাই করেনি এমনকি ভারতীয়দের কাছে তা প্রচারও করেনি। বিশেষত ভারতের গণমাধ্যম প্রতিনিয়ত এমনভাবে পটপরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করছে যা অযৌক্তিক এবং তথ্যের ব্যবহারে ভুলে ভর্তি। এ কথা দিল্লিকে বুঝতে হবে, একটি রাজনৈতিক সরকারের পতনের পর প্রশাসন থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অকার্যকর হয়ে পড়ে। পুলিশের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার মধ্যেই স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে মূল সরকারব্যবস্থাই কদিনের জন্য বিলুপ্ত হয়ে যায়। এমনকি সমাজমাধ্যমে ভারতীয়রা বিভিন্ন প্রযুক্তির পন্থায় বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছু তথ্য উপস্থাপন করে যা সত্যাশ্রয়ী নয়। এসব তথ্য মূল বিষয়ের সারমর্ম সবিস্তার ব্যাখ্যা না করে আরও সংকীর্ণ অর্থে প্রযোজ্য হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ অনিরাপত্তার মধ্যে দেশের সব শ্রেণির মানুষই ভুক্তভোগী হিসেবে রয়েছে। কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যম এ বিষয়টিকেই আলোচনার প্রাণবিন্দু বানিয়ে রেখেছে। অন্তর্বর্তী সরকার চাইলে অবশ্য প্রথমেই এমনটি থামাতে পারত। কিন্তু পরবর্তীতে এখান থেকে বার্তা দেওয়া হলো, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা সত্য নয়। বিষয়টি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবপ্রসূত বলে দাবি করা হয়। এমন মন্তব্যে ভারত আশ্বস্ত হয়েছে এমনটি মনে হচ্ছে না। কারণ সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা কমেনি উল্টো বাড়তে শুরু করে। এ জটিলতার সুযোগে দুই দেশের কট্টরপন্থি কিংবা উগ্রবাদীরা রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে তৎপর হয়ে ওঠে। এভাবেই দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি একে অন্যের সঙ্গে নেতিবাচকভাবে সম্পর্কিত হয়ে গেল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির মন্তব্যে তার প্রকাশই ঘটতে দেখা গেছে। অবশ্য মমতার মন্তব্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ম্যান্ডেট নয়।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় ভারতের বিজেপি এক ধরনের রাজনীতি শুরু করে। মমতা পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস ও বিজেপির সক্রিয়তা নিয়ে তটস্থ হয়ে উঠেছিলেন। রাজনীতির এ জটিল মেরুকরণের সময় মমতা চুপ থাকলে তা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার অবস্থান নাজুক করে তুলতে পারে ভেবেই তিনি বাংলাদেশে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের কথা বলেছেন। বাংলাদেশের ভেতরেও কিছু রাজনৈতিক দল, কিছু মহল এমন মন্তব্য করছে যার সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি কিংবা কূটনৈতিক ব্যবস্থা মানা হয়নি। বরং এ সুযোগে এ মহল বা রাজনৈতিক দলগুলো নিজের কাঠামো শক্তিশালী করার চেষ্টা বাড়িয়েছে। ভারতবিরোধী অবস্থানের মাধ্যমে তারা নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং দেশের অভ্যন্তরে এক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশই অনুধাবন করেছে এমন রাজনীতি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
অন্তর্বর্তী সরকার অবশ্য বাংলাদেশের হাইকমিশনে হামলার পর ভারতের হাইকমিশনকে তলব না করলেও পারত। কিন্তু একবার যা ঘটে যায় তা বদলানো সম্ভব নয়। বরং আমরা বিভিন্ন আঙ্গিকে তা বিশ্লেষণ করতে পারি। অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দুই দেশের সরকারই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় শান্তি স্থাপনের বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছে। ভারত অনুভব করছে, এ বিষয়টিকে এখন আর বাড়তে দেওয়া যাবে না। বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে শীতলতা জাঁকিয়ে বসেছে তাকে দূর করতে হবে। এরই ফল হিসেবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বাংলাদেশ সফর করেছেন। দুই দেশই যেন কূটনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান স্বাভাবিক রাখতে পারে সে বিষয়ে সম্ভবত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়ে গেছে। এখন দেখার বিষয় আলোচনার পরবর্তীতে ফল কীভাবে পাওয়া যায়। আমরাও সম্ভবত ভারতের গণমাধ্যমে ভুল তথ্য উপস্থাপনের বিষয়টিকে জোর দিয়ে উপস্থাপন করব।
ভারতের সঙ্গে এখন নতুন করে পুরোনো চুক্তির রদবদল ঘটতে পারে। এ বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলেও আলোচনা যে হয়েছে তা অনেকটা অনুমান থেকে বলা যায়। আপাতত ভারত বাংলাদেশে জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী নির্বাচিত সরকারের বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেবে। কবে নাগাদ নির্বাচন হতে পারে, এ প্রশ্ন দিল্লির কূটনীতিকরা বারবারই করবেন। কারণ রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ার পন্থাই তাদের জন্য বেশি সহজ। অন্যথায় গণতান্ত্রিক বিশ্বের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে ভারতকে এক ধরনের চাপের মধ্যে থাকতে হয়। যখন তারা একটা আনুমানিক উত্তর পাবে তখন ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক বজায় রাখবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। সরকারি মাধ্যমে এ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হলেও সরকারি মাধ্যমের ওপর সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশের মানুষ ভারতকে একটি বার্তাই দিতে চাচ্ছে। কোনো নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাত দুই দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অকেজো করে তুলবে। এ বিষয়টি আমাদের সংবাদমাধ্যম বা প্রচারমাধ্যমের সহায়তায় ভারতবাসীর কাছে তুলে ধরতে হবে। ভারতকে এ দেশের জনগণের সঙ্গেই সম্পর্ক গড়তে হবে। দুই দেশের মধ্যেই এক ধরনের স্বার্থগত সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের যেমন আমদানি-রপ্তানি রয়েছে ভারতে, তেমন ভারতের জন্যও একটি বড় অর্থনৈতিক উৎস বাংলাদেশ। প্রতি বছর অনেক তরুণ শিক্ষার্থী ভারতের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে যায়। আর বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলোয় ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যাও অনেক। শিগগিরই কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে না পারলে এ শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও অর্থনীতিসংশ্লিষ্ট খাত ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
অবশ্যই দুই দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। যে উত্তাপ দৃশ্যমান হয়ে ও ওঠে দুই দেশের মানুষের মধ্যে, তা থামানোর জন্যই শান্তির পথে হাঁটতে হবে। প্রতিবেশী হিসেবে সহাবস্থান, একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং দেশগুলোর জনগণের আকাঙ্ক্ষা কিংবা বার্তাকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একটি বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ অবশ্য চিন্তিত। নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে ভারত যতটা সহজে সংযুক্ত হতে পারে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তা নিশ্চিত করা কঠিন। সীমান্তহত্যা, অভিন্ন নদ-নদীর পানিবণ্টন, তিস্তা ব্যারাজের বিষয়ে সমাধানের আলোচনাও শুরু করা জরুরি। এসব সমস্যার সমাধান না হলে শুধু কূটনৈতিক মহলই নয়, দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যেও সংকট দেখা দেবে। এমনটি কোনোভাবেই আমাদের কাম্য নয়।