শিশুর অধিকার
শেলী সেনগুপ্তা
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:৩৬ পিএম
শেলী সেনগুপ্তা
শিক্ষার মূলভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষা। যে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মূল যত বেশি দৃঢ় ও আনন্দময় সে দেশের সর্বাঙ্গীণ শিক্ষাব্যবস্থা তত চমৎকার হয়। কারণ শিশুরা আনন্দঘন পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করতে পছন্দ করে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ‘ছাড়পত্র’ কবিতার মাধ্যমে পৃথিবীর সব মানুষের পক্ষ থেকে শিশুর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’।
আজকের শিশুটি আগামী দিনের অভিযাত্রিক। প্রতিটি শিশুর মধ্যে ঘুমিয়ে আছে ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশক। একদিন এরাই হবে পৃথিবীর মূল চালিকাশক্তি এবং এ স্লোগান সামনে রেখে শিশুর অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। দেশের সব শিশুকে সমানভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে হবে। শিশু যদি সুন্দর ও সুস্থ-সামাজিক পরিবেশে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠে তাহলে তাদের জীবন হবে সোনালি দিনের মতো আলোকিত। শিশুকে সঠিক নির্দশনায় গড়ে তোলার দায়িত্ব অভিভাবকের। অভিভাবকের পাশাপাশি বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে শিক্ষকদেরও। মায়ের কোল থেকে নেমে শিশু যখন বিদ্যালয়ে যায় তখন থেকে তাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পবিত্র দায়িত্ব অর্পিত হয় শিক্ষকদের ওপর। পৃথিবীর সব দেশে এমনই হয়ে থাকে। সব ক্ষেত্রে কি তা হচ্ছে? প্রকৃত যত্ন কি পাচ্ছে আমাদের শিশুরা? দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের শিশুরা ‘শিশু আইন ২০১৩’ বর্ণিত সুরক্ষা ও অধিকার পাচ্ছে না।

শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর আছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসেবা, খেলাধুলা এবং বিনোদনের অধিকার। আছে সুষম খাদ্য, চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থানের অধিকার। অবহেলা, শোষণ এবং বৈষম্য থেকে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারও শিশুর আছে। শিশুর অধিকার আছে নিরাপদ জায়গায় বসবাস, গঠনমূলক লালনপালন এবং বিকশিত হওয়ার স্বীকৃতিতে। একই সঙ্গে শিশুর থাকতে হবে বাকস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা এবং ভয় থেকে মুক্ত থাকার অধিকার। তা ছাড়া প্রতিটি শিশুর অধিকার আছে সমাজে বা কমিউনিটিতে অংশগ্রহণ করার, আছে সাংস্কৃতিক, পরিবেশগত এবং উন্নয়নমূলক অধিকার, যাকে কখনও কখনও ‘তৃতীয় প্রজন্মের আধিকার’ বলা হয়। কিন্তু যাদের দ্বারা শিশুরা সুরক্ষিত ও নিরাপদ থাকার কথা, তাদের হাতেই বাংলাদেশের অধিকাংশ শিশু প্রতিনিয়ত সহিংসতা, ভর্ৎসনা এবং কখনও কখনও শোষণের শিকার হয়।
যতটুকু জানি, কমবেশি প্রতি ১০ জনের মধ্যে নয়জন শিশুই তাদের পিতা-মাতা, শিক্ষকসহ অনেকের দ্বারা শারীরিক ও মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়। এ দেশে অধিকাংশ শিশু বেড়ে ওঠে নানা ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে। কেউ কেউ শিশুকালে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে পথশিশু নামক একটি শ্রেণি। বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রম বন্ধ হয়ে গেলেও আমাদের দেশে এখনও তা দৃশ্যত চলমান। আমাদের দেশে এখনও বাসাবাড়ি, হোটেল-রেস্তোরাঁ, দোকানপাট, শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন যানবাহনে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে শিশুরা। এ ছাড়া অনেক বিপজ্জজনক কাজও তারা করে থাকে। অনেক সময় শিশুরাই বাস, ট্রাক কিংবা টেম্পো চালাচ্ছে।
আমাদের দেশে এখনও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। এ ঝরে পড়া নানা কারণে হতে পারে। উল্লেখযোগ্য হলো বাল্যবিবাহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অতিমারি। আর হাওর ও পাহাড়ি এলাকা থেকে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আরও কারণ হলো অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব এবং অভিভাবকদের অসচেতনতা। তা ছাড়া আমরা জানি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। অনেক শিক্ষার্থী পরিবেশ প্রতিকূল ভেবে বিদ্যালয় ছেড়ে দেয়। দেখা যায়, কোনো কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন, কর্কশ ভাষা ব্যবহার করেন কিংবা কড়া শাসনের মধ্যে রাখেন। এর ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় কাজ করে এবং তারা বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ফলে ভীত শিক্ষার্থী বিদ্যালয় ত্যাগ করে। এভাবেই প্রতিদিন ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কয়েক দিন আগের ঘটনা। একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীদের পাড়ামহল্লায় নতুন বছরের জন্য শিক্ষার্থী সংগ্রহে দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু তারাই নয়; এমন আরও অনেক শিশুকে বিভিন্ন গ্রামে পাঠানো হয়েছে। বেশ কিছুদিন থেকে তারা এ কাজটি করছে এবং এজন্য তাদের পাঠ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আরও জানা যায়, এ কাজ না করলে তারা ভর্ৎসনার শিকার হবে। বিষয়টি সত্যি দুঃখজনক। যেখানে ঝরে পড়া ঠেকাতে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেখানে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকার্যক্রম বন্ধ করে কীভাবে নতুন বছরের শিক্ষার্থী সংগ্রহের কাজে পাঠানো হয়! বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। জানি না কর্তৃপক্ষ এর কী বিহিত করবেন। তবে এজন্য অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। শিশুদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রেরও রয়েছে অনেক দায়িত্ব। আমাদের দেশে শিশুদের জন্য আছে ‘শিশু আইন ২০১৩’। এ আইনের উদ্দেশ্য হলো শিশুদের অধিকার সুরক্ষা, তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং সকল প্রকার সহিংসতা, শোষণ ও অবহেলা প্রতিরোধ করা। শিশু আইন ২০১৩-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ শিশুদের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো নিশ্চিত করেছে, যা শিশুদের প্রতি সব বৈষম্যহীনতা ও সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করে।
আমরা জানি, মানসম্মত শিক্ষার জন্য দরকার শিক্ষক-শিক্ষার্থী সুসম্পর্ক, যুগে যুগে এটি হয়ে এসেছে। এ ক্ষেত্রে বলতে পারি, একজন শিক্ষকের কাজ হলো শিক্ষা দান করা। এ কাজটির জন্য একজন শিক্ষক সদানিবেদিত। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে শিক্ষকদের দিয়ে অনেক প্রশাসনিক কাজ করানো হয়, যেমন ভোটার লিস্ট নবায়ন ও জনশুমারি ইত্যাদি। এর ফলে তাদের শ্রেণিকার্যক্রম ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে মানসিক প্রশান্তিও নষ্ট হয়। অশান্ত মন থেকে সুন্দর কিছু আশা করাও যায় না। মনে রাখতে হবে, একজন শিক্ষক সব সময় শিক্ষক, তাদের কাজ শিক্ষা প্রদান এবং এর সঙ্গে রয়েছে বিদ্যালয়কে মানব ফুলের বাগানে পরিণত করা, যার মাধ্যমে আমাদের দেশের সব শিশু ফুলের মতো ফুটে উঠবে, সুবাস ছড়াবে দেশ থেকে দেশান্তরে। তাহলেই বলা যাবে ‘যার কাজ তারেই সাজে’। আমাদের দেশেও শিশু আইন ২০১৩-এর সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ হবে।