পর্যবেক্ষণ
ড. মো. নুরুল ইসলাম
প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:২৯ এএম
ড. মো. নুরুল ইসলাম
পতাকা অবমাননা এবং আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে ভারতীয় ধর্মীয় উগ্রবাদী সংগঠনের কর্মীদের হামলার ঘটনায় বাংলাদেশের মানুষ ক্ষুব্ধ। দুই দেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের শীতল ক্ষোভ সমাজমাধ্যমে দৃশ্যমান। তবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপড়েনের চেয়েও বড় সমস্যা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। রাজধানীসহ সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা অনেকাংশে কম বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। ৪ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চায় না ৮৯ শতাংশ মানুষ। সংস্কার কমিশনের জরিপে পাওয়া এ তথ্য থেকে সমাজে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুরতার আলাদা কারণ সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
এ ক্ষেত্রে পুলিশ সংস্কার কমিশনের ‘কেমন পুলিশ চাই’ শীর্ষক এ জরিপে মূলত পুলিশ প্রশাসনে স্বচ্ছতা এবং অপরাধী পুলিশের শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়টি পেয়েছে বাড়তি গুরুত্ব। কিন্তু মুদ্রার এপিঠ দেখতে গিয়ে অন্য পিঠটা এড়িয়ে গেলে চলবে না। ওই জরিপেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার কাজেই লিপ্ত সিংহভাগ রাজনীতিক। একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এ রাজনৈতিক বলয় নিয়ন্ত্রণ করেন কয়েকজন। সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে অর্থের বিনিময়ে পুলিশকে ব্যবহার করে। যেমন পাসপোর্ট কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স জোগাড়ে বাড়তি টাকা দিতে হয়। অর্থাৎ জননিরাপত্তা কিংবা দেশে পুলিশ বাহিনীর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমাজই এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা গড়ে রেখেছে। এ প্রতিবন্ধকতাকে মেনে নিয়েই সংস্কারের কাজটি করতে হবে।

আমরা প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে দেখছি, রাজধানীসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চলছে খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, হামলা, দখল, ধর্ষণসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। জুলাইয়ের পটপরিবর্তনকে ইতিবাচক-নেতিবাচক যে দৃষ্টিতেই দেখা হোক না কেন, একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। এ পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাধীনতা সম্পর্কে ভিন্ন একটি ধারণার জন্ম নিয়েছে। সবাই বৈষম্য, অন্যায় এসব শব্দ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এমন কাজ করছে যা আইনের সুস্পষ্ট অবমাননা। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয়, তারা নিজেরাও সচেতন নয় এ ধরনের অপরাধ তারা করছে। বিষয়টি তাদের কাছে স্বাভাবিকই মনে হচ্ছে। এজন্য সড়ক অবরোধ করলে অনেকে ভাবেন, ন্যায্য দাবি আদায় করার জন্য তারা শান্ত অবস্থান রেখেছেন। অথচ একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দখল করে গোটা রাজধানীর মানুষের দিনটি অতিষ্ঠ করে তুলছেন। ভিড়ে আটকে থাকা অ্যাম্বুলেন্সের শব্দও তাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না যেন। এগুলো নির্দেশ করে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলেও সমাজের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ঘটেনি। পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করা কিংবা আইন প্রতিপালনে নাগরিক দায়িত্ব পালনের বিষয়টিকে সতর্ক দৃষ্টিতে মেনে নেওয়ার মানসিক পরিপূর্ণতা গড়ে ওঠেনি। তাই সমাজের প্রতিটি অংশই এখন মনে করে, তাদের দাবিই সঠিক। এমনকি পুলিশের কার্যক্রমও তাদের কাছে অকেজো। এমনটি রাষ্ট্রের জন্য ভালো কিছু নয়। কারণ যদি জনগণ মব হিসেবে সমাজে অরাজকতা করে তার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো আরও ভয়াবহ সংকট তৈরি করে।
অর্থনীতিতে বৈদেশিক বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়া, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া এবং দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে না পারার নেতিবাচক প্রভাব সমাজে নানা-শ্রেণির মানুষের ওপর পড়ে। এ নেতিবাচকতার ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে। দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে বাঁচার জন্য তারা চুরি বা সংঘবদ্ধ হয়ে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। তাদের উদ্দেশ্য থাকে কিছু অর্থ পাওয়া। আবার এ মানুষদের অনেক সময় সমাজের সুযোগসন্ধানী অনেকেই ব্যবহার করে। এভাবে আস্তে আস্তে অপরাধের একটি বৃত্ত তৈরি হয়। এমনকি পটপরিবর্তনের সময়ও যেহেতু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে অর্থনৈতিক অনেক প্রতিষ্ঠানই কার্যকর অবস্থায় নেই, সেহেতু বেকারত্বের সঠিক চিত্রও আমরা দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু এটুকু বোঝা যাচ্ছে, শহর ও গ্রামীণ এলাকায় নিম্ন আয়ের মানুষ কোণঠাসা হয়েই নানা অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি দুই ধরনের প্রবণতা। কেউ কেউ সুযোগ সন্ধান করছে আর কেউ আসলে সুযোগের ব্যবহার করছে। দীর্ঘদিন যারা রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে ছিল, তারা এখন প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ পাচ্ছে। নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য অনেকেই বিভিন্ন স্থানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত গোষ্ঠীদের সঙ্গে আঁতাত করছে। আর এ আঁতাতের ফলে অপরাধীরাও সুযোগ পাচ্ছেন। আবার যেহেতু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনও সম্পূর্ণভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় ফেরেনি, তাই অনেকে অপরাধের সুযোগ নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমরা সরলভাবে অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারব না।
একটানা প্রায় ১৬ বছর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় ছিল। ওই সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সুশীল সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি মিশ্র সরকারব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত তারা ইতিবাচক কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সংস্কারের লক্ষ্যে কাজও করছে। কিন্তু সামাজিক বিশৃঙ্খলা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কাজের সামনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ইতিবাচক কাজে সমর্থন দেওয়ার জন্য সমাজসচেতনতার বিকল্প নেই। সমস্যা হলো, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই আইনসচেতন নয়, পরিশীলিত ও সমাজকল্যাণমুখী নয়। বিশেষত আইনের ক্ষেত্রে অনেকেই সচেতন নয়। দেশের শিক্ষিত মানুষের কাছেও প্রচলিত আইন সম্পর্কে ধারণা নেই। তাই তারা অনেক সময় অজ্ঞতাবশত অনেক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় এবং তা সমাজে বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধের জন্ম দেয়। উন্নত অনেক বিশ্বেই একজন নাগরিকের জন্য প্রয়োজনীয় আইনের পকেটবুক সংস্করণ থাকে। যাপিত জীবনে কোন কোন ক্ষেত্রে তারা আইন লঙ্ঘন করতে পারে কিংবা তার ওপর অন্যায় হলে কীভাবে ন্যায়বিচার পাবে তা এসব পকেটবুকে লেখা থাকে। অর্থাৎ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে আইন মেনে চলার সদিচ্ছা থাকতে হবে। কারণ মানুষ যখন জানবে কোন কোন ক্ষেত্রে সে আইন ভঙ্গ করছে, তখন তার মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে। আমাদের দেশে এ সচেতনতা তৈরি করা কঠিন। কারণ আমরা আমাদের আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর আধুনিকায়ন করতে পারিনি। মানুষকেও আইনসচেতন করতে পারিনি।
আমরা দেখছি, আইনকে শ্রদ্ধা করার উপলব্ধি সমাজের মানুষের মধ্যে কম। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী অনেককে রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতিতে কিছু সুযোগসন্ধানী ব্ল্যাকমেল করছে। তারা আশ্বাস দিচ্ছে, অর্থের বিনিময়ে তারা ওই ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দেবে। অথচ বাস্তবে এমন নিরাপত্তা দেওয়ার এখতিয়ার তাদের নেই। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য মনোযোগী হতে হবে। কারণ সুবিধা প্রাপ্তির প্রবণতার মধ্যেও যে পরিবর্তন দেখা গেছে তা মোটেও ইতিবাচক হতে পারে না। তারা যদি দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে তুলতে না পারে, তাহলে অপরাধ যেমন বাড়বে তেমন সংঘাত-সহিংসতাও বাড়বে। এ-ও সত্য, আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সচরাচর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সামাল দিতেই বেশি সময় ব্যয় করে। আর জনসংখ্যাবহুল এ দেশে সবাইকে সমান নিরাপত্তা দেওয়াও কঠিন। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আনতে না পারলে আমরা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখব না।
দেশে এখনও রাজনৈতিক দলগুলো শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে বলে মনে হচ্ছে না। অন্যদিকে অস্থিতিশীলতা বাড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলো নানা মতপার্থক্যে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এ সংকট সমাধানের জন্য একটি স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে সে যাত্রা করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো কি তাদের কার্যক্রম যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছে? সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বলেছেন, তাদের দলের অনেকেই এমন কাজে সম্পৃক্ত হচ্ছেন যেন তারা ক্ষমতা পেয়ে গেছেন। তার ওই বক্তব্যে রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবনের লক্ষণ পাওয়া গেছে। তিনি বলেছেন, আগামী ভোট অনেক চ্যালেঞ্জিং হবে। আওয়ামী লীগ না থাকলেও এ ভোট কেন চ্যালেঞ্জিং হবে? কারণ এবার বিএনপিকে জনগণ দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেবে। ক্ষমতা জনগণের কাছে চলে এসেছে। তাই পূর্ববর্তী রাজনৈতিক প্রভাব সামাজিক বাস্তবতায় প্রয়োগ করার সুযোগ নেই। তবে এ উপলব্ধি রাজনৈতিক দলের সব কর্মী উপলব্ধি করতে পারছে না, যা প্রতিনিয়ত নানা সংঘাতের ঘটনায় স্পষ্ট। দেশে কার্যত সামাজিকভাবে আইন মানার প্রবণতা মানুষের মধ্যে কম। উল্টো দিকে এ প্রবণতা রাজনীতিকদের মধ্যেও আলাদা উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা বাড়িয়ে থাকে।
রাজনৈতিক দলগুলোকে তাই দ্রুত সামাজিক বাস্তবতা ও বিশৃঙ্খলাকে অনুধাবন করতে হবে। বিষয়টি তাদের নিজ দলীয় অস্তিত্বের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এখন সমাজে যে ধরনের স্বাধীনচেতা ভাবনা রয়ে গেছে সেখানে সঙ্গত কারণেই অনুমান করা যায়, নির্বাচনের আগে দলের উপদলীয় কোন্দল এমনকি আলাদা স্বতন্ত্র দল তৈরি হয়ে যেতে পারে। এমন হলে রাজনীতি এমন এক ঘোরপ্যাঁচে আটকাবে যা জটিলতা আরও বাড়াবে। স্থিতিশীল রাজনৈতিক শক্তিই পারে সারা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু তার আগে রাজনৈতিক দলকে অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। এ কাজটি তারা সমাজে স্থিতিশীলতা আনয়ন ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে করতে পারে। কিন্তু বিষয়টি আমাদের প্রত্যাশায় থাকলেও বাস্তবে রূপ নেওয়ার ক্ষেত্রে হতাশাজনক চিত্রই বড় হয়ে উঠছে।