× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজনীতি

গুরুত্বপূর্ণরা যেভাবে গুরুত্বহীন হলেন

হোসেন আবদুল মান্নান

প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:২৬ এএম

হোসেন আবদুল মান্নান

হোসেন আবদুল মান্নান

জনপ্রিয় মানুষের শেষ ঠিকানা যদি রাজনীতি হয়, তবে তিনি তার আগের অবস্থান ধরে রাখতে পারেন না, এটা এখন স্বতঃসিদ্ধ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। শুধু এ দেশে নয়, সারা দুনিয়ার চিত্র প্রায় একই। তবে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে তা দিবালোকের মতোন সত্য। এখানে সমাজের শেকড় থেকে উঠে আসা একজন জনগণবান্ধব তথা সর্বজনে জনপ্রিয় ব্যক্তিকেও রাজনীতির ট্র্যাডিশনাল বৃত্তে প্রবেশ করিয়ে দিলে তিনি অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে অপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তার দীর্ঘদিনের ইমেজ চোখের পলকে বিনষ্ট হয়ে যায়। এ দেশে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি যখন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে ওঠেন, তখন রাজনীতিই যেন তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কবর রচনা করে দেয়। প্রকৃত জনপ্রিয় মানুষের পক্ষে ক্ষমতা আর পদপদবি কেনাবেচার রাজনীতিতে টিকে থাকা সবচেয়ে দুরূহ। কারণ মানুষের জনপ্রিয়তার পেছনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার সততা ও সম্মান। ফলে রাজনীতির মাঠের নতুন কুশীলব হয়ে শুরুতে তিনি দোটানায় পড়ে যান। মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা সহসা অবজ্ঞা করার আগে তিনি দারুণ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকেন। কোন দিকে যাবেন তিনি? সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার দিকে, না অঢেল অর্থ আর ক্ষমতার চেয়ারের দিকে? তখনই তাকে এক ভয়ংকর দোদুল্যমানতায় পেয়ে বসে। এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে তাকে চিরতরে হারিয়ে যেতে হয়।

১৯৫২ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলের প্রথম রাষ্ট্রপতি চেম ওয়েজমানের মৃত্যুর পরে দেশটির ইহুদি জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দাবির প্রেক্ষিতে তখনকার পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব পাঠানো হয়। দূতাবাসের মাধ্যমে এমন প্রস্তাব পেয়ে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন প্রথমে বিস্মিত হলেও আনন্দিত হয়েছিলেন। যদিও শারীরিক অবস্থা এবং বার্ধক্যের কারণ দেখিয়ে তিনি সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। পাশাপাশি তা-ও জানিয়ে দিয়েছিলেন, রাজনীতির চেয়ে সমীকরণেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। সেদিন আলবার্ট আইনস্টাইন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্টের পদ অলংকৃত করলে তাঁর ইতিহাস হয়তো অন্য রকম হতে পারত। জীবনীতে বিতর্কিত অধ্যায় রচিত হতে পারত। অথচ মৃত্যুর ৬০ বছর পরেও বিশ্বব্যাপী আলবার্ট আইনস্টাইনের জনপ্রিয়তা একবিন্দু কমেনি। এমনকি ইসরায়েলেও তিনি সমান জনপ্রিয়।

উপমহাদেশের জনপ্রিয় সংগীতজ্ঞ, সুরস্রষ্টা ও শিল্পী ভূপেন হাজারিকাকে নিয়ে বলা যায়। বাংলা, হিন্দি, অসমীয়া ভাষায় গান গেয়ে যিনি জীবদ্দশায় কিংবদন্তি হয়েছিলেন। যাকে বলা হতো বিশ্বশিল্পী। যিনি উচ্চশিক্ষিত এবং আন্তর্জাতিক মানের শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। ভারতের সব গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার যার হাতে এসেছিল। ২০০৬ সালে বিবিসির শ্রোতা জরিপে তার গান ‘মানুষ মানুষের জন্যে/জীবন জীবনের জন্যে’ ২০টি বাংলা গানের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান পেয়েছিল। বাম রাজনীতি, কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন জীবনাচার, জীবনঘনিষ্ঠ এক সংগীতসাধক, মানবিকতার ফেরিওয়ালা হিসেবে যিনি দুনিয়ায় খ্যাতি লাভ করেছিলেন; শেষ জীবনে এসে বিজেপির রাজনীতিতে যোগ দিয়ে লোকসভায় নির্বাচন করতে গিয়ে সংস্কৃতিসেবী ও ভক্তদের প্রচণ্ড সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। তার আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা থেকে ইন্দ্রপতনের মতোন হঠাৎ যেন নেমে আসেন এক উত্তপ্ত বিতর্কের অগ্নিগিরিতে। ভূপেন হাজারিকার প্রায় ৮ দশকের জীবনসাধনা বিরাট প্রশ্নবোধক হয়ে দেখা দেয় সংগীতের মায়াবী ভুবনে। রাজনীতিই তার জীবন সায়াহ্নকাল অস্বস্তিকর করে তুলেছিল; যা তার চরিত্রের সঙ্গে ছিল সম্পূর্ণ বেমানান।

বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব, অভিনেতা ও আবৃত্তিকার আসাদুজ্জামান নূর। অতুলনীয় এক বাঙালি অভিনেতা। নাটক, চলচ্চিত্রে অভিনয় করে এখানে তার সমান জনপ্রিয়তা ইতঃপূর্বে খুব বেশি অভিনেতা অর্জন করতে পারেননি। একজন তুখোড় বাগ্মী, সংস্কৃতিকর্মী, ব্যবসায়ী হিসেবেও বিপুল সফলতা পেয়েছিলেন। টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করে সারা দেশের দর্শক-শ্রোতাকে মুগ্ধতার জাদুতে আচ্ছন্ন করে রেখে যিনি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। এ দেশের ক্ষমতার রাজনীতি কি তার জন্য খুব অপরিহার্য কিছু ছিল? তিনি অনায়াসেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করে এবং ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারতেন। রাজনীতির নোংরা কালিমা তাকে কখনও স্পর্শ করতে পারত না। অভিনয়শিল্পের সারথিদের কাছে তিনি প্রজন্মপরম্পরায় নূরুলদীন বা বাকের ভাই হয়েই থাকতে পারতেন। অভিনয় দুনিয়ার এক আইকনিক প্রতিকৃতি হিসেবে টিকে থাকতে পারতেন। দলীয় ক্ষমতার বলয় আর লোভনীয় জীবনাচারের হাতছানি চোখের সামনে তাকেও গ্রাস করে নিল এবং রাজনীতির বাইরে থাকা একশ্রেণির সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ কষ্ট পেল। আজকের বাস্তবতায় তার অভিনয়-সমকালীন দর্শকের কাছেও তিনি যেন এক গুরুত্বহীন মানুষের ছবিমাত্র।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সমাজমাধ্যম ব্যবহার করে রাস্তাঘাট, দুর্নীতি, অনিয়ম-অসঙ্গতি জনসমক্ষে তুলে ধরে অকল্পনীয় জনপ্রিয়তা পাওয়া ব্যারিস্টার সুমনকে নিয়েও বলা যায়। একজন সুদর্শন নিবেদিতপ্রাণ তরুণ আইনজীবী হিসেবে কীভাবে মানুষের হৃদয়ে শক্ত আসন গেড়ে বসেছিলেন। ভাবলে বিস্ময় জাগে, সরকারি দলের নমিনেশন না পেয়েও কীভাবে একজন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে আসেন। সেই আসনে ভোট কারচুপির সুযোগ ছিল মন্ত্রীর, নিশ্চয় তার নয়। তখনই গোটা দেশবাসী দেখেছে গণমানুষের উজাড় করা সমর্থন ও ভালোবাসায় সিক্ত হওয়া সুমনকে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে লাইভে গিয়ে মানুষের দুর্ভোগ চিহ্নিত করে সরকারের নজরে নেওয়াই ছিল তার জনপ্রিয়তার মূল রহস্য। তখনই সাধারণ মানুষের দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষার পাত্র হয়ে ওঠেন এ তরুণ ব্যারিস্টার। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নেমেই হয়ে ওঠেন হ্যামিলনের বংশীবাদক। অথচ দলীয় রাজনীতিতে না জড়িয়ে নিজের আইন পেশা এবং সামাজিক দায়দায়িত্ব নিয়ে তুমুল জনপ্রিয়তার একটা দীর্ঘ জীবন পেতে পারতেন। তার এমন পরিণতি, বোধ করি ভবিষ্যতের যেকোনো জনপ্রিয় মানুষের কাছে হবে অসুখকর এবং বিব্রতকর।

  • গল্পকার ও সাবেক সচিব
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা