× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভর্তিযুদ্ধ

শিক্ষা বৈষম্যের জাল ছিন্ন হোক

কাজী লতিফুর রেজা

প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৮:৩১ এএম

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৮:৩৭ এএম

কাজী লতিফুর রেজা

কাজী লতিফুর রেজা

শিক্ষা সুযোগ নয়। এটি সবার অধিকার। এই বাগাড়ম্বর উক্তি ডিসেম্বর এলেই বোঝা যায় কতটা অন্তঃসারশূন্য। ডিসেম্বর বিজয়ের মাস হলেও এটি বাবা-মায়ের দিশাহীনতার মাসও বটে। সন্তানদের ভর্তির জন্য বাবা-মা অসহায়ভাবে এই প্রতিযোগিতায় শামিল হন। পৃথিবীর আর কোথাও এভাবে ঘটে কি না, জানা নেই। তবে বাংলাদেশে ভর্তির এই দৌড় স্পষ্টতই একটি রেসে পরিণত হয়। এর অবস্থা কতটা জটিল, তা সম্প্রতি ভর্তি আবেদন-সংক্রান্ত তথ্য দেখলেই স্পষ্ট হয়। চলতি শিক্ষাবর্ষে ৬৮০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট শূন্য আসন রয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৭১৬টি। অথচ আবেদন জমা পড়েছে ৬ লাখ ২৫ হাজার ৯০৪টি অর্থাৎ প্রতি আসনের জন্য প্রায় ছয়জন শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতা করছে। যদিও আমাদের সংবিধানে শিক্ষাকে একটি বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে কিন্তু তারপরও আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশাল প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে। 

সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে শিক্ষার কথা বলা আছে। এ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ভাগে অন্তর্ভুক্ত। সরকারি বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ভর্তির চাপ, মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যা সীমিত এবং অনেক গরিব পরিবার প্রাইভেট স্কুলের খরচ বহন করতে অক্ষম হওয়ায় প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার বেড়ে যাচ্ছে। যদিও সংবিধান বলছে, আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার সংবিধানে শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং শিক্ষা অধিকারের আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। যদিও এই আইনি কাঠামো বাংলাদেশে অনুপস্থিত।

শিক্ষা একটি অধিকার। কিন্তু সম্প্রতি শিক্ষা পরিসংখ্যানে চোখ রাখলে কথাটি প্রীতিকর মনে হয় না।  এই পরিস্থিতি শিক্ষার অধিকার সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। বাংলাদেশের ভাগ্যবিড়ম্বিত বাবা-মায়ের শিশুদের ভর্তির নিশ্চয়তা নির্ভর করছে লটারির ওপর। এটি আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎকে ভাগ্যের হাতে সপে দিচ্ছে। বাংলাদেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তির চাহিদা ও বাস্তবতা প্রতি বছরই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। সম্প্রতি একটি দৈনিকে প্রতিবেদনে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের ভর্তির পরিসংখ্যান এ সমস্যার গভীরতা এবং শিক্ষার বৈষম্যের দিকটি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এই পদ্ধতি শিক্ষার অধিকার সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলে। এটি হতাশাজনক যে, এ ব্যবস্থা আমাদের সন্তানদের অসহায় করে তুলে এবং তাদের ভবিষ্যৎকে কেবলমাত্র ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রতি আসনের বিপরীতে ছয়জন শিক্ষার্থী আবেদন করেছে, যেখানে বেসরকারি বিদ্যালয়ে লক্ষাধিক আসন ফাঁকা থাকছে। এই চিত্র শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাবহুল বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়। এ সমস্যার সমাধানে দরকার সঠিক পরিকল্পনা, যেখানে প্রয়োজনীয়সংখ্যক স্কুল থাকবে শিক্ষার্থীদের জন্য। আমাদের সন্তানদের দৌড়াতে হবে না রেসের ঘোড়ার মতো।

যেখানে বেসরকারি বিদ্যালয়ে প্রায় ১০ লাখ ৭ হাজার আসনের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে মাত্র ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৮০০টি। ফলে ৬ লাখ ৬৭ হাজারেরও বেশি আসন ফাঁকা থাকছে। কারণ অধিকাংশ বেসরকারি বিদ্যালয় মানসম্পন্ন নয়। আর মানসম্পন্ন বেসরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা সীমিত, তা আবার অধিকাংশ অভিভাবক উচ্চ ব্যয়ভার বহন করতে অক্ষম। অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ভর্তির ঘোড় দৌড়ে আর একটা কারণ মানসম্পন্ন শিক্ষকের নিদারুণ অভাব। ড. লিন্ডা ডার্লিং-হ্যামন্ড শিক্ষানীতি বিশেষজ্ঞ বলছেন, ‘একটি শিক্ষাব্যবস্থার মান তার শিক্ষকদের মানের চেয়ে বেশি হতে পারে না।’ গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অপরিহার্য। পাশাপাশি শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে অবকাঠামোগত উন্নয়নও প্রয়োজন। 

শিক্ষার কাঠামোগত এবং সরঞ্জামের অভাব শিক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করে বলে মালালা ইউসুফজাই মতপ্রকাশ করেন। সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে এই বৈষম্য নিরসনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। বেসরকারি বিদ্যালয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপগুলোর অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম এবং প্রযুক্তিগত ইন্টিগ্রেশনকে উন্নীত করতে সহায়ক হতে পারে। সরকার, আইনপ্রণেতা, শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও সমাজের প্রত্যেককেই একটি গুণগত শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি বিদ্যালয়ে নতুন শাখা খোলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভর্তির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। 

আর্থসামাজিক কারণে আমাদের অনেক শিশুই প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডি পার করতে পারে না। পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশে স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের হার ২০২৪ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে বেশি। ইউসেফ ও ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ১৭ শতাংম শিশু স্কুলের বাইরে রয়ে গেছে। এর তুলনায় ভারতে এই হার প্রায় ১২ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় এটি মাত্র ৪ শতাংশ। পাকিস্তানে এই হার প্রায় ৩১-৩৪ শতাংশ। ইউনেস্কোর এই ব্যবধান বিশেষত দারিদ্র্য, শিক্ষার মানে বৈষম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায় যে, শিক্ষায় আমাদের অগ্রগতি হলেও সামাজিক ও আর্থিক কারণে অনেক বাবা-মা-ই তাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা আর চালিয়ে যেতে চান না বা পারেন না। তদুপরি বাংলাদেশের উন্নত এবং গুণগত সম্পন্ন স্কুলগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো স্কুলে গুণগত শিক্ষা অর্জন করা আর্থিকভাবে চ্যালেঞ্জিং। ফলে শিক্ষাগত সুযোগ সীমিত হয়, যা সামাজিক মোবিলিটি বাধাগ্রস্ত করে এবং বৈষম্যকে চক্রাকারে ধরে রাখে। বাংলাদেশের সব শিক্ষার্থীর জন্য গুণগত শিক্ষায় ন্যায্য সুযোগ প্রদান করার জন্য এই সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি। 

অতএব স্কুল ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন এখন একটি প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনে শিক্ষাব্যবস্থার সংশোধন করা উচিত এবং এটি কেবল ভর্তি প্রক্রিয়ায় নয়, বরং উন্নত পাঠ্যক্রম, পাঠ উপকরণ ও শিক্ষায় প্রযুক্তি সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা, কমিউনিটি এনগেজমেন্ট, গুণগত শিক্ষা এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেটের রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১১.৮৮ শতাংশ, যা মোট জিডিপির ১.৭ শতাংশ। এটি ইউনেস্কোর সুপারিশকৃত ৪-৬ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। এনডিটিভির ২০২৩-এর প্রতিবেদন বলছে, ভারত ২.৯ শতাংশ জিডিপি এবং নেপাল সরকারের অর্থমন্ত্রীর ওয়েবসাইটে সূত্র অনুসারে ৩.৪ শতাংশ বরাদ্দ করছে শিক্ষা খাতে। বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বেশ কিছু উন্নতি হলেও বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে আরও বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন। 

সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ স্কুলগুলোর অবকাঠামোর উন্নতি সত্ত্বেও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার মান উন্নয়ন অনেকাংশে অপর্যাপ্ত। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন বলছে, গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষার সুযোগের অভাব এবং শিক্ষক সংকট বিশেষভাবে স্পষ্ট। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। যেখানে বেসরকারি স্কুলগুলো মানসম্মত হলেও উচ্চ খরচ মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের জন্য প্রতিবন্ধক। সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক হলেও শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে প্রয়োজন আরও বাজেট এবং কার্যকর নীতিমালা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন, বিশেষত উন্নত অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে। 

নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘শিক্ষাই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র, যা দিয়ে আপনি পৃথিবী পরিবর্তন করতে পারেন।’ বাংলাদেশ গুণগত শিক্ষা প্রদান করে জনগণের সম্ভাবনা উন্মোচন করতে এবং একটি সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ গঠন করতে সক্ষম হবে। শিক্ষা সুযোগ নয়, অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে। আর এই শিক্ষাবৈষম্যের নিরসন করতে সরকারকে অবশ্যই শিক্ষাকে ‘অধিকার’ হিসেবে নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা বাজেটের পরিমাণ ইউনেস্কোর সুপারিশকৃত ৪-৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা উচিত। এই তহবিলের মাধ্যমে গ্রামীণ অঞ্চলে নতুন বিদ্যালয় নির্মাণ, মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রযুক্তি-সমন্বিত শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা সম্ভব। জনমিতি অনুপাতে, পরিকল্পিতভাবে ইশকুলের সংখ্যা বৃদ্ধি করা উচিত, যাতে ইশকুলের ভর্তির ভাগ‍্য লটারিতে নির্ধারিত না হয়।

  • সহযোগী অধ্যাপক, আইন ও মানবাধিকার বিভাগ, আরপি সাহা বিশ্ববিদ্যালয়, নারায়ণগঞ্জ
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা