× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিজয়ের মাস

ঘটনাধারার সঙ্গে সংলগ্ন মধুদা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:০৬ এএম

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

মধুর দোকান একটি নয়, অনেকটি; কিন্তু মধুদা ওই একজনই। কোনো মানুষেরই দ্বিতীয়টি নেই, কিন্তু মধুদা বিশেষভাবেই অনন্য, কেননা তিনি যে কেবল একজন ব্যক্তি, তা নন, শুধু একটি প্রতিষ্ঠানও নন। দোকানের মালিক নন একজন, তিনি আমাদের চলমান ঐতিহ্যের অংশ। মধুদার চায়ের দোকান একটি ছিল না, ছিল অনেকটি। ক্রমাগত সে বদলেছে। আমাদের সময়ে ছিল এক রকম, তার আগে আরেক রকম; পরে ঘটেছে অন্য রদবদল। মেডিকেল কলেজের উত্তর-পূর্ব কোণ থেকে উঠে এসেছিল নতুন কলাভবনে, সেখানে প্রথমে ছিল মূল ভবনে, তারপর তার আলাদা ঘর হয়েছে। কিন্তু শুধু এসব পরিবর্তনের কারণে যে সে অনেকটি, তা নয়; যখন একই সময়ে ও স্থানে রয়েছে, তখনও দেখেছি তাকে বিভিন্ন রূপে।

আমরা প্রথমে দেখতাম বাইরে থেকে। মেডিকেল কলেজের সামনে দিয়ে যাওয়া-আসার সময়ে। তখনও ছাত্র নই বিশ্ববিদ্যালয়ের। তারপর ঢুকেছি যখন ভেতরে, বসেছি, চা খেয়েছি, একা কখনও, কখনও অনেকের সঙ্গে। তখন দেখেছি সে একটি নয়, একই সঙ্গে অনেকটি দোকান বটে। বদলে যেত। সকালে গেলে মনে হতো আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠেছে। দুপুরে ব্যস্ত। বিকালে ভিড় বেশি। সন্ধ্যার পরেও জীবন্ত, কিন্তু অত প্রাণবন্ত নয় যেমন বিকালে ছিল। যেন নাটকের মঞ্চ একটি, যেখানে দৃশ্য বদলাচ্ছে, আসছে নতুন নতুন সংলাপ। ছাত্রদের কেউ আসে প্রয়োজনে, নাশতা খেতে, কিংবা মিলিত হতে অন্যের সঙ্গে, কারও লক্ষ্য আড্ডা দেওয়া। দ্রুত শিঙাড়া কিংবা গজা মুখে পুরে ছুটছে কেউ ক্লাস ধরতে, কারও তাড়া নেই, সময় আছে হাতে।

কোথাও বসেছে সাহিত্যপ্রিয় ছেলেরা, নিজেদের লেখা কিংবা নতুন পাওয়া কোনো বই নিয়ে কথা বলতে। নতুন বই পাওয়ার সুযোগ ছিল কম, মেডিকেল কলেজের সামনে কয়েকটি দোকান, কয়েকটি সদ্য প্রতিষ্ঠিত নিউমার্কেট, আর আছে ওয়ার্সি বুক সেন্টার, মাহুতটুলীতে; বই পেলে একজন আরেকজনকে দেখায়, আলাপ করে। আসে উদ্বিগ্ন ছাত্র। টিউটরিয়ালে ভালো করেনি, কী করে মান উন্নত করা যায়, ভাবে সে। এক টেবিলে বসে তিনজন হয়তো আলাপ করছে আসন্ন পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন নিয়ে। হতাশ প্রেমিকও আছে; কিংবা ঘোষিত প্রেমিককে ঘিরে বন্ধুরা। আছে রাজনীতির ছেলেরা। তারাই প্রধান। জমিয়ে বসে তর্কবিতর্ক করে। তৈরি করে কর্মসূচি। এ সংগঠনে-ও সংগঠনে সন্ধি কিংবা সংঘর্ষের পরিকল্পনা রচিত হয়। বিবৃতি লিখছে কেউ। কেউ ভাবছে বক্তৃতার কথা। রয়েছে সংস্কৃতির ছেলেরা, যারা নাটক করে, গান গায়, কিংবা আয়োজন করে অনুষ্ঠানের। কোথাও গুঞ্জন, অট্টহাসি কোথাও, কোথাও বা স্তব্ধতা।

মধুর দোকান তো অসামান্য কোনো জায়গা নয়। ওপরে টিনের চাল, নিচে টেবিল আর চেয়ার; খাবারদাবার সামান্য; ছোট ছোট কাপে চা, সন্দেশ, শিঙাড়া, নিমকি, গজা এসবই তো। সবকিছু নির্দিষ্ট মানের, উঠতি-পড়তি নেই। কিন্তু সামান্য ওই চায়ের দোকানে একটা জীবন আছে সব সময়ই। সেটা নাটকীয়। নাটকের প্রাণ থাকে দ্বন্দ্বে। মধুর দোকানেও দ্বন্দ্ব ছিল, সব সময়ে। নানা মতের মধ্যে বিরোধ থাকত, তর্কবিতর্ক হতো। এমনকি একাকী বসে থাকত যে ছাত্র তার মনের মধ্যেও একটা লড়াই চলত চিন্তা কিংবা দুশ্চিন্তার, অথবা হতে পারে নানা অনুভবের। ছেলেরা আসে, চলে যায়। নিয়মিত যারা তাদের কারও কারও আছে বাকির খাতা। বিশেষ করে রাজনীতির ছেলেদের। তাদের সঙ্গে অনেকে থাকে, তারা বারে বারে আসে। বাকির খাতায় তাদের হিসাব সব সময় যে নির্ভুল হয় তা নয়। কতবার এসেছিল, কজন ছিল সঙ্গে সেটা জেনে নিয়ে মধুদা একটা অঙ্ক লিখে রাখেন তারিখ বসিয়ে, হিসাবের পাতায়।

এ দোকানেরই মালিক মধুদা। সাধারণ বেশভূষা, লুঙ্গি ও শার্ট কিংবা ফতুয়া পরনে। বসে থাকতেন একটি ছোট টেবিল সামনে নিয়ে। পাশে ক্যাশ বাক্স, সামনে বাকির খাতা। দেখতেন কোথায় কী ঘটছে। একদল বেয়ারা, অল্পবয়সি তারা অধিকাংশই, ছোটাছুটি করে খাবার পৌঁছে দেয় টেবিলে টেবিলে। মধুদা খেয়াল রাখতেন। অনিয়ম হচ্ছে কি না, গ্লাস ভাঙল কি কোথাও, কেউ কি পাচ্ছে না খাবারÑ সব দেখতে হতো তাকে। বিচ্ছিন্ন নন, সংলগ্ন, দোকানের মালিক মনে হয় না কখনও, মনে হয় বন্ধু। তিনি ওই একজনই। সবারই দাদা তিনি, সব বয়সি ছেলেরই।একজন যে তিনি, একেবারেই একজন, জানত তা পাকিস্তানি হানাদাররা, যারা তাকে হত্যা করেছিল একাত্তরে, গণহত্যা শুরুর সকালেই। চিহ্নিত ছিলেন তিনি। বাড়িতে গিয়ে, আটক করে হত্যা করেছে তাকে। তার স্ত্রী, জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং পুত্রবধূকেও। রাগ ছিল তাদের এতটাই। শত্রুপক্ষ খোঁজ রাখত তার, যেমন আলবদরেরা খোঁজ রাখত বুদ্ধিবীজীদের। অথচ মধুসূদন দে কে? তিনি তো অত্যন্ত নিরীহ ব্যক্তি একজন, সাধারণ বাঙালি। শিক্ষক নন, ছাত্র নন, কর্মচারীও নন বিশ্ববিদ্যালয়ের। দোকানদার একজন। সাধারণ, নিরাভরণ একটি চা-দোকানের মালিক। কিন্তু জানত ওই শত্রুরা যে মধুদা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অপরিহার্য অংশ।

বানিয়ে বলবার উপায় নেই, মধুর দোকান যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃৎপিণ্ডের একটি স্পন্দন। বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করার চেষ্টা অবশ্যই অসম্পূর্ণ থাকত যদি মধুদাকে হত্যার চেষ্টা না করা হতো। হানাদারদের হিসাবে ভুল ছিল না। তারা এমনও ভেবেছিল যে, বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষের সব বই ধ্বংস করবে। মধুদাকে তারা সহ্য করবে কেন! একাত্তরে মধুর দোকান পুরাতন মেডিকেল কলেজ এলাকায় নেই। বিশ্ববিদ্যালয় তখন নীলক্ষেতে, মধুর দোকানও সেখানেই। মধুদাকে হত্যা করেছে যে পাকিস্তানি বাহিনী, ওই দোকানও তারা উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। বোধ হয় জুন-জুলাইয়ে। চিন্তা-চেতনার ওই প্রজনন ভূমিটাই রাখবে না, দেবে একেবারে অবলুপ্ত করে। যন্ত্রপাতি নিয়ে এসেছিল তারা। মধুর দোকানের আশপাশেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত, ওখানেই স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্তুতি, পাকিস্তানবিরোধী যত স্রোত, যত চাঞ্চল্য কোনোটাই মধুর দোকান বাদ দিয়ে নয়। এসব জানা ছিল হানাদারদের। তাদের গোয়েন্দা বাহিনী ছিল। মধুর দোকানেও নিশ্চয়ই আসত বাহিনীর সদস্যরা, নানান বেশে।

কিন্তু ভাঙতে পারেনি। কারণটা ছিল অপ্রত্যাশিত। যখন তারা প্রস্তুত, শুরু করবে কাজ সে মুহূর্তে ছুটে এসেছিলেন উর্দু ও ফারসি বিভাগের প্রধান ড. আফতাব আহমদ সিদ্দিকী। একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতেন তিনি। কল্পনা করতে পারি যে, এভাবেই হেঁটেছিলেন তিনি সেদিন। এসে বলেছেন থামতে। অবাঙালি তিনি, অবাঙালি হানাদারদের উর্দু ভাষাতেই আরেক ইতিহাসের কথা বলেছিলেন তিনি সেদিন। যেখানে মধুর দোকান এখন, সেখানেই একদিন মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল, ১৯০৬ সালে। নবাববাড়ির সম্পত্তি ছিল ওটি। ওইখানে বসেছিল মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার। আফতাব আহমদ সিদ্দিকী বুঝিয়েছিলেন তাদের। হানাদাররা নিবৃত্ত হয়েছিল। একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি নিশ্চিহ্ন করা বোধ হয় ঠিক হবে না, হয়তো ভেবেছিল তারা। বিশেষ করে ওই ইতিহাস যখন তাদের পক্ষেরই। মুসলিম লীগের।

ওই ভাবেই মধুর দোকান বাঁচল, মধুদা না বাঁচলেও। দোকানের ওই বেঁচে যাওয়া ইতিহাসের পরিহাস যেন। মধুদা নিহত হলেন পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে, তার দোকান বাঁচল পাকিস্তানের স্মারক হিসেবে। পরিহাসটি আরও বিস্তৃত বটে। কেননা সত্য দুটিই। ওইখানেই ওই দোকানের কাছেই পাকিস্তানের জন্ম, আবার ওইখানেই পাকিস্তানের মৃত্যু। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়, তার পরে মুসলমানদের সন্তুষ্ট করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা; আরও পরে পাকিস্তান আন্দোলন এবং সে আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণÑএসবই ঐতিহাসিক সত্য। আবার সত্য এও যে, পাকিস্তান ভাঙার আন্দোলন এবং তার ভাঙার ঘটনাÑ এ দুয়ের সূত্রপাতও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই। সাতচল্লিশের আগের ছবিটা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। কিন্তু দোকান ছিল, মধুদার আগে তার পিতা আদিত্য দোকান চালাতেন, শুনেছি আমরা। তখন মুসলমান ছাত্রদের আধিপত্য ছিল না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে; সত্য তা-ও। দোকানে তাদের আনাগোনা কম ছিল, নিশ্চয়ই। সংখ্যায় তারা অল্প, তা ছাড়া অধিকাংশই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, চা-নাশতা হয়তো বিলাসিতার পর্যায়ে পড়ত, তাদের জন্য। তবু মুসলিম ছাত্ররা ছিল এবং তাদের অধিকাংশই ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। নাজির আহমদ শহীদ হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই। তিনি পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন।

অবিভক্ত বাংলার কারণেই একদিন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল। বাঙালি মুসলমান যেভাবে ভোট দিয়েছিল পাকিস্তানের পক্ষে, অবাঙালি পাকিস্তানিরা সেভাবে দেয়নি। পাকিস্তান ভাঙার আন্দোলনও পরে বাঙালিরাই করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, জড়িত ছিল তারা ভাঙার সঙ্গেও। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থাকা মানেই তো মধুর দোকানের থাকা। পরস্পরবিরোধী ওই দুই ঘটনাÑ প্রতিষ্ঠা ও ধ্বংসÑ একটি স্বাভাবিকতার সূত্রে প্রোথিত বটে। সূত্রটা হলো, মধ্যবিত্তের বিকাশ। বাংলার মুসলমান মধ্যবিত্ত পাকিস্তান চেয়েছিল মুক্তির আশায়, সে মুক্তি আসছে না দেখে তারা প্রতিষ্ঠা করতে চাইল স্বাধীন বাংলাদেশের। মধুর দোকান রইল ওই ঘটনাধারার সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে।

  • ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা