সিরিয়া
ডেভিড হার্স্ট
প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:০৩ এএম
ডেভিড হার্স্ট
কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার নিরিখে অন্য ভূখণ্ডের অস্থিতিশীলতার তুলনা করতে পারবেন না, যদিও দুই অঞ্চলে একই প্রভাব বিদ্যমান থাকে। সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক উত্থানে গোটা বিশ্ব নড়েচড়ে বসেছে। বিগত কয়েক বছর ধরেই তারা সিরিয়ায় শক্তিমত্তা দেখিয়ে আসছে। তাহরির আল শাম এবং অন্য বিদ্রোহী গোষ্ঠী আলেপ্পো দখলের পর থেকেই মূলত পালাবদল ঘটে। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ২০১১ সালের পর এবারই প্রথম এত ভয়াবহ বিপ্লবের মুখে পড়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। জটিল একসময়ে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে। কারণ লেবানন-ইসরায়েলের অস্ত্রবিরতির মতো নাজুক সময়েই এই বিদ্রোহ সফলতার মূল চাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েলের ঘন ঘন আক্রমণে আসাদের প্রতিরক্ষা এমনিতেই নাজুক ছিল। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ এক ভয়াবহ লড়াইয়ে ব্যস্ত। তাদের প্রধান নেতৃত্বও বিলুপ্তির পথে। এ বিষয়ে একটি জনপ্রিয় তত্ত্ব হলো, সিরিয়ায় হিজবুল্লাহ লড়াই করার সময় ইসরায়েলি গুপ্তচররা কোনোভাবে বিদ্রোহীদের সঙ্গে আঁতাত করার সুযোগ পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানেও কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এই অভিযানের মাধ্যমে বেইরুতে লেবাননের ঘাঁটির নির্ভুল ঠিকানা তারা জোগাড় করতে পেরেছে।

পাশার দান উল্টে গেছে এখন। ইসরায়েলের তরফে বড় হামলার মুখে ইরান। ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ক্ষেত্রে তাদের পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা দেবেন। ইসরায়েল গাজা ও লেবাননÑ এই দুই অংশেই তাদের অভিযান জোরালো করছে। এখন তারা আঞ্চলিক শত্রু ইরানের সঙ্গে টক্কর দেবে এমনটি অনুমান করা যায়। মূলত অন্য আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার কারণে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নাজুক হয়ে ওঠে। সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা এই নাজুক অবস্থা বুঝতে পারেননি। অথচ বিগত আঠারো মাস ধরেই সিরিয়ার অবস্থা নাজুক। কিন্তু তা আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। যুদ্ধ পরিস্থিতি থামানোর উদ্দেশ্যে তুরস্ক, রাশিয়া এবং ইরান আস্তানা প্রসেস চালু করে। আর এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সিরিয়ার ভেতরে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে শুরু করে। আস্তানা প্রসেসের মাধ্যমে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি কমানোর ব্যবস্থাই নিশ্চিত করতে পেরেছিল। এজন্য বিগত ৪ বছর সিরিয়ার সীমান্ত কিছুটা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু অন্তত ৫০ লাখ মানুষ উত্তর সিরিয়ায় প্রবল দারিদ্র্যে দিনাতিপাত করেছে। তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তাও ছিল না। অন্তত ২০ লাখ মানুষ ক্যাম্পে বাস করতেন।
বিদ্রোহের নেতা আবু মোহাম্মদ আল জোলানির জন্ম গোলান মালভূমিতে। সিরিয়ার সরকারের উপদেষ্টার এই সন্তান নাইন ইলেভেনের সময় সক্রিয় ছিলেন। ২০০৩ সালে তিনি সারায়া আল মুজাহিদিনে যোগ দেন। এই গোষ্ঠীটি ইরাকের মোসুলের অন্যতম ত্রাস হয়ে ওঠে। এই গোষ্ঠী পরবর্তীতে আইএস হয়ে ওঠে। জোলানিকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্প বাকায় আটকে রাখা হয়। ওই সময় ইরাকের জিহাদিদের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০১১ সালে জোলানি ছাড়া পাওয়ার পর সিরিয়ায় অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ক্রমেই সশস্ত্র বিপ্লব হয়ে ওঠে। আসাদ এই সুযোগ নিতে চাচ্ছিলেন। সিরিয়া জোলানিকে আইএসকে পুনর্জাগরণের জন্য আবু বকর আল বাগদাদির উত্তরসূরি হিসেবে মেনে নেয়। একসময় নুসরা ফ্রন্টের জন্ম। আস্তে আস্তে ২০১৬ সালে তিনি তার বিদ্রোহী গোষ্ঠী গড়ে তোলেন এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে জিহাদের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। প্রশ্ন হচ্ছে, জোলানি কি প্রথাগত জিহাদের পন্থা থেকে কি সরে এসেছেন? তিনি কি বাস্তবেই আইএস-এর কারিগর হতে চান নাকি রিব্র্যান্ড করতে চাচ্ছেন?
সিরিয়ার ইদলিবের যুদ্ধ অনেকটাই জোলানিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত রবার্ট ফোর্ড জোলানির গোষ্ঠীকে জঙ্গি সংগঠনের তালিকায় নথিভুক্ত করেন। তবে ২০১১-১২ সালে তারা যেমন ছিল এখন আর তেমন নেই। ওয়াল স্ট্রিটে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফোর্ড জানান, ‘ওরা এখন খ্রিস্টানদের চার্চ বানানোর অনুমতি দিচ্ছে, যা জিহাদিরা সচরাচর করে না।’ সম্প্রতি গোষ্ঠীটির একজন কমান্ডার আর্মেনিয়ান এবং খ্রিস্টানদের অধিকার রক্ষার কথা জোরেশোরেই জানিয়েছেন। বেশ কয়েকটি ভিডিওতে তাদের ক্রিসমাস উদযাপন করতে দেওয়ার প্রস্তুতির দৃশ্য দেখা গেছে। খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করলেই যে তারা পুরোনো পথ থেকে ফিরেছে এমনটি বলা যাবে না। তবে সিরিয়ার মতো একটি স্থানে এমনটি প্রয়োজন ছিল। ইউনিভার্সিটি অব লসেনের সুইশ সিরিয়ান অধ্যাপক জোসেফদ ডাহরার জানান, ‘ওরা প্রথমে জাতিগত ঐক্য গড়ার দিকে মনোযোগ বাড়াতে চায়। তাহলে কি তারা উগ্রবাদী নয়? অবশ্যই তারা উগ্রবাদী’। কারণ আলাউইজ আর ড্রুজ গোষ্ঠীগুলোকে তারা দমন করছে। বিশেষত, সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মির তুরস্ক পরিচালিত বিদ্রোহীদের প্রতি তাদের বড় ক্ষোভ রয়েছে। কুর্দদের দমনের বিষয়টি নিয়ে তারা এমনিতেও বহুদিন ধরেই চিন্তিত। আলেপ্পো এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা দখলের পর অন্তত ১ লাখ কুর্দিশ মুসলমান বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ২০১৬ সালের মতো এবার কিছু ঘটেনি। কারণ বিদ্রোহীরা কুর্দিশদের নিজ বাড়িতেই থাকতে বলে। এই বিপ্লবের পেছনে তুরস্কের বড় হাত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আংকারা থেকে সবুজসংকেত না পেলে এমন বিপ্লব হতো না। তুরস্ক এসএনএ নামক একটি গোষ্ঠীকে অস্ত্র সরবরাহ করে। তা ছাড়া জোলানির গোষ্ঠীর সঙ্গেও তুরস্কের রয়েছে আলাদা সম্পর্ক। তবে তুরস্ক এতটুকু নিশ্চিত করেছে, তাদের সীমান্তে যেন কোনো অস্থিতিশীলতা না ঘটে।
তুরস্কে এমনিতেই ত্রিশ লাখ শরণার্থী রয়েছে। অধিকাংশই আলেপ্পো এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১১ সালের বাস্তবতা আর এখনের বাস্তবতা এক নয়। তুরস্কে এখন বাড়তি শরণার্থী নেওয়া তাদের সামাজিক ব্যবস্থার জন্য স্বাস্থ্যকর হবে না। বিশেষত, আরবদের বিষয়ে তুর্কিদের বর্ণবাদী ও উগ্রবাদী মনোভাবও একটি নেতিবাচক দিক। উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার বিশাল একটি অংশ পিপলস প্রটেকশন ইউনিটস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রশাসনিক ব্যবস্থাও তেমন। ওখানে কুর্দিস ওয়ার্কার্স পার্টি সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে একটি বড় সক্রিয় অংশ হিসেবে কাজ করবে। কারণ তুরস্কের সঙ্গে আঁতাত করা অংশের সঙ্গে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তারা লড়াই চালাচ্ছে। শরণার্থী শঙ্কা এখন তুরস্কের জন্যও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাশার আল আসাদ নিজেও তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে রাজি হননি। এমনকি এই বিদ্রোহের সময় রাশিয়ার সঙ্গীও রাজনৈতিক আলোচনায় তার আগ্রহ ছিল না। এখন সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার একটিই উপায় রয়েছে, বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানো। এ কাজটি বাশারের পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।
দীর্ঘদিন বাশার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের কথা শুনতে নারাজ ছিলেন। দুজন রিয়াদে এক সম্মেলনে সাক্ষাৎ করলেও এ বিষয়ে আলোচনা করেননি। পুতিন একটি সংলাপের আয়োজনের আহ্বান করলেও বাশার তা শোনেননি। আলেপ্পোতে হামলার পর তুরস্ক ভেবেছিল বাশার হয়তো বার্তা পাঠাবেন। তা হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য তুরস্ককে বিশ্বাসঘাতক রায় দিয়েছেন। তারা সিরিয়ার বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় হওয়ার কথাও জানিয়েছেন। ইরান, তুরস্ক এবং রাশিয়ার মধ্যে একটি সামিট হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তুরস্ক অবশ্যই এই ফোরামকে এড়াবে না। উত্তর সিরিয়ায় তুরস্ক অবশ্য কার্যকর না থাকলেও এখন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাদের কাজ করতে হবে। তবে ইরান যদি সিরিয়ার সঙ্গে লেবাননের সংকট গুলিয়ে ফেলে তাহলে ভুল করবে। সিরিয়ার সংকট সেই ২০১৬ সাল থেকেই বিদ্যমান। তবে ভূ-মধ্যসাগরের নেতারা বাশারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা পূর্ণ সহযোগিতার কথাও জানিয়েছেন।
ইসরায়েলও এই যুদ্ধকে নিজেদের বিজয় ভাবলে ভুল করবে। এই মুহূর্তে হিজবুল্লাহ ও ইরাক কেমন ভূমিকা রাখবে তা বলা কঠিন। ইসরায়েল ফিলিস্তিনে যুদ্ধ বন্ধের জন্য বাধ্য হবে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের পার্শ্ববর্তী এতগুলো অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা জারি রাখা তাদের জন্যও ইতিবাচক হবে না। আসাদের পতনে তাদের খুশি হওয়ার কিছু নেই। এ কথা সত্য, সিরিয়ার সীমান্তে বাশারের সময় ইসরায়েল অভিযান চালাতে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে। কিন্তু সিরিয়ার বিদ্রোহীদের আচরণ লক্ষ করলে ইসরায়েলের মতিভ্রম ছুটবে। কয়দিন আগেও ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদ্রোহীদের সঙ্গে জোট বেঁধে তুরস্ক ও ইরানকে সামলানোর নীতি উত্থাপন করেছিলেন। এখন এই নীতি কতটা বিভ্রান্তিকর তা হয়তো তারা বুঝতে পেরেছে। ফিলিস্তিনের সঙ্গে সমঝোতা না হলে মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ এক যুদ্ধই তাদের নাকের ডগায় ঝুলতে থাকবে।
মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন