সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৮:৪০ এএম
বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বিদেশ যাওয়ার পথ সুগম ও সহজ নয়। আর যারা অবৈধভাবে বিদেশযাত্রার জন্য প্রস্তুতি নেন, তাদের জন্য তা আরও ঝুঁকিপূর্ণ। সে পথ কতটা বিপদসংকুল তা ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন। যে স্বপ্ন পূরণের জন্য মানুষ ঝুঁকি নিয়ে অবৈধপথে বিদেশযাত্রার জন্য পথে নামেন, তা অধিকাংশ সময় স্বপ্নের মৃত্যু ডেকে আনে। প্রায়ই ঝুঁকি নিয়ে বিদেশযাত্রা করা মানুষের দুর্ভোগ ও অমানবিক পরিবেশে মানবেতর অবস্থায় থাকার খবর সংবাদমাধ্যমে আসে। সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার সতর্কীকরণসহ অবৈধপথে বিদেশযাত্রা বিষয়ে নানারকম ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করার প্রচারণাও যে এক্ষেত্রে কাজে আসছে না, তাও স্পষ্ট হয় সংবাদমাধ্যমে অবৈধ অভিবাসন সম্পর্কিত প্রতিবেদনগুলোতে। ৮ ডিসেম্বর ইউএনএইচসিআরের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর একটি সংবাদ শিরোনাম ‘সমুদ্রপথে ইতালি, ১০ মাসে শীর্ষে বাংলাদেশিরা’। খবরটি একই সঙ্গে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার। যে বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের ভাগ্যবিড়ম্বিত শ্রমিকরা ভাগ্য পরিবর্তনের আশাায় নামছে, তা যে মৃত্যুফাঁদ। আমাদের স্মরণে আছে, লিবিয়া থেকে নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে ডুবে মারা যাওয়া ৪০ বাংলাদেশির কথা। এর আগে ২০১৫ সালের আগস্টেও ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশি নাগরিকদের ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকাডুবিতে মৃত্যুর ঘটনার উদাহরণ রয়েছে। ইউরোপযাত্রার পথে সাহারা মরুভূমি পাড়ি দিতে গিয়েও অনেকের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ইউরোপ নয়, পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে যাওয়ার জন্যও আমাদের শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন। থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গণকবরের কথাও অবিদিত নয়।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে অক্টোবরের মধ্যে ইতালি যাওয়া অভিবাসীদের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক গেছেন বাংলাদেশ থেকে। এই সময় সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়া ৪৯ হাজার ৬৯১ অভিবাসীর মধ্যে ১২ হাজার ৭০২ জনই বাংলাদেশি, যা দেশটিতে মোট আগমনের ২০ শতাংশ। ৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) সমুদ্রপথে এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপ অভিমুখীদের নিরাপত্তার শঙ্কা থেকে সমুদ্রে অনুসন্ধান ও উদ্ধার প্রক্রিয়া জোরদারের পাশাপাশি নিয়মিত অভিবাসনের পথ সহজ করতেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) একটি প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যত মানুষ ইউরোপে ঢুকেছে, তার মধ্যে ২১ শতাংশ বাংলাদেশি। ইউরোপীয় বর্ডার অ্যান্ড কোস্ট গার্ড এজেন্সির (ফ্রন্টেক্স) তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে ১৩ হাজার ৪১৭ বাংলাদেশি বিভিন্ন পথে অবৈধ উপায়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন।
এই যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কর্মীদের বিদেশযাত্রা, তার পেছনে রয়েছে একটু সুখের আশা। বাড়তি কিছু অর্থ রোজগার, যা দিয়ে দেশে পরিবারের সদস্যদের জীবনে নিরাপত্তা আসবে, সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য আসবে। শুধু ইউরোপ নয়, পৃথিবীর উন্নত প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রেই শ্রমিকের প্রয়োজন। জনসংখ্যার অনুপাতে তাদের শ্রমিকের সংখ্যা কম। এই চাহিদা পূরণ হয় অনুন্নত দেশ থেকে যাওয়া শ্রমিকের মাধ্যমে। আমাদের যে শ্রমিকরা পরিবারের একটু সুখ আর সমৃদ্ধির জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশযাত্রার জন্য পথে বেরুচ্ছেন, তাদের বৈধ পথে পাঠানোর জন্য সরকারকে আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে। অদক্ষ শ্রমিকের চেয়ে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা ও পারিশ্রমিক বেশি, তাই দেশগুলোর চাহিদা অনুযায়ী শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বিদেশগামী কেউ যেন দালালদের খপ্পরে পড়ে বিপদগ্রস্ত না হন, সর্বস্বান্ত না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
অবৈধ পথে বিদেশগামীরা শুধু নিজেরাই বিপদগ্রস্ত হচ্ছে না, তাদের মাধ্যমে বহির্বিশ্বে আমাদের মর্যাদা এবং সুনামও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বাংলাদেশ সম্পর্কেও তৈরি হচ্ছে নেতিবাচক ধারণা। যার ফলে শ্রেণি-নির্বিশেষে সব বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার পথেও তৈরি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য অবশ্যই অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার পথগুলো বন্ধ করতে হবে। যে স্বপ্নের হাতছানিতে ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকরা বিদেশ যাত্রা করছেন, তা যেন সাগরে-মরুতে-জঙ্গলে তাদের করুণ পরিণতি ডেকে না আনে তা নিশ্চিত করতে সকল ধরনের দালাল চক্রকে নিষ্ক্রিয় করতে হবে। মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে, অভিযুক্তদের শনাক্ত করে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সেই সঙ্গে গণমাধ্যমেও অবৈধ পথে বিদেশযাত্রার ভয়ংকর দিকগুলো তুলে ধরে মানুষকে নিরুৎসাহিত করতে উদ্যোগী হতে হবে। জনসচেতনতাই পারে অবৈধভাবে বিদেশযাত্রার ঢল থামাতে এবং মানুষকে নিরাপদ রাখতে।