ডেঙ্গু পরিস্থিতি
ড. কবিরুল বাশার
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৮:৩৮ এএম
ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ৮৩ হাজার ছাড়াল, মৃত্যু ৫০০ ছুঁইছুঁই শিরোনামে ৩ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই খবরটি উদ্বেগজনক। সেই সঙ্গে এত মৃত্যুর খবর গভীর বেদনারও। এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে যারা মৃত্যুবরণ করছে তাদের বড় অংশই কর্মক্ষম মানুষ। এ রোগটিতে ডিসেম্বরের প্রথম দিন রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর এসেছে সংবাদমাধ্যমে; যার ফলে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯৭-এ। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭০৫ জন, ফলে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৯৩ হাজার ৫৬; যাদের মধ্যে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়া পেয়েছে ৮৯ হাজার ৭৮০ জন। গত বছরের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা কম হলেও আক্রান্ত হয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে বলে মন্তব্য করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এত মৃত্যুর কারণ হিসেবে দেরিতে হাসপাতালে যাওয়াকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

সাধারণত বর্ষা মৌসুমেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি পরিলক্ষিত হলেও এবার বর্ষার পরও টানা কয়েক মাস ধরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পরিলক্ষিত হচ্ছে। ৩০ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এবার শীতেও ভোগাবে ডেঙ্গু। এর পার্শ্বপ্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে ঢাকার অনেক হাসপাতাল। ঢাকার বাইরেও এবার ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি। ওই প্রতিবেদনেই আরও বলা হয়েছিল, নভেম্বরের ২৯ দিন ডেঙ্গুর রেকর্ড ১৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ষড়ঋতুর এ দেশ এখন বছরব্যাপী ডেঙ্গু আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধারণা করা হয়েছিল, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ নাগাদ হয়তো ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা কমবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। স্বাভাবিকভাবে শীতকালে সাধারণত ডেঙ্গুর সংক্রমণ কমে আসে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় মশার প্রজনন কম হয়। তবে এ বছর পরিস্থিতি ব্যতিক্রম। কিন্তু তারপরও পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যখাতের যথাযথ পদক্ষেপে ঘাটতির বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে ইতোমধ্যে বহুবার উঠে এসেছে। ব্যর্থতা আছে নাগরিক সমাজেরও।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে ব্রুটো ইনডেক্স এখনও ২০-এর ওপরে রয়ে গেছে, যা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এডিস মশার ঘনত্ব এমন থাকার কারণেই ডিসেম্বরে শীতের মধ্যেও ডেঙ্গুর সংক্রমণের ঝুঁকি কমছে না। তবে আশা করা যায়, জানুয়ারির মাঝামাঝি ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে পারে। বিশ্বে উষ্ণ আর্দ্রীয় অঞ্চলের অনেক দেশে ডেঙ্গু রোগী আছে। সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি রোগী ব্রাজিলে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য, ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। গত বছর মৃত্যুহার ছিল ০.৫৩, যা এ বছর কিছুটা কমে এলেও তা অনেক বেশি মাত্রায় রয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধযোগ্য রোগ। এর উৎস কিংবা কারণ যেহেতু সবারই জানা সেহেতু পরিকল্পিতভাবে যূথবদ্ধ প্রয়াসে এর সুফল দৃশ্যমান করা কঠিন তো নয়। কিন্তু সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রশ্ন হচ্ছেÑ এ বছর শীতেও কেন ডেঙ্গুর প্রভাব বেশি থাকছে এবং তার বিজ্ঞানভিত্তিক কারণই বা কী? সেই সঙ্গে আরও একটি বড় প্রশ্ন রয়ে যায়। তা হলোÑ এ থেকে বাঁচার উপায়ই বা কী? কীভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে? এ রকম নানা প্রশ্ন সাধারণ নাগরিক এবং মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলে ডেঙ্গু রোগের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। মূলত ডেঙ্গু নিয়ে অবহেলাই আমাদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনছে। সেই সঙ্গে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংসের দিকে আমাদের মনোযোগ কম। জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য বিশেষ কর্মসূচিও নেই। কয়েক বছর ধরেই ঢাকা মহানগরীর মশার ঘনত্ব বৃদ্ধির কথা জানানো হচ্ছে। কিন্তু এডিস মশা নির্মূলে কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা নজরে আসেনি। এখনও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের গৃহীত পদক্ষেপ অনেকটাই গতানুগতিক এবং দায়সারা। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়েরও নজর এড়িয়ে যাওয়ার নয়। তবে প্রধানত এডিস মশার প্রজনন রোধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার ফলেই সংকট বেড়েছে।
অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিক্ষা নিচ্ছি না। আমাদের সামনে যে ঘাটতিগুলো নজরে আসছে, তা যথাযথভাবে পূরণের চেষ্টা করছি না। এটি আমাদের নতুন সমসা নয়। অতীত থেকে আমরা শিক্ষা নিতে অভ্যস্ত নইÑএটাই তো প্রতীয়মান হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গুর ভয়াবহতার জন্য জলবায়ু পরিবর্তন যেমন দায়ী তেমন দায় এড়াতে পারে না নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায়সারা পদক্ষেপও। আমরা দেখছি, এডিস মশার প্রজনন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ায় যেমন ঘাটতি রয়ে গেছে তেমন ডেঙ্গু নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা না করা ও জনসচেতনতার অভাবও এত বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা তার প্রজনন এবং বসবাসের জন্য নতুন নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ায় তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বাড়ার সঙ্গে এডিস মশার বংশ বৃদ্ধি এবং ডেঙ্গুর সংক্রমণও বাড়ছে। কারণগুলো জানা সত্ত্বেও ডেঙ্গু মোকাবিলায় সফল না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চয় প্রশ্নবোধক।
যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ডেঙ্গুর সরাসরি সম্পর্ক নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি, তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, করোনাভাইরাসের মতো ডেঙ্গু ভাইরাসও পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। ডেঙ্গুর প্রকোপ কম বা বেশি হওয়ার পেছনে জনসাধারণের সচেতনতা, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে তাদের সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে ব্রুটো ইনডেক্স এখনও ২০-এর ওপরে রয়ে গেছে।
এডিস মশার ঘনত্ব এমনই থাকলে ডিসেম্বরে শীতের মাঝেও ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি কমবে না। যদি আর বৃষ্টি না হয়, তাহলে হয়তো এডিস মশা কিছু জায়গায় সীমাবদ্ধ হবে, যেখানে বৃষ্টি ছাড়াই পানি জমা হয়। মাঠ পর্যায়ে আমাদের গবেষণাদলের কাজের ফলাফল থেকে যা দেখছি, নির্মীয়মাণ ভবনের বেসমেন্টে জমা পানি, যেসব এলাকায় পানির সংকট আছে, তাদের টয়লেট এবং গোসলখানায় ড্রাম ও বালতিতে জমিয়ে রাখা পানি, বাড়ির ওয়াসার মিটার সংরক্ষণের জন্য নির্মিত চৌবাচ্চায় জমা পানি এবং বহুতল ভবনের বেসমেন্টে পার্কিংয়ে গাড়ি ধোয়ার জায়গায় জমা পানি শীতকালে এডিস মশা প্রজননের জন্য অতি জুতসই স্থান।
শীতের সময় বৃষ্টি না থাকায় রাস্তাঘাট, উন্মুক্ত স্থানে যে ছোটবড় পাত্র পড়ে থাকে, সেখানে পানি না জমার কারণে মা মশা খুঁজে খুঁজে সেসব স্থানে ডিম পাড়বে, যেখানে পানি জমার জন্য বৃষ্টির প্রয়োজন হয় না। এ ক্ষেত্রে তারা ড্রেন বা বদ্ধ যেকোনো পানি ডিম পাড়া বা তার প্রজননের জন্য ব্যবহার করতে পারে। তাই শীতকালে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রামকে এসব প্রজননস্থলগুলো বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হবে। বিশ্বাস করি, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় প্রশাসন এবং নগরবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি টেকসই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত দুই সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের সহযোগিতায় জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এবং ডেকে আনতে পারে বিপর্যয়।
ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষা পেতে বছরব্যাপী মশক নিধন ও অন্যান্য কার্যক্রম জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই। ডেঙ্গুর উৎস পুরোপুরি নির্মূল করতেই হবে। নাগরিক সমাজকেও সচেতন হতে হবে এবং দায়িত্ব নিয়ে প্রতিটি পরিবার ও প্রতিষ্ঠানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। সম্মিলিত প্রয়াসে ডেঙ্গু মোকাবিলায় নিতে হবে যথাযথ ব্যবস্থা। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই ডেঙ্গু সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান হতে পারে, যা শুধু ডেঙ্গু নয়, অন্যান্য মশাবাহিত রোগের প্রতিরোধেও কার্যকর হবে। কিছু ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপের ব্যাপারে যা দৃশ্যমান তা প্রীতিকর নয়। যূথবদ্ধ প্রয়াস ছাড়া এমন গুরুতর পরিস্থিতির মোকাবিলা কঠিন। শুধু সরকার বা সরকারি কর্তৃপক্ষের দোষ দিয়ে লাভ নেই। নাগরিক সমাজেরও দায় এড়ানোর পথ নেই।