শ্রদ্ধাঞ্জলি
নাছিমা বেগম
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৮:৩৫ এএম
নাছিমা বেগম
আমাদের সমাজ ও সাহিত্যাঙ্গনে নারীজাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন অনন্য আসনে অধিষ্ঠিত। বেগম রোকেয়ার জন্মের সময় ভারতবর্ষে নারী বিশেষ করে মুসলিম নারীর অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মুসলিম নারীকে পর্দার নামে কার্যত কঠোর অবরোধের মধ্যে বন্দিজীবন যাপন করতে হতো। শিক্ষার আলো তাদের জন্য ছিল নিষিদ্ধ। সে রকম এক প্রতিকূল পরিবেশে তিনি নারী শিক্ষার বিস্তার বিশেষ করে মুসলিম বালিকাদের শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে সাহসী ও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। বেগম রোকেয়া স্বপ্ন দেখেছিলেন নারীস্থানের। যেখানে তিনি নারীকে ক্ষমতায়িত দেখেছেন; নারী শাসককে দেখেছেন বিদ্যোৎসাহী। নারীস্থানের মহারানী তার রাজত্বের সব নারীকে সুশিক্ষিত করার লক্ষ্যে গ্রামাঞ্চলেও বিদ্যালয় স্থাপন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য দুটি মহাবিদ্যালয় স্থাপন করেন। যেখানকার ছাত্রীরা জ্ঞানবিজ্ঞানের সব বিষয়ে গবেষণা করে নিত্যনতুন উদ্ভাবন করছেন।

ভাবতে অবাক লাগে,
যে নারী জমিদারকন্যা হয়েও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ পাননি, বরং মাত্র
পাঁচ বছর বয়স থেকেই যাকে কঠোর অবরোধের মধ্যে এক প্রকারের বন্দিজীবন কাটাতে হয়েছে;
আনন্দময় শৈশব-কৈশোর বলতে যার কিছুই ছিল না; খেলার মাঠে দুরন্তপনা; খোলা আকাশের নিচে
দাঁড়াবার কোনো সুযোগই যেখানে মেলেনি; সেই নারী কীভাবে এত সাহসী স্বপ্ন বুনতে পারলেন!
অদম্য চেষ্টায় শিক্ষার আলোয় নিজেকে আলোকিত করেছিলেন বেগম রোকেয়া। তিনি ছিলেন কোমলে-কঠোরে
শুদ্ধময় ব্যক্তিত্বের অধিকারী এক নারী। যিনি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কঠোর
অবরোধ প্রথার কুসংস্কারের বেড়াজাল ভেঙে সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করেছেন। চারিত্রিক
দৃঢ়তা ও সাহস নিয়ে নারীদের জাগরণের জন্য তিনি শুধু এগিয়েই গেছেন। অন্যায়ের কাছে কখনোই
মাথা নত করেননি। শিশুকাল থেকেই তিনি কঠোর পর্দার ভেতরে বেড়ে ওঠায় তার জীবনে প্রাতিষ্ঠানিক
শিক্ষার কোনো সুযোগ না মিললেও বড় বোন ও বড় ভাইয়ের আন্তরিক সহযোগিতায় বাংলা ও ইংরেজিতে
বেগম রোকেয়ার হাতেখড়ি মিলেছিল। তাদের সহায়তায় তিনি এ দুই ভাষাতেই পারদর্শী হয়ে
উঠছিলেন। পরে বিবাহিত জীবনে স্বামী সাখাওয়াত হোসেনও তার এ শিক্ষালাভের আগ্রহের উপযুক্ত
মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি রোকেয়াকে সাহিত্য রচনায় উৎসাহ এবং অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে
রোকেয়া একদিকে তার ক্ষুরধার লেখনীর সাহায্যে সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন, অন্যদিকে
প্রতিষ্ঠিত করেছেন মুসলিম বালিকাদের শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় এবং মহিলাদের আত্মসচেতন
করার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন মহিলা সমিতি। তার সাহিত্য রচনায় একদিকে যেমন রয়েছে সমাজের
অনুদারতা ও কূপমণ্ডূকতার বিস্তৃত সমালোচনা, তেমনই আছে তীব্র বেদনাবোধ ও নারীর মুক্তির
অদম্য বাসনা। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে মেয়েরা বাড়ির বাইরে পা রাখার কথা ভাবতেও পারত না,
পড়াশোনা ছিল কল্পনার বাইরে! কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তাধারা বদলে যাচ্ছে,
বদলে যাচ্ছে সমাজব্যবস্থা। আমাদের সৌভাগ্য আমাদের পড়ালেখার সময় নারীর শিক্ষার জন্য
তেমন কোনো প্রতিকূল অবস্থায় পড়তে হয়নি। বলতে গেলে কোনো বাধাই আসেনি। পরিবার থেকেও
যে সহায়তা পেয়েছি তারও কোনো তুলনা হয় না।
এখন নারী অবাধে
পড়াশোনার পাশাপাশি নানা পেশায় কাজ করছে। তবে এ পরিবর্তন হঠাৎ করেই আসেনি। ভারত উপমহাদেশের
নারীদের অন্ধকার কূপ থেকে টেনে আনতে যিনি সবার আগে হাত বাড়িয়েছিলেন, তিনি হলেন বেগম
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। আজ আমরা বাঙালি নারী যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, বেগম রোকেয়া তার ভিত
তৈরি করে গেছেন। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া রাতের আকাশে তারা হয়ে ফুটেছিলেন;
অন্ধকারে জ্বলেছিলেন প্রদীপের মতো। নিজের ভেতরের আলোর ছটায় তিনি বিংশ শতাব্দীর কুসংস্কারাচ্ছন্ন
রক্ষণশীল সমাজের শৃঙ্খল ভেঙে আলোকবর্তিকা হাতে নারীসমাজকে পথ দেখিয়েছেন।মানুষের জীবনে
বিভিন্ন রকমের আশা-আকাঙ্ক্ষা, উচ্চাভিলাষ থাকে। ভবিষ্যতের নানান রঙিন স্বপ্ন বুনতে
গিয়ে অনেকেই সফল হয় না। কিন্তু রোকেয়া ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা; তিনি সময় থেকে
অনেক দূরে দেখতে পেতেন বলেই তার স্বপ্ন বাস্তব জীবনে অভিনব রূপ নিয়ে প্রস্ফুটিত হয়েছে।
তিনি কুসংস্কারের বেড়াজাল ভেঙে কঠোর অবরোধের করাল গ্রাস থেকে নারীদের জাগ্রত করার
যে স্বপ্ন বুনেছিলেন তাতে তিনি সফল হয়েছিলেন। জীবনের এক সোনালি সকালে বেগম রোকেয়া
তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় নারীজাগরণের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন; সে স্বপ্ন বাস্তবে রূপায়ণের
জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল এবং আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে
ইসলাম। এ দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ার সুফল তিনি জীবৎকালেই দেখে গেছেন।
নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া রাতের আকাশে তারা হয়ে ফুটেছিলেন; অন্ধকারে জ্বলেছিলেন প্রদীপের মতো। নিজের ভেতরের আলোর ছটায় তিনি বিংশ শতাব্দীর কুসংস্কারাচ্ছন্ন রক্ষণশীল সমাজের শৃঙ্খল ভেঙে আলোকবর্তিকা হাতে নারীসমাজকে পথ দেখিয়েছেন।মানুষের জীবনে বিভিন্ন রকমের আশা-আকাঙ্ক্ষা, উচ্চাভিলাষ থাকে। ভবিষ্যতের নানান রঙিন স্বপ্ন বুনতে গিয়ে অনেকেই সফল হয় না। কিন্তু রোকেয়া ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা
রোকেয়া ছিলেন
শিক্ষানুরাগী বিজ্ঞানমনস্ক একজন মানুষ। ‘সুলতানার স্বপ্ন’ গ্রন্থসহ বিভিন্ন গল্প ও
নিবন্ধে তিনি আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্রমবিকাশের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা আজ বাস্তব।
আজ আমরা তার সে স্বপ্নযাত্রার সুফলভোগী ।সুলতানার স্বপ্ন ১৯০৫ সালে যখন রচিত হয়, তখন
অ্যারোপ্লেন বা জেপেলিনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না! এমনকি সে সময় ভারতবর্ষে মোটরকারও
আসেনি। বৈদ্যুতিক আলো এবং পাখা ছিল কল্পনার অতীত। এর ছয় বছর পর ১৯১১ সালে রোকেয়া
কলকাতায় আসার পর হাওয়াই জাহাজ দূর থেকে শূন্যে উড়তে দেখেছিলেন। তিনি নিজে কোনো দিন
উড়োজাহাজে উঠতে পারবেন, সে আশা না করলেও বাস্তবে সুলতানার সেই বিচিত্র স্বপ্ন তার
নিজের জীবনে ফলেছিল। ‘বায়ুযানে পঞ্চাশ মাইল’ ছোটগল্পে তার নিজের উক্তি, ‘২৫ বছর পূর্বে
লিখিত সুলতানার স্বপ্নে বর্ণিত বায়ুযানে আমি সত্যই বেড়াইলাম। বঙ্গের প্রথম মুসলিম
পাইলটের সহিত যে প্রথম অবরোধ-বন্দিনী নারী উড়িল সে আমিই।’
নারীর উচ্চশিক্ষার
জন্য আজ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্রই অবারিত প্রবেশাধিকার রয়েছে। কোথাও কোথাও
শুধু নারীর জন্য পৃথক স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। দৃঢ়চেতা রোকেয়া
প্রতিকূল সমাজের মধ্যে থেকেও আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম সমিতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে
নারীর উন্নয়নের ধারায় কর্মের যে স্রোত বইয়ে দিয়েছিলেন তা-ও দিনে দিনে প্রখর হতে
প্রখর হয়ে বয়ে চলেছে। রোকেয়ার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশেও নারীর উন্নয়ন,
ক্ষমতায়ন ও অধিকার সুরক্ষায় কত শত সরকারি-বেসরকারি দপ্তর-সংস্থা-সংগঠন গড়ে উঠেছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর,
জাতীয় মহিলা সংস্থা, জয়িতা ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ মহিলা সমিতি,
নারীপক্ষ, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ, নিজেরা করি, কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম ইত্যাদি।
আমরা দেখি, সমাজসংস্কারক এবং জ্ঞানের চর্চায় ব্রতী বেগম রোকেয়া নারীর স্বাধীনতা অর্জনে
ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে ক্ষুরধার লেখনী চালিয়ে সমাজকে জাগানোর বাণী শুনিয়েছেন। তিনি নারীকে
জজ-ম্যাজিস্ট্রেট-ব্যারিস্টার-শাসকের আসনে দেখতে চেয়েছেন; নারীর ক্ষমতায়ন চেয়েছেন।
রোকেয়ার সেই স্বপ্ন অনেকাংশেই আজ পূরণ হয়েছে। বর্তমানে
নারী জ্ঞানবিজ্ঞানের সব শাখায়ই শিক্ষালাভের পাশাপাশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং পেশায় নিয়োজিত
থেকে সাফল্য অর্জন করছে। একদিকে আপিল বিভাগের বিচারপতি, অন্যদিকে নির্বাহী বিভাগে সিনিয়র
সচিব, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের উপাচার্যসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, বিভিন্ন
সংস্থাপ্রধান, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ পেশাসহ
সব ধরনের চাকরিতে নারী অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া সেনাবাহিনী,
নৌবাহিনী, বিমান বাহিনীতে নারী কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন
করছেন। এমনকি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে তিন বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে নারী সদস্য নিয়োজিত
থেকে বিদেশের মাটিতে গৌরবোজ্জ্বল অবদান রেখেছেন। সেনাবাহিনীতে নারী মেজর জেনারেল হিসেবে
পদোন্নতি সামরিক বাহিনীতে নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বর্ণিত
প্রেক্ষাপটে প্রতীয়মান হয়, বিভিন্ন পেশায় নারীর অংশগ্রহণ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে
বেগম রোকেয়ার স্বপ্নের অতিক্রমণ ঘটেছে। কিন্তু এতসব অর্জন সত্ত্বেও এখনও নারীকে অবদমিত
রাখার পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা সমাজ থেকে পুরোপুরি নির্মূল হয়ে যায়নি।
নারীশক্তিতে তিনি পুরোপুরি বিশ্বাসী ছিলেন; তার নারীত্বের আদর্শ অনেক মহৎ ছিল। এ কিংবদন্তিতুল্য নারী তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে নারীর প্রতি সমাজের অন্যায় ও বৈষম্যমূলক আচরণের মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন। পরিবার, সমাজ, অর্থনীতিÑ জীবনের এ তিন প্রধান অনুষঙ্গে নারীকে আত্মমর্যাদাশীল হতে তিনি নারীসমাজকে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। নারী আজ ব্যবসাবাণিজ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছে। রোকেয়াকে যথার্থ সম্মান এবং আগামী প্রজন্মের কাছে তার অবদান তুলে ধরার জন্য তার স্মরণে প্রতি বছর ৯ ডিসেম্বর জাতীয় দিবস হিসেবে ‘রোকেয়া দিবস’ উদ্যাপিত হয়। সেদিনই সরকার রোকেয়া পদক প্রদান নীতিমালার আলোকে গুণী ব্যক্তিদের মধ্যে পদক বিতরণ করে। দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে গুণী ব্যক্তিদের বক্তা নির্বাচন করে স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করা হয়, তার সম্পর্কে অজানা অনেক তথ্য জানান দেওয়ার জন্য। তার আদর্শ যুগে যুগে বাংলার নারীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে। বেগম রোকেয়া নারীজাগরণের নিত্যপ্রেরণা হয়ে আছেন, থাকবেন।