আগ্রাসন
হামজা ইউসুফ
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৮:৫৪ এএম
হামজা ইউসুফ
সম্প্রতি লোয়েনস্টেইন নামে এক ব্যক্তির একটি চার এপিসোডের পডকাস্ট সিরিজ মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের নতুন একটি দিক উন্মোচিত করেছে। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী প্রযুক্তির উন্নয়নের পরীক্ষাগার হিসেবে গাজাকে ব্যবহার করছে। ফিলিস্তিনিরা যেন তাদের গিনিপিগ। তাদের এ পরীক্ষা শুধু ইসরায়েলের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষই নিশ্চিত করছে তা-ই নয়, বাণিজ্যিকভাবেও লাভবান করছে। বিশ্ববাজারে ড্রোন কিংবা উন্নত প্রযুক্তি বিক্রির সুযোগ তাদের উন্মুক্ত হচ্ছে। একটি পডকাস্ট ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় সামরিক প্রযুক্তির পরীক্ষানিরীক্ষার বিষয়ে যে বক্তব্য ও প্রমাণ হাজির করেছে তা এড়ানোর সুযোগ নেই। সামরিক আইন বাণিজ্যিকীকরণের প্রক্রিয়াও ইসরায়েল গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিল।

ইসরায়েলের রাজনৈতিক আগ্রাসনকে শক্তিশালী করছে সামরিক শক্তি। কিন্তু এ নিপীড়ন তাদের লাভও এনে দিচ্ছে। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর প্রযুক্তিগত আবিষ্কার পরীক্ষা করা হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের ওপর। বিশ্ববাসী এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা দেখতে পারছে। বিশেষত প্রথমে উল্লেখ করা বইয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত অনেক তথ্য দেওয়া হয়েছে। গাজায় পদ্ধতিগতভাবে গণহত্যা চালানো হচ্ছে। ১৪ মাস ধরে এ যুদ্ধ চালানোর জন্য ইসরায়েল শুধু মার্কিন সহায়তাই নয়, নিজস্ব লাভের সুযোগও বের করে নিয়েছে। ইসরায়েলের সামরিক কর্মকর্তাদেরও কিছু কৌশলগত লক্ষ্য দেখা গেছে। দখল, ধ্বংস আর নিপীড়ন। ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের বিষয়টিই সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষত ‘আফটার অক্টোবর সেভেন’ নামে একটি পডকাস্টেও এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য মিলেছে। ওই পডকাস্টে দেখানো হয়, গাজার আশ শিফা হাসপাতালে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও টেক কোম্পানিগুলো মিলিপোল প্যারিসের আয়োজন করে। বৃহৎ এ আয়োজনে ১৬০টি দেশ থেকে ৩০ হাজার অতিথি আসে। তাদের গাজায় রিমোট কন্ট্রোল করা অস্ত্র যেমন স্মার্ট শুটার দেখানো হয়। পশ্চিম তীর ও গাজায় কতটা নিখুঁতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তা-ও দেখানো হয়। ফিলিস্তিনিদের দিয়ে নিজেদের সামরিক পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা এভাবেই বাড়িয়ে নেওয়া যায়। ইসরায়েলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যম হারেৎজ প্রতিবেদনে জানায়, বিশ্বের অনেক দেশই ইসরায়েলের সামরিক প্রযুক্তির প্রতি আকর্ষিত হতে শুরু করেছে। গাজা ও লেবাননে অস্ত্রগুলো পূর্ণশক্তিতে ব্যবহৃত হওয়ায় এগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কে ক্লায়েন্টরা নিশ্চিত হতে পারছে।
বাস্তবতা সত্যিই ভয়াবহ। গাজায় মানুষকে অবরুদ্ধ করে রাখা হচ্ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন করে ভয়াবহ অপরাধ করা হচ্ছে। আশ শিফা হাসপাতালে জ্বালানি সরবরাহ নেই এবং হাসপাতালের উঠোনেই অনেক মানুষকে বাধ্য হয়ে কবর দিতে হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের আড়ালে আছে আরও লাশ। এ অপরাধ সংঘটনের লাভজনক দিক ইসরায়েল পুরোপুরি উপভোগ করছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রথম থেকেই ইসরায়েলের কোনো আগ্রহ নেই। বরং যুদ্ধ তাদের মুনাফা বাড়াতে সহযোগিতা করছে। লোয়েনস্টেইন তার বইয়ে এ আগ্রাসি অর্থনীতির নেতিবাচকতা এবং নির্মমতা আবেগপ্রবণ ভঙ্গিতে তুলে এনেছেন। অথচ বিশ্ব সম্প্রদায় এখনও অবাক হয় নেতানিয়াহুর গ্রেপ্তারি পরোয়ানার সংবাদে। অন্তত তার এ উদ্যোগের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের যে নির্মম বাস্তবতায় বাস করতে হচ্ছে তা বিশ্বের কাছে ভিন্ন এক আঙ্গিকে উপস্থাপিত হচ্ছে। এ উপস্থাপনে ইসরায়েল কোনোভাবেই শান্তির পক্ষের শক্তি নয়। বরং তারা অশান্তির মূর্ত প্রতীক। গাজার মানুষও ইসরায়েলি অস্ত্র সম্পর্কে সচেতন হয়ে গেছে। কখন তাদের আপাচি দিয়ে মারা হচ্ছে কিংবা এফ-১৬ কখন চালানো হচ্ছে তা-ও অনেকে বুঝতে পারে। বেসামরিক নাগরিকও যখন অস্ত্র সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে ওঠে তখন বুঝে নিতে হবে, ইসরায়েল অনিচ্ছাকৃত কিংবা ভুলবশত বেসামরিক নাগরিক হত্যা করছে না।
সাংবাদিক শাসা পোলাকোও সুরানস্কি সম্প্রতি ইসরায়েলের আগ্রাসনের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার সম্পর্ক চিহ্নিত করেছেন। জাতিসংঘ দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে অস্ত্র ব্যবসা স্থগিত করলেও ইসরায়েল তাদের পারমাণবিক অস্ত্র প্রোগ্রাম স্থাপনে সাহায্য করেছে। এভাবে দক্ষিণ আফ্রিকাও এ গণহত্যার দায়ভার বহন করছে। শুধু অস্ত্র দিয়ে মানুষ হত্যাই নয়, ইসরায়েলের প্রযুক্তি দিয়ে কতটা নিখুঁতভাবে সার্ভেল্যান্স করা যায় তারও অনেক প্রমাণ তারা হাজির করতে পারছে। পশ্চিম গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ড্রোন বা অন্য প্রযুক্তি দিয়ে নিয়মিত তদারকি করছে তারা। মূলত নিপীড়ন কীভাবে বাণিজ্যে রূপ দেওয়া যায় তা-ই প্রতিষ্ঠা করেছেন লোয়েনস্টেইন। তবে এ বিষয়ে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যম খুব একটা আগ্রহ দেখাতে পারেনি।
গাজায় গণহত্যার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের পরীক্ষানিরীক্ষার বিষয়টি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ। যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মানির মানবদেহ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার মতোই এগুলো। গাজাকে উপনিবেশ হয়তো এতদিন অনেকে বলতে রাজি হচ্ছিলেন না। তারা বড়জোর একে দখল বলতেন। কিন্তু উপনিবেশ হলে যে শোষণ এবং অর্থনৈতিক লাভ হয় তা-ও ইসরায়েল দেখিয়ে দিয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবসা খাতে তাদের ঈর্ষণীয় সাফল্য ফিলিস্তিনিদের ছাড়া সম্ভব ছিল না। ইসরায়েলের এ পদক্ষেপগুলো অন্তত অনেকের কাছেই অজানা ছিল। কিন্তু চার এপিসোডের পডকাস্ট আমাদের সামনে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করেছে, যা এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
ফিলিস্তিন ইসরায়েলের ল্যাবরেটরি। পরীক্ষানিরীক্ষার জায়গা হলে মধ্যপ্রাচ্যে গাজা ভিন্ন এক বাস্তবতা ধারণ করে। এতদিন গাজা নিয়ে যে ধরনের ন্যারেটিভ আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে তা এবার ভেঙে পড়ছে। আমরা বুঝতে পারছি আমাদের মিথ্যা বলা হয়েছে। বরং তাদের বিচ্ছিন্ন স্থল অভিযানগুলো আর বিচ্ছিন্ন কিংবা উদ্দেশ্যহীন বলা যাচ্ছে না। আমরা অনুধাবন করতে পারছি, প্রযুক্তি এবং আগ্রাসনের মেলবন্ধন করতে পারলে পুঁজিবাদী শক্তির জাগরণ ঘটে। এজন্যই মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের জন্য গাজার দখল এত জরুরি। লেবাননের সঙ্গেও তাদের যুদ্ধের বিষয়টি সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সুযোগ দিয়েছে। ইসরায়েল পদ্ধতিগতভাবে কীভাবে এ গণহত্যা চালিয়ে আসছে তা বোঝার জন্য ওই পডকাস্টের এপিসোডগুলো দেখতে হবে। কিন্তু ইসরায়েল শিগগিরই শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগোবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবাক হওয়ার ভ্রান্তি থেকে বেরোতে হবে। না হলে বিশ্ব ভয়াবহ এক বাস্তবতার দিকে এগোবে।
মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন