× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মধ্যপ্রাচ্যে

সিরিয়াকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ

ড. আব্দুল্লাহ খালিফা আল শায়জি

প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৪৩ এএম

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৪৪ এএম

সিরিয়াকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ

ইসরায়েলের সামরিক দম্ভ চূর্ণবিচূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের ভৌগোলিক রূপরেখা আগামী দিনগুলোতে বিস্তৃত করার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেতানিয়াহু গোপনে গোপনে পোষণ করছেন তা ক্রমেই তাসের পাহাড়ের মতো ঝরে পড়ছে। গাজায় এখনও নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। অন্যদিকে লেবাননে ইরানের প্রক্সি হিজবুল্লাহর সঙ্গে টক্কর দিতে হিয়ে ইসরায়েল অনেকাংশেই ঠেকে গেছে। এমন সময়ে তাদের জন্য সিরিয়া ও ইয়েমেনেও দেখা দিয়েছে চ্যালেঞ্জ। ভূ-রাজনৈতিকভাবে শুধু মার্কিন সমর্থন তাদের বড় সহযোগিতা যে করবে না এ বাস্তবতা অবশ্য ইসরায়েলিরা অনুধাবন করলেও নেতানিয়াহু করতে পারেননি। সম্প্রতি সিরিয়ায় তাকফিরি জঙ্গি সংগঠন দেশটিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করার পর বিশ্ব নড়েচড়ে বসে। বিষয়টি মনোযোগ আকর্ষণ করে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক শক্তিবাহী রাষ্ট্রগুলোরও। এ ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে মধ্যস্থতার ভূমিকায় জড়িয়ে পড়েছে রাশিয়া। সম্প্রতি রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রে বেলোসোভ, ইরাকের সামরিক প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল আমির রাশিদ ইয়ারাল্লা এবং সিরিয়ার চিফ অব স্টাফ জেনারেল আব্দুল করিম মাহমুদ ইব্রাহিম ও জেনারেল বাঘেরি  মোবাইল ফোনে এ বিষয়ে আলাপ করেছেন। তারা সিরিয়ার তাকফিরি অঞ্চলের সহিংসতা সংঘাতের পেছনে জায়োনিস্ট-মার্কিন আঁতাতের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

সিরিয়ার তাকফিরি টেররিস্ট গ্রুপকে নিয়ে সন্দেহের কারণ রয়েছে। তাদের কার্যক্রম এমন একসময়ে যখন লেবানন-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি কার্যত লঙ্ঘনের পাল্লায়। আবার লেবাননের অনেকে সিরিয়ায় অভিবাসন করতে বাধ্য হয়েছেন। এমন অবস্থায় সিরিয়ায় তাকফিরি গোষ্ঠীর কার্যক্রম মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক গোষ্ঠীর কাছে সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার সময় জেনারেল বাঘেরি জানান, ‘জায়োনিস্ট ও মার্কিনিরা সিরিয়াকে উত্তপ্ত করে লেবানন-ইসরায়েল অস্ত্রবিরতিতে আরেক ধরনের বাগড়া দিতে চাচ্ছে। তারা তাকফিরিদের ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যকে অশান্ত করতে চায়।’ সিরিয়ার সামরিক বাহিনীকে রাশিয়া ও ইরাক এই বৈঠকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছে। এমনকি তাকফিরিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা অনুধাবন করে মধ্যপ্রাচ্যকে শান্ত করার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা। এমন যৌথ আশ্বস্তির ফলে ইসরায়েল তার প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে এই অঞ্চলে প্রতিরোধ আন্দোলনকে দমন করার জন্য এবং নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধে তাকফিরি গোষ্ঠীগুলোকে আবারও একত্রিত ও সক্রিয় করছেÑ এমন অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। 

সম্প্রতি সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে পূর্ব এবং উত্তর আলেপ্পোতে আইএস এবং অন্যান্য তাকফিরি গোষ্ঠীর কার্যকলাপ বেড়েছে। এই গোষ্ঠীগুলো শুধু সিরিয়ার বাহিনীকে আক্রমণ করেনি, তারা দক্ষিণ ফ্রন্টে সংঘাত তীব্র করার জন্য বাহিনীর মূল ঘাঁটি থেকে সরে এসেছে। দক্ষিণে তাকফিরিদের আচমকা সংঘাত জায়োনিস্টদের মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবিস্তারের ব্যর্থতার পর নতুন কৌশল বলে বিবেচিত হওয়াই স্বাভাবিক। ইসরায়েলের সঙ্গে এই গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্ক এখন আর গোপন নয়। অতীত ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয়, ইসরায়েল সংস্থাগুলোকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। এই মুহূর্তে সিরিয়ার বিমানবাহিনী এই সন্ত্রাসীদের গতিবিধি বন্ধ করতে এবং তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে; কিন্তু এসব ঘটনার প্রেক্ষাপট থেকে এটাও বোঝা যায় যে এই হামলাগুলো শুধু সিরিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, তাদের পরবর্তী টার্গেট হতে পারে ইরাক। আইএসআইএস-এর পুরোনো কৌশল পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা এই অঞ্চলে একটি নতুন সংকট তৈরি করার একটি চক্রান্ত, যার লক্ষ্য প্রতিরোধ শক্তিকে বিভক্ত করা এবং তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত ও ব্যতিব্যস্ত রাখা।

ইসরায়েলের পরাজয়, সিরিয়ায় ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ করে এই গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ইঙ্গিত দেয় যে ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটির মুখোমুখি যুদ্ধে পরাজয়ের পর তার বিরোধীদের দুর্বল করার জন্য বিকল্প কৌশল অবলম্বন করছে। অদ্ভুত বিষয়, এই ক্ষুদ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে উন্নত অস্ত্র ও সম্পদ রয়েছে। তাহরির আল-শাম নামে পরিচিত দায়েশ (আইএস) ও তাকফিরি গোষ্ঠীগুলোর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডও ইঙ্গিত দেয় যে ইসরায়েল এই অঞ্চলে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে পরাজয়ের পর রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে চাপ কমাতে তাদের মাঠে নামিয়েছে, অথচ কদিন আগেও তাদের তৎপরতা ম্রিয়মাণ ছিল। এই সময়ে উগ্র তাকফিরি গোষ্ঠীগুলোকে হাতিয়ার করার মধ্য দিয়ে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে ইহুদিবাদী রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ সমস্যা যেমন জনগণের বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের সামরিক শক্তি হিজবুল্লাহ এবং অন্যান্য প্রতিরোধ সংগঠনের বিরুদ্ধে শক্তিহীন হয়ে পড়েছে।

বিভিন্ন মতাদর্শ ও ভিন্ন ভিন্ন গঠনের মিশ্রণে গঠিত নানা দলে বিভক্ত বিদ্রোহীরা এত দিন সিরিয়ার বাকি অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল। তারা কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির সমর্থন পেয়েছে; যদিও এ সমর্থন সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। তুরস্ক উত্তর সিরিয়ায় একটি ‘বাফার জোন’তৈরি করে রেখেছে। তুরস্কের দাবি, তুরস্কবিরোধী তৎপরতায় জড়িত কুর্দি গোষ্ঠী সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) হামলা থেকে তুরস্কের মাটিকে রক্ষা করার জন্যই মূলত এই বাফার জোন তারা তৈরি করেছে। বিদ্রোহীরা পশ্চিমা শক্তিগুলোর কাছ থেকে রাজনৈতিক ও লজিস্টিক সহায়তা পেয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তারা সব ধরনের সহায়তা পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে সিরিয়ায় ৯০০ সেনা মোতায়েন রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক দাবি হলো, আইএসের পুনরুত্থান ঠেকাতেই মূলত এসব মার্কিন সেনা সেখানে রাখা হয়েছে। কিন্তু ইরান, সিরিয়া এবং লেবানন এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। ইরান ও রাশিয়ার মধ্যস্ততায় সিরিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্য ২০১২ সাল থেকেই ঠিকঠাক থাকায় মধ্যস্থতার মূলকেন্দ্রে রাশিয়া।

সিরিয়া পরিস্থিতির ইতিবাচক দিক প্রতিরোধ অক্ষের জন্য দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ইসরায়েলের প্রক্সিদেরও মুখোশ উন্মোচিত করেছে। এটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে প্রতিরোধ আন্দোলনের সাফল্য কেবল ইসরায়েলের জন্য নয়, তাদের আন্তর্জাতিক মিত্রদের জন্যও একটি বড় ধাক্কা হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে। এই অর্জনগুলো আরও প্রকাশ করেছে যে প্রতিরোধ কেবল সামরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি একটি আদর্শিক ও গণ-আন্দোলন, যার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী এবং গভীর। ফিলিস্তিনের মুক্তি, আল-কুদস পুনরুদ্ধার এবং প্রতিরোধ জোটের স্থিতিশীলতা কেবল একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ভয়াবহ সংঘাতের ইঙ্গিতবাহী হয়ে উঠছে। 

  • ড. আব্দুল্লাহ খালিফা আল শায়জি, অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়
  • আল আরাবিয়া থেকে সংক্ষিপ্ত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা