× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার

কাটেনি আঁধার, ঘোচেনি বিড়ম্বনা

খুশি কবির

প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৩৭ এএম

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৪৪ এএম

কাটেনি আঁধার, ঘোচেনি বিড়ম্বনা

পটপরিবর্তনের পর নারীর অবদান পরিপূর্ণভাবে মূল্যায়িত হয়েছে এমনটি বলা যাবে না। বিশ্ব ইতিহাসে নারীর অবদান সব সময়ই স্বীকৃত। কিন্তু আমাদের সমাজ নারীকে মানুষ হিসেবে বিচার করার বদলে নারী শব্দবন্ধেই আটকে ফেলার চেষ্টা করা হয় অনেক ক্ষেত্রে। উৎপাদনমুখী সমাজে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে মূল্যায়নে নারীর অবদান সামনে নিয়ে আসা হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই নারীর অবদান উপেক্ষা করা হয়। নারী যখন অর্থ উপার্জন করছে না তখনও ঘরের কাজ করছে। কিন্তু তার ঘরের কাজ অর্থনৈতিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। নারীর ঘরের কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন সম্প্রতি অর্থনীতিবিদদেরও মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। তার পরও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এর স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

ঘরের সব কাজ চিরকাল নারীই করেছে। এ দেশে বহু আগে থেকেই নারী কৃষিকাজে অংশগ্রহণ করছে। ফসল লাগানো থেকে শুরু করে ফসল তোলা, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ সব কাজেই নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। বিশেষ করে ফসল তোলা এবং সংরক্ষণের কাজ প্রায় সম্পূর্ণটাই নারীই করে থাকে। গত ২০-৩০ বছরে দেখা গেছে, নারী পুরুষের পাশাপাশি কৃষিতে শ্রমিক হিসেবেও কাজ করছে। কিন্তু সেখানে নারী অনেক কম মজুরি পাচ্ছে। একজন পুরুষ শ্রমিক ৫০০ টাকা মজুরি পেলে একজন নারী শ্রমিক পায় ৩৫০ টাকা। সুতরাং নারী তার কাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য পাচ্ছে না। আমাদের সমাজে নারীকে পুরুষের সমানভাবে দেখা হয় না। শুধু অবকাঠামো এবং গড় আয়কে উন্নয়ন হিসেবে দেখলে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের গোটা চিত্র পাওয়া যায় না। দেশ স্বাধীনের পর অবকাঠামো বলে কোনো কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। এরপর বন্যা ও রাজনৈতিক সংকটÑ সব মিলে দারিদ্র্যের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। তা উতরে আজ মানুষের মাথাপিছু আয় অনেক বেড়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি খুব একটা সুখকর নয়। বিপুল মানুষের আয় এখনও গড় আয়ের চেয়ে কম। ধনী-গরিবের ব্যবধান অনেক হয়ে গেলে সেখানে শোষণ বেড়ে যায়। দেশের সব মানুষের উন্নতির কথা চিন্তা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নারীকে কর্মক্ষেত্রে নিয়ে আসার ব্যাপারে গার্মেন্ট শিল্প বড় ভূমিকা রেখেছে সত্য। কিন্তু গার্মেন্ট শ্রমিকের মজুরিতে তাদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে- এ অভিযোগও তো নতুন নয়। নারীকে কম মূল্যে কাজ করানো হচ্ছে। অর্থাৎ সস্তা শ্রমের জন্য নারীকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা উন্নত হচ্ছি কিন্তু শুধু গড় হিসাব দেখিয়ে উন্নত হওয়া এবং সত্যিকারের মানব উন্নয়ন করা এক বিষয় নয়। উন্নয়ন মানে সবার উন্নয়ন। মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকার সবাই যাতে ভালোভাবে পূরণ করতে পারে সেটাই উন্নয়ন। সম্প্রতি গার্মেন্ট খাতে বকেয়া বেতনভাতার দাবি জানিয়ে প্রায়ই শ্রমিকদের সড়কে নামতে হচ্ছে। এ জন্য হতাহতের নজিরও তো রয়েছে। সস্তা শ্রমে শারীরিক ও মানসিক যে চাপ তা অনেক নারীকে ডিমেনশিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত করে। অথচ নারী এমনকি একটি বড় খাতেই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। আর যেহেতু এ খাতে নারীই সংখ্যাগরিষ্ঠ তাই ঘরোয়া অর্থনীতির নেতিবাচক প্রভাব সামগ্রিকভাবে আমাদের চোখে পড়ছে না।

আমাদের সমাজই চোখে আঙুল দিয়ে নারী আর পুরুষের আলাদা বৈশিষ্ট্য তৈরি করে বিভেদ সৃষ্টি করছে। পুরুষের মানসিকতার সঙ্গে সঙ্গে নারীরও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। অনেকের সঙ্গেই কথা বলে জেনেছি, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বা কর্মজীবী নারীরও পরিবার থেকে বিয়ের ব্যাপারে চাপ থাকে। নারী বিদেশ থেকেও যদি উচ্চশিক্ষা নিয়ে আসে কিংবা যতই মুক্তমনা পরিবারে বেড়ে উঠুক না কেন, একটা স্টেজের পরে তাকে বিয়ের জন্য নানাবিধ চাপ প্রয়োগ করা হয়। এখন সমাজ যদি মনে করে, একজন নারীর স্বাধীনভাবে চলাচল করা উচিত নয় বা ভালো নয়, তাহলে মনে করতে হবে তারা নারীর স্বাধীনতাকে সমাজের কোনো কোনো অংশ ভয় পায়। নারীর স্বাধীনতাকে ভয় পায় বলেই এসব প্রতিবন্ধকতা সমাজেরই সৃষ্টি। নারী স্বাধীনভাবে চলাচল করলে কিংবা স্বাধীনতা উপভোগ করলে, পুরুষের সমমর্যাদার হয়ে যাবে, এটাই তাদের ভয়। তারা কোনো অবস্থায়ই নারীকে পুরুষের সমকক্ষ হতে দেবে না।

সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথমেই পরিবারের ভেতরে নজর দিতে হবে। এরপর নজর দিতে হবে সমাজে। আমাদের ভালো কিছু আইন রয়েছে। কিন্তু সেসব আইনের প্রয়োগ নিয়ে অনেক নেতিবাচক কথা আছে। ধর্মীয় দিক থেকেও নারীদের এক ধরনের বৈষম্যের মধ্যে রাখা হয়। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ইউরোপ বা ফিলিপাইন এক এক দেশে এক একটি ধর্মীয় মানুষ সংখ্যাগুরু। সব দেশে প্রায় একই অবস্থা লক্ষণীয়। যারা ধর্ম প্রচার করছে তারা এক ধরনের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা পোষণ করে। যেহেতু রাষ্ট্র পিতৃতান্ত্রিক সুতরাং রাষ্ট্রের চিন্তার মধ্যে রয়েছে নারীকে দমিয়ে রাখা। ধর্মের যেভাবে প্রচার চালানো হয় সেটাও সাংঘাতিকভাবে পিতৃতান্ত্রিক, আমাদের আইনগুলো পিতৃতান্ত্রিক। সবকিছুই পিতৃতান্ত্রিক হওয়ায় নারী উঠে আসতে পারে না। এর মধ্যে থেকে যে নারী উঠে আসে তাকে প্রমাণ করতে হয় যে সে একজন পুরুষের থেকেও বেশি। সুতরাং পরিবর্তনটা করতে হবে একদম গোড়া থেকেই। পরিবার থেকে এ পরিবর্তনটা শুরু হওয়া উচিত।

দেশে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা যায়নি কারণ আমাদের দেশে রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। একসময় ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো বাতিল করা হয়েছিল। পরে আবার এ দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হয়। নারীর পাসপোর্ট করতে, জমি কিনতে বা একটি ফ্যাক্টরি তৈরি করতে, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসার জন্য ঋণ নিতেÑ যেকোনো কাজেই একজন পুরুষকে গ্যারান্টার হতে হয়। এটা অবশ্যই নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। মানুষ মনে করে, নারী যখন কাজ করে বা উপার্জন করে সেটা সাবসিডিয়ারি। নারীকে পুরুষের সহযোগী হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ পরিবারের পুরুষ সদস্যের আয়ে ভালোভাবে সংসার চলছে না তাই পরিবারের নারী সদস্যের আয়কে পরিপূরক হিসেবে দেখা হয়। আলাদা সত্তা হিসেবে দেখা হয় না। নারীকে শুধু পরিবারের সদস্য হিসেবে দেখা হয়। যে কারণে প্রণোদনা, সহযোগিতা বা অন্যান্য ক্ষেত্রে নারীকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয় না।

নারীর কর্মপরিবেশ সুষ্ঠু এবং নিরাপদ করার চর্চাও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনুপস্থিত। এজন্য সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন সবার আগে জরুরি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের উচিত তার নারী কর্মীদের যৌন নিপীড়ন বা হয়রানি রোধ করার জন্য কমিটি গঠন করা। শুধু প্রতিষ্ঠানের নয়, প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকেও এক-দুই জন সদস্য সেখানে থাকতে পারে, নিরপেক্ষ জাজমেন্টের জন্য। এসব নীতিমালা আছে, কিন্তু কজন মেনে চলে? যৌন হয়রানের শিকার কোনো নারী কর্মী যদি প্রতিষ্ঠানের কাছে অভিযোগ করতে যায়, অনেক ক্ষেত্রে ভিকটিমকেও বাজেভাবে দেখা হয়। ফলে এসব ক্ষেত্রে আমাদের এখনও আরও অনেক কাজ করা বাকি। পুরুষের সহযোগিতা ছাড়া যেমন এগুলো করা সম্ভব নয়, পুরুষের মানসিকতাও আমাদেরই পরিবর্তন করতে হবে। ধর্ষণ করে এর ভিডিওধারণ করে সমাজমাধ্যমগুলোয় ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বা ছেড়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এসে এ ঘটনাগুলো আমাদের সমস্ত অবদান পেছনে নিয়ে যাচ্ছে। শহুরে নারী যে নির্যাতিত হচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। কিন্তু সামাজিক ভয়ে, লোকলজ্জার ভয়ে আর স্ট্যাটাসের কথা ভেবে শহুরে নারী খুব কমই এসব নিয়ে কথা বলে। রাষ্ট্র যদি আইন করে থাকে, তবে তার দায়িত্ব হচ্ছে সেটা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা। কিন্তু রাষ্ট্র কি তা করছে? নারী নির্যাতন বন্ধে যেসব আইন বা নীতিমালা হয়েছে, দুঃখজনক হলেও সত্য, এগুলো বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর ভূমিকায় নেওয়া হচ্ছে না।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকেই কিন্তু নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করছে অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে পঁচাত্তরের পর যখন জাতিসংঘ নারী দিবস পালন শুরু করল, নারী দশক পালন করল এরপর নারীর জন্য বিশেষ কিছু উদ্যোগ নিল, যেমন প্ল্যাটফর্ম ফর অ্যাকশনস নেওয়া শুরু করল তখন তৈরি হতে লাগল নারী উন্নয়ন নীতি। জাতিসংঘ তার সদস্যভুক্ত সব দেশ থেকে নারীর জন্য অবস্থান, উন্নয়ন পরিকল্পনা আহ্বান শুরু করে। তো জাতিসংঘ অনেক ইফোর্ট দিয়েছে নারীর উন্নয়নে, সেই সুরে বাংলাদেশও তার উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারীকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) লক্ষ্যমাত্রা কিন্তু তখনই নির্ধারণ করে সরকার। নারীর সমতা বিষয়ে সরকার বেশ গুরুত্ব দিয়েছে। সমতা ছাড়া আরও অনেক বিষয় আছে যার মধ্যে নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা অন্যতম। আমরা সবাই এসব ইস্যু নিয়ে কাজ করার কথা বলছি কিন্তু পত্রিকার পাতা খুললেই নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্রটা দেখতে পাই।

ঘরের ভেতর, পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্রÑ নারীর প্রতি সহিংসতাটা কিন্তু বেড়েই চলেছে। সে মেয়ে হোক বিধবা বা সিঙ্গেল অথবা তালাকপ্রাপ্তা, সন্তানসহ কিংবা সন্তান ছাড়া, ছাত্রী কি ছাত্রী না—সবাই সহিংসতার শিকার হচ্ছে। নারীর নিরাপত্তা ও অধিকারের প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে বলতেই হয়, এখনও কাটেনি আঁধার, এখনও দুরাচারীর ছায়া। যূথবদ্ধ প্রয়াসে তা দূর করতেই হবে। বিচারহীনতার যে অপসংস্কৃতি বিগত সরকারগুলোর আমলে জিইয়ে ছিল এও সহিংসতা বৃদ্ধির মূল কারণ বলে মনে করি। এর নিরসন সর্বাগ্রে জরুরি। প্রথমত. সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারীর অধিকার যাতে খর্ব করা না হয় সে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। আইনগুলো সংশোধন এবং নারীবান্ধব করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনতে হবে। ছোটকাল থেকেই বাচ্চাদের শেখাতে হবে নারী-পুরুষ সবাই সমান। এটা ছেলেদের কাজ, এটা মেয়েদের কাজ এভাবে কোনো বৈষম্য শেখানো যাবে না। মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে।

  • নারী অধিকারকর্মী ও সমন্বয়ক, নিজেরা করি
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা