সমাজ
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৮:৪৯ এএম
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট কিংবা নানা কিসিমের বক্তব্য দিয়ে ইউটিউবে যেসব আপত্তিকর ভিডিও আপলোড করা হচ্ছে, তা যে কোনো তদারকির মধ্যে নেই; বিদ্যমান বাস্তবতা এরই সাক্ষ্যবহ। যেকোনো সমাজ কিংবা রাষ্ট্রে ব্যক্তির মুখ্য পরিচয় নাগরিক হিসেবে, সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু হিসেবে নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা এ বৃত্ত থেকে বেরোতে পারছি না। এর দায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কমবেশি রয়েছে। রাষ্ট্র বিনির্মাণের চিন্তায় যদি সাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব না পায় এবং সর্বাগ্রে তা বাস্তবায়ন করা না যায় তাহলে যেকোনো সমাজে কিংবা রাষ্ট্রে বৈষম্যের পারদ ঊর্ধ্বমুখী হবে এটাই স্বাভাবিক। আমরা দেখছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক কিংবা কোনো কোনো ইউটিউবার প্রযুক্তির উৎকর্ষের এ যুগে যেভাবে মাধ্যমগুলো ব্যবহার করছেন, তাতে কখনও কখনও গুজবের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে এবং অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে; আলো জ্বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের যদি স্বাধীনতার পরিসীমা ছাড়িয়ে যায় তাহলে এর দহনে সমাজ কীভাবে দগ্ধ হয় এর বহু নজিরই ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে।

দুঃখজনক হলো,
এসব কিছুর প্রতিবিধান নিশ্চিত করতে বারবারই রাষ্ট্র পরিচালকদের অঙ্গীকার-প্রত্যয় ব্যক্ত
হচ্ছে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না বিধায় বিভাজিত এ সমাজে বিভাজন ক্রমেই আরও বাড়ছে।
এর সুযোগ নিচ্ছে স্বার্থান্বেষী মহল। কিন্তু পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বৈষম্যহীন সমাজ
প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে যখন রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে, তখন অনভিপ্রেত যেসব ঘটনা ঘটছে
তা নিশ্চয় অনেক প্রশ্নের উদ্রেক ঘটায়। আমাদের প্রিয় স্বদেশে যখন বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার
স্বপ্ন দেখছি, অধিকারের মাঠ সমতল করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছি, তখনও কেন এ পথে কাঁটা বিছিয়ে
দেওয়া হচ্ছেÑ এ বিষয়টি রাষ্ট্র পরিচালকদের আমলে না থাকলে ক্ষতের ওপর আরও ক্ষত সৃষ্টি
হবেই। একজন ব্যক্তি তিনি যে ধর্মের অনুসারীই হোন না কেন, সমাজ বিষিয়ে ওঠে এমন কোনো
কর্মকাণ্ড পরিচালনার এখতিয়ার তার নেই এবং যদি কেউ এমনটি করেন তাহলে এর শেকড়সুদ্ধ উপড়ে
ফেলা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কোনো ব্যক্তির আচরণ কিংবা কর্মকাণ্ডে সমাজে যদি উত্তাপের তৈরি
হয় তাহলে আইন অনুযায়ী তার শাস্তি অবশ্যই কাম্য।
সব ধর্মেই মানুষকে
হিংসাশ্রয়ী কিংবা ধ্বংসাত্মক পথ পরিহার করতে বলা হয়েছে। কিন্তু বিস্মিত না হয়ে পারি
না, যখন ধর্মের নামেই সমাজে নানা রকম দুষ্কর্ম হয়েছে এবং হচ্ছে। ফেসবুক পোস্টে ধর্মীয়
অনুভূতিতে আঘাত করে কমেন্টের জেরে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার মোঙলারগাঁওয়ে সংখ্যালঘুদের
বাড়িঘরে হামলার যে ঘটনা ঘটেছে এর প্রেক্ষাপট আমলে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। হামলাকারীরা যে রকম
মারমুখী ছিল তাতে বড় ধরনের অঘটনের আশঙ্কা ছিল। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে বলা
হয়েছে- এলাকার আলেমওলামা, রাজনৈতিক কর্মী, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর
চেষ্টায় হাজারো উত্তেজিত মানুষকে নিবৃত্ত করা সম্ভব হয়। নিশ্চয় তা সাধুবাদযোগ্য। দোয়ারাবাজার
কলেজের এক হিন্দু শিক্ষার্থীর ফেসবুকের কমেন্টস কেন্দ্র করে গত ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাত
পর্যন্ত এ উত্তেজনা ছিল। অভিযুক্ত তরুণ আকাশ দাসকে ৪ ডিসেম্বর বিকালে আদালতে সোপর্দ
করা হলে বিচারক তাকে জেলহাজতে পাঠান। তবে তার গ্রাম মোঙলারগাঁওয়ে এখনও সবাই বাড়িতে
ফেরেননি। পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে গ্রামে। এর উৎসে নজর দিয়ে দ্রুত প্রতিবিধানের
বিকল্প নেই। আকাশের অপকর্মের অভিশাপ সমাজে গাঢ় ছায়া ফেলেছে। এর প্রতিকার-প্রতিবিধান
হোক। আকাশের অপকাণ্ডের জন্য অন্যরা কেন বিপদাপন্ন হলো-খোঁজা হোক এ প্রশ্নের উত্তরও!
তাদের অপরাধ কী?
আমরা এ স্লোগানটি
শিরোধার্য রাখতে চাইÑ ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার
দাবি নতুন নয়। দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে তা আরও পোক্ত হয়েছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশের
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ৪ ডিসেম্বর বেলা সাড়ে ১১টায় মোঙলারগাঁও গ্রামের হিন্দুহাটিতে
গিয়ে দেখা যায়, অনেকের ঘরের দরজায় তালা ঝুলছে। কিছু পুরুষমানুষ বাড়ি ফিরলেও পরিবারের
নারী সদস্যরা আশপাশের গ্রামের স্বজনদের বাড়িতেই রয়েছেন। গ্রামে হিন্দু পরিবার ৯৫টি।
এর মধ্যে ২৫টি পরিবারের নারীরা ওই সময় পর্যন্ত বাড়ি ফেরেননি। আশপাশের গ্রামের মুসলিম
সম্প্রদায়ের গণ্যমান্যরা এসে তাদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিচ্ছিলেন। মানুষ নামধারী কতিপয়
উগ্রবাদীর চিন্তার জগতে অনেক ক্ষেত্রেই জেঁকে বসেছে অসত্যের গাঢ় অন্ধকার। ধর্মালয়ে
আক্রমণও স্বাধীন বাংলাদেশে ইতোমধ্যে কম হয়নি। এসবের কি বিচার হয়েছে? হয়নি। রাজনৈতিক
স্বার্থে বরং ঘটনাগুলো দেখা হয়েছে।
ধর্ম কিংবা ইবাদত
কিংবা উপাসনা ক্ষেত্রকে যারা চক্রান্ত-গুজবের ঘাঁটি বানাতে চায়, তারা ধর্ম তো বটেই;
মানবতা-সভ্যতা-দেশ-জাতিরও ঘোরতর শত্রু। তারা কেন সক্রিয় হয়ে ওঠে ফিরে ফিরে; এর অনুসন্ধানে
সরকার ও প্রশাসনকে উৎসে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে আত্মসমালোচনাও জরুরি। দৃষ্টান্ত দাঁড়
করাতে না পারলে উচ্চারণসর্বস্ব অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতিতে ঘোলা জল স্বচ্ছ হবে না। অধিকারের
মাঠ যে পর্যন্ত না সমতল হবে সে পর্যন্ত অনাচার-কদাচার-দুরাচারের ছায়াদৃশ্য দৃশ্যমান
হবেই। মোঙলারগাঁওয়ের ঘটনাটি হয়তো গুজবকেন্দ্রিক নয়, কিন্তু অতীতের ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে
গুজব শব্দটি অনিচ্ছায়ই যুক্ত হয়ে গেল। ঘটনা যেভাবেই ঘটুক এর যথাযথ বিচার চাই, যেহেতু
আমরা রাষ্ট্র সংস্কারের পথে হাঁটছি। রক্তস্নাত এ বাংলাদেশে গুজবের শেকড় কতটা গভীরে
প্রোথিত এর অনেক নজির আমাদের সামনে রয়েছে। অনেকেরই হয়তো স্মরণে আছে ভোলা ও কক্সবাজারের
রামুতে গুজব ছড়িয়ে বৌদ্ধ মন্দির ও বসতিতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের ভয়াবহতা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার
নাসিরনগর এবং রংপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলা-তাণ্ডবের ঘটনাও অনেকের বিস্মৃত
হওয়ার কথা নয়। এ রকম দৃষ্টান্ত আরও আছে এবং উল্লিখিত কোনো ঘটনাই দূর অতীতের নয়।
অধিকাংশ ঘটনার
সূত্রপাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক থেকে। অস্বীকার করার জো নেই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের
অনেক অবদান রয়েছে। কিন্তু দুশ্চিন্তার কারণ হলো, এর অপব্যবহারও চলছে সমান্তরাল। ফেসবুক-টুইটারের
মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিস্তৃত হওয়ার পর নাগরিক সমাজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুযোগ
অনেক বেড়েছে। কিন্তু স্বাধীনতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে রূপ নিচ্ছে স্বেচ্ছাচারিতায় এবং
আশঙ্কা সেখানেই। সচেতন মানুষমাত্রেরই জানা, গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত।
এককভাবে কিংবা গণজমায়েত আকারে দাবি জানানোর সুযোগও রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের রয়েছে সাংবিধানিক
রক্ষাকবচ। কিন্তু মত প্রকাশ করতে গিয়ে প্রায়ই ব্যক্তি কিংবা মহল বিশেষ যে বিকৃত ও অসত্য
তথ্য ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা-নৈরাজ্যের জন্ম দিচ্ছে, তা আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ।
এ রকম অপরাধের দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার কাঙ্ক্ষিত হলেও রাষ্ট্রশক্তি সে প্রতিকার নিশ্চিত
করতে পারছে না। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, গণমানুষের অধিকার
ইত্যাদি নিয়ে ইতোমধ্যে নানা মাধ্যমে কথাবার্তা কম হয়নি। কিন্তু ফল কীÑ এ প্রশ্নও দাঁড়ায়।
গুজবের গুবরে
পোকার কেন বিনাশ ঘটানো যাচ্ছে না, এ প্রশ্নের উত্তরও নিহিত এ জিজ্ঞাসার মাঝেই। আমাদের
রাজনীতির বিপুল অর্জনের বিসর্জন ঘটেছে নানাভাবে। এর মধ্যে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির তীর
নানা সময়ে ছুটেছে সমাজের দিকে। সচেতন মানুষমাত্রেই জানা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটিয়ে সরকারকে
বেকায়দায় ফেলতে গুজবকে ‘কৌশল’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মনে রাখা দরকার, শুধু নদ-নদীর
জলই লোকালয় ডোবায় না; বেনো জলের তোড়েও ভেসে যায় সহায়সম্পদ। ‘দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে
রুখি, সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি’Ñ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ কাব্য-পঙ্ক্তির সঙ্গে
রক্তেভেজা বাংলাদেশের অমিল খুঁজে পাওয়া ভার। গুজব কীভাবে সমাজের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট
ও জীবন-সম্পদহানির কারণ হতে পারে, এর নজির স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে অনেক পুষ্ট।
গুজব প্রতিরোধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি; সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সক্রিয়তা;
পরিবার ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমের যূথবদ্ধ প্রয়াস আরও জোরদার না করলে সর্বনাশের পথ রুদ্ধ
করা যাবে না। একই সঙ্গে জরুরি হলো যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানচর্চার বহুমুখী পথ সৃষ্টি করা।
দরকার যৌক্তিক তর্কবিতর্কের খোলা জানালা।
সব গুজবের জন্মরহস্যও এক রকম নয়। তবে গুজবের জন্ম যেভাবেই হোক, তা শুধু অন্ধবিশ্বাসের বীজতলাই তৈরি করে; ডেকে আনে সর্বনাশ। গুজব-হিংস্রতা দুইয়েরই কঠোরভাবে মোকাবিলা করা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। সম্প্রতি মোঙলারগাঁওয়ে যে ক্ষত সৃষ্টি হলো এর উৎসে নজর দিয়ে প্রতিবিধান করতেই হবে। যাদের ব্যর্থতায় অন্ধকারের বিস্তার ঘটছে, তাদের দায়হীন থাকার অবকাশ নেই। তার পরও বলি, দূর হ অন্ধকার। চাই আলোকিত-বিকশিত মানুষ। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, অপকর্মের দাবানলে উত্তাপ বাড়ে, অন্ধকার দূর হয় না। আলোকিত মানুষের সংখ্যা না বাড়লে কাঙ্ক্ষিত আলোকিত সমাজ গড়ে উঠবে কীভাবে? মোঙলারগাঁওয়ে যারা মানবতা বাঁচানোর তাগিদে হামলাকারীদের প্রতিরোধ করেছেন, তারা এই নজিরই স্থাপন করলেন। তাদের স্যালুট।