× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা

সাম্য, ন্যায়পরায়ণতা, মানবাধিকারে গুরুত্ব দিতে হবে

ড. আব্দুল্লাহ হেল কাফী

প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৩৩ এএম

ড. আব্দুল্লাহ হেল কাফী

ড. আব্দুল্লাহ হেল কাফী

বিগত ১৫ বছরে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্বাসনেই গিয়েছিল, অনেকের অভিমত। পট পরিবর্তনের পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে গণতন্ত্রে উত্তরণের বিকল্প নেই। যথাযথ নির্বাচনব্যবস্থা এবং সুস্থধারার রাজনীতি ফিরিয়ে আনা ছাড়া কোনোভাবেই এমনটি সম্ভব হবে না। সরকার গণতান্ত্রিক হবে কি-না হবে, তা নির্ভর করে নির্বাচন-পরবর্তী কর্মকাণ্ডের ওপর। সাম্য, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দিকে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবে বিগত ১৫ বছরে সাধারণ মানুষ অর্থনীতির নেতিবাচকতার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে। অথচ জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। তাদের কার্যক্রম নিশ্চিত করতে না পারলে কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। সে ক্ষেত্রে সঠিক ব্যক্তিদের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় আনতে হবে। নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা টেকসই হলে নির্বাচনের প্রার্থীও হবেন চৌকশ। রাজনৈতিক দলগুলোকে জবাবদিহির অধীনে নিয়ে আসতে না পারলে কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে না।

আমাদের নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তন দরকার। অনেকে দাবি করছেন, সংখ্যাধিক্যের প্রতিনিধিত্বের। এভাবে দেশের রাজনীতিতে বিদ্যমান কর্তৃত্ববাদী, একমুখী, একদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ বন্ধ হবে। তাই নির্বাচন পদ্ধতির কিছু পরিবর্তন আনা দরকার। সংসদের উচ্চকক্ষ, নিম্নকক্ষ থাকবে কি নাÑ এ রকম অনেক পরিবর্তন নিয়েও পর্যালোচনা করা যেতে পারে। নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। এ কমিশন নিরপেক্ষ হওয়া দরকার। এ কমিশন জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। তাই তাদের কার্যক্রম সুগম করার জন্য একটি ভালো আইন থাকা জরুরি। নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ আইনের ভিত্তিতে, সঠিক ব্যক্তিদের স্বচ্ছতার ভিত্তিতে দিতে হবে, যাতে তারা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ হন। কোনো দলের প্রতি তাদের আনুগত্য যেন না থাকে।

নির্বাচনের অনেক ধাপ আছে, ভোটার তালিকা ঠিক করতে হবে। নির্বাচনী আসনবিন্যাস সঠিক করতে হবে। ব্যক্তি বা মহল বিশেষের স্বার্থে কোনো কিছু করা যাবে না। নির্বাচনের সময় প্রার্থিতায় আগ্রহী সবাই যেন প্রার্থী হতে পারেন। ভোটাররা যেন ভোট দিতে পারেন। সহিংসতা যেন না হয়। ভোট গণনা সঠিকভাবে হতে হবে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে দক্ষ ও অভিজ্ঞদের আহ্বান জানাতে হবে। নির্বাচন দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া; এক দিনের বিষয় নয়। তাই প্রক্রিয়াটা সঠিক হতে হবে ভবিষ্যতের জন্যও। শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, এর সঙ্গে আরও অংশীজন আছে। গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হলেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। একটি নির্বাচনে ১০ লাখের বেশি মানুষ প্রয়োজন হয় এবং তারা বিভিন্ন স্থান থেকে আসেন। এত লোকের নিয়োগের প্রক্রিয়া ক্লান্তিকর হলেও লেজুড়বৃত্তি যেন না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ দেশের সব অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়েছে। তাই এখন উপযুক্ত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সমাধানের দিকে এগোতে হবে।

পট পরিবর্তনের পর সংস্কার ব্যাপক গুরুত্ব পাচ্ছে। নিকট অতীতে সংস্কার শব্দটিকে অনেকে নেতিবাচকভাবে দেখতেন। এক-এগারোর পর অনেকেই সংস্কারের আলোচনা তুলেছিলেন। তখন যারা এ কথা বলেছিলেন তারা যে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নতির পথ দেখতে পেরেছিলেন তা আজ স্পষ্ট। অথচ তখন সময় তাদের সংস্কারপন্থি সুশীল বলে গালমন্দ করা হতো। এ মুহূর্তে দেশে এমন কোনো রাজনৈতিক দলগুলো যারা সিন্ডিকেটকে মদদ দেয়। ব্যবসায়ীরাই তাদের মূল নিয়ন্তা। আমাদের অনেক ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে হবে। এটাই সংস্কার। পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া সংস্কার করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের সংস্কার করতে হবে। সংবিধানের সংস্কার করতে হবে। আইনের সংস্কার করতে হবে। অনেক পরিবর্তন আনতে হবে। অনেক আইনকানুন, বিধিবিধান যুগোপযোগী করতে হবে, যাতে এগুলো গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

স্মরণে আছে, পঞ্চদশ সংশোধন পাসের আগে পঞ্চম সংশোধন বাতিলের ফলে সংসদ একটি বিশেষ কমিটি করে। কমিটি হলো ১৫ সদস্যের। এর মধ্যে ১২ জন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা ছিলেন। এর প্রধান ছিলেন বেগম সাজেদা চৌধুরী, উপপ্রধান ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। বাকি তিনজন ছিলেন তাদের জোটসঙ্গী। যেমন রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু ও জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। ওই কমিটি সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার রেখেই সংবিধান সংশোধন করা হবে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাকচ করে দেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের একদল নেতাকে নিয়ে ওই কমিটির সামনে তাদের মতামত উপস্থাপন করেন। তাদের মতামতে বলেছেন, তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রেখেই সংবিধান সংশোধন করা হবে। সংসদীয় কমিটি যখন সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিল, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাকচ করে দিলেন। তিনি যে আগে সুপারিশ করে আসছিলেন, সেটার বরখেলাপ করলেন। এটাও অসাংবিধানিক। এ প্রস্তাবটা দেওয়ার দরকার ছিল সংসদে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এটা নাকচ করে দিলেন। এটাকে বলে সেপারেশন অব পাওয়ার; ক্ষমতার পৃথক্‌করণ নীতির পরিপন্থি। তখন থেকেই রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সতর্ক হওয়া জরুরি ছিল।

সংবিধানের কতগুলো অলিখিত বিষয় থাকে। এটাই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো। এখন পঞ্চদশ সংশোধন যদি বাতিল না হয়, তাহলে পট পরিবর্তনের যে বিষয়ের কাজ হচ্ছে তার জন্য রাষ্ট্রদ্রোহী হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কেউ যদি এ সংবিধান পরিবর্তনের জন্য কিংবা জোর করে সংবিধান বাতিল করে, এমনকি দাবি করে, তাহলে তারা রাষ্ট্রদ্রোহীর অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারে। তাই পঞ্চদশ সংশোধন অত্যন্ত ভয়াবহ একটা সংশোধন। এটা বাতিল হওয়া দরকার। এটা বাতিল হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসবে। তখন অন্তর্বর্তী সরকার সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আর কী কী পরিবর্তন আনা দরকার, সে পরিবর্তনটা আনতে পারে। বিগত তিনটি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে। যে গণতন্ত্র মানুষের ভোটাধিকার দিয়ে শুরু হয়। ২০১৪ সালে আমাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। ২০১৮ সালেও হরণ করা হয়েছে জালিয়াতির মাধ্যমে। ২০১৪ ছিল একতরফা নির্বাচন; মানুষের সামনে কোনো পছন্দ ছিল না, কোনো বিকল্প ছিল না। বিকল্পহীন নির্বাচন কোনো নির্বাচনই নয়।

পদ্ধতি, প্রক্রিয়া, প্রতিষ্ঠান, আইনকানুন, সংবিধানÑ এগুলোর আমূল পরিবর্তন করতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে হবে। উপদেষ্টা পরিষদকে এ ব্যাপারে নেতৃত্ব দিতে হবে। উপদেষ্টা পরিষদের সফলতার জন্য আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। কারণ তারা সফল না হলে আমরা সবাই ব্যর্থ। রাজনৈতিক পরিচয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের ক্ষীণ সান্ত্বনা থাকে নিজ দল ক্ষমতায় এলে হারানো সুবিধা ফিরে পাবেন এ আশায়। অন্যদিকে দলনিরপেক্ষ মানুষ হাজারো যোগ্যতা থাকার পরও অপাঙ্‌ক্তেয় থেকে যাবেন সকল পর্বে। এ ধারা বজায় থাকায় দক্ষ, যোগ্য, মেধাবী মানুষের সেবাবঞ্চিত হবে জাতি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় আদর্শে বন্দি ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উজ্জ্বল ধারা কালো কাপড়ে ঢেকে দিয়েছে। এখন দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত শিক্ষকদের বড় অংশ ক্ষমতাবান জাতীয় নেতানেত্রীদের পেছনে ছুটছেন নানা লাভালাভের লক্ষ্যপূরণের জন্য। দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত ছাত্রদের বড় অংশ প্রকাশ্যে লাঠিয়াল হয়ে গেছে দলীয় নেতাদের। ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদী আন্দোলনে যুক্ত থাকার বদলে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করলে সরকারি বা দলীয় নির্দেশে সতীর্থদের ওপর চড়াও হতেও তারা কুণ্ঠিত থাকে না।

একসময় রাজনৈতিক নেতারা ছিলেন নমস্য। তাদের কথা, তাদের আশ্বাসকে সাধারণ মানুষ বিশেষ গুরুত্ব দিত। নেতারাও মানুষের বিশ্বাসের মূল্য দিতেন। এখন রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেই একটি শব্দযুগল তৈরি হয়েছে। তা হচ্ছে ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’। অর্থাৎ নেতাদের অনেকে জেনে শুনেই অহরহ যেসব মিথ্যা বক্তৃতা করছেন এর নাম হয়ে গেছে ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন ছলচাতুরী আগে হতো না। এসব বাস্তবতার কারণে এখন সেকালের রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্পে পরিণত হচ্ছে। বর্তমানের সঙ্গে যা মেলানো খুব কঠিন। এসব বাস্তবতায় এখন মেধাবী প্রজন্ম রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ছে। ‘রাজনীতি’ একটি নেতিবাচক শব্দে পরিণত হচ্ছে যেন। প্রজন্ম বুঝতে শিখেছে এখন সরকারি ও বিরোধী দলের নেতানেত্রীর প্রধান কাজ পরস্পরকে কেবল দোষারোপ করা। এ ক্লান্তিহীন রাজনৈতিক ঝগড়া দেখে-শুনে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতৃষ্ণা জন্মে গেছে। কিন্তু কোনো পক্ষই এ থেকে বেরোনোর চেষ্টা করছে তেমন মনে হয় না। সচেতন সাধারণ মানুষ সংস্কৃত, আধুনিক, স্মার্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দৃশ্যপটে দেখতে চায়। এ প্রত্যাশা আদৌ পূরণ হবে কি না বোঝা কঠিন। নানামুখী সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হোক এ বিষয়গুলো।

  • রাজনীতি-বিশ্লেষক ও অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা